ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ দেউলিয়ার ধাক্কা গিয়ে লাগছে ক্রীড়াঙ্গনে

ডট-কম যুগেও এমনটা হয়েছিল। মূলত বাস্কেটবল স্টেডিয়ামগুলোর নাম দেওয়া হচ্ছিল ডট-কম কোম্পানির নামে। পরে বন্ধ হয়ে গেছে সবগুলো কোম্পানি।

প্রযুক্তি ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Nov 2022, 02:22 PM
Updated : 13 Nov 2022, 02:22 PM

ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ এফটিএক্স নিজেদের দেউলিয়া ঘোষণা করার জন্য আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো ক্রিপ্টো স্টার্টআপ এবং বিনিয়োগ খাতে। সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, এফটিএক্স ধসের ভুক্তভোগী হতে পারে পশ্চিমা ক্রীড়াঙ্গনের একটা বড় অংশ।

অন্যান্য ক্রিপ্টো কোম্পানির মতো এফটিএক্সও ক্রীড়া খাতে ব্যাপক হারে বিনিয়োগ করেছিল বলে জানিয়েছে সিএনএন। পেশাদার বাস্কেটবল দল, বেইজবল দল এবং ফর্মুলা ওয়ান রেসিং দলগুলোর সঙ্গে অংশীদারিত্ব চুক্তি আছে কোম্পানির।

কিন্তু এফটিএক্স সম্প্রতি মার্কিন আইনে ‘চ্যাপ্টার ১১ দেউলিয়া সুরক্ষা’ চেয়ে আদালতের শরণাপন্ন হওয়ায় চুক্তিগুলোর ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।

তারল্য সঙ্কটে পড়া এফটিএক্স মঙ্গলবারেই বলেছিল, তাদের কিনে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাজারে শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী বাইন্যান্স। কিন্তু পরের দিনই এফটিএক্সের আর্থিক নথিপত্র পর্যালোচনা করে বাইন্যান্স সে উদ্যোগ থেকে সরে আসার ঘোষণা দিয়েছে।

সাড়ে ১৩ কোটি ডলারের বিনিময়ে ‘আমেরিকান এয়ারলাইন্স এরিনা’র নাম পাল্টে ‘এফটিএক্স এরিনা’ করতে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল বাস্কেটবল অ্যাসোসিয়েশন (এনবিএ)’-এর মায়ামি হিট দলের সঙ্গে ১৯ বছর মেয়াদী চুক্তি করেছিল এফটিএক্স।

একই বছরে এফটিএক্সকে নিজেদের আনুষ্ঠানিক ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে পাঁচ বছরের চুক্তি করেছিল ‘মেজর লিগ বেইজবল’। ‘মার্সিডিজ-এএমজি পেট্রোনাস ফর্মুলা ওয়ান’ দলের আনুষ্ঠানিক ক্রিপ্টোমুদ্রা এক্সচেঞ্জ পার্টনারও এফটিএক্স।

এফটিএক্সের দুর্দিনে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে এফটিএক্স এরিনা এবং মায়ামি হিট কর্তৃপক্ষ এক যৌথ বিবৃতিতে সিএনএনকে বলেছে, “আগেভাগেই কোনো মন্তব্য করার মত সময় এটা নয়।”

যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বাবিদ্যালয় পর্যায়ের ক্রীড়া খাতেও এফটিএক্সের সংশ্লিষ্টতা আছে বলে জানিয়েছে সিএনএন। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার ফুটবল স্টেডিয়াম নামকরণের অধিকার নিজের অধীনে নিতে এক কোটি ৭৫ লাখ ডলারের চুক্তি করেছিল কোম্পানিটি।

সে সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া পরিচালক জিম নোলটন বলেছিলেন, “আমরা বিশ্বাস করি যে এফটিক্সের মাঝে সেরা অংশীদারকে খুঁজে পেয়েছি।”

কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, “ক্যাফিফোর্নিয়া অ্যাথলেটিক্সের জন্য এফটিএক্স খুবই ভালো অংশীদার। পরিবর্তনশীল বাণিজ্যিক পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছি আমরা এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেব।”

পুরো ক্রীড়া শিল্পের সবচেয়ে জনপ্রিয় কয়েকজন অ্যাথলিটের সঙ্গেও চুক্তি আছে এফটিএক্সের। ক্রিপ্টো এক্সেচেঞ্জটির শেয়ারের বদলে আন্তর্জাতিক দূতের দায়িত্ব নিয়েছেন পেশাদার বাস্কেটবল দল ‘লস অ্যাঞ্জেলেস এঞ্জেলস’-এর তারকা খেলোয়াড় শোহেই ওহতানি।

২০২১ সালেই এফটিএক্সের সঙ্গে চুক্তি করেছেন এনবিএ তারকা স্টিভ কারি এবং তার ‘ইট,লার্ন, প্লে ফাউন্ডেশন’। প্ল্যাটফর্মের দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এফটিক্সের শেয়ার মালিকদের একজন ফুটবল তারকা টম ব্রেডি।

ক্রীড়া খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে নামকরণ চুক্তিগুলো। পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে ক্রীড়াখাতের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান আইইজির পরিচালক পিটার লাটজ সিএনএনকে বলেছেন, “দুটো দালান বাদে অনেক ক্ষেত্রেই বড় কোনো অগ্রগতি হয়নি।”

“ডট-কম যুগেও এমনটা হয়েছিল। মূলত বাস্কেটবল স্টেডিয়ামগুলোর নাম দেওয়া হচ্ছিল ডট-কম কোম্পানির নামে। বন্ধ হয়ে গেছে সবগুলো কোম্পানি। নামকরণে অধিকার বিষয়ক চুক্তিগুলো কার্যকর করা আসলে খুবই জটিল।”

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং ভেস্তে যাওয়া অধিগ্রহণ চুক্তি নিয়ে এফটিএক্স ও বাইন্যান্সের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পায়নি সিএনএন।

ক্রিপ্টো কোম্পানিগুলোর মধ্যে কেবল এফটিএক্স ক্রীড়া জগতের সঙ্গে জড়িয়েছে, বিষয়তা তেমন নয়। সিএনএন জানিয়েছে, কেবল গত সিজনেই এনবিএ স্পন্সরশিপ চুক্তির পেছনে ১৩ কোটি ডলার খরচ করেছিল বিভিন্ন ক্রিপ্টো মুদ্রা ব্র্যান্ড। আইইজির তথ্য বলছে, এ খাতে ৯২ শতাংশ তহবিল এসেছিল ক্রিপ্টো ডটকম, কয়েনবেইজ এবং এফটিএক্সসহ মোট পাঁচটি ক্রিপ্টো কোম্পানি থেকে।

২০২১ সালের এনবিএর একক ক্রিপ্টো মুদ্রা পার্টনার হওয়ার জন্য চুক্তি করেছিল কয়েনবেইজ। সিএনএনের প্রতিবেদনে বলছে, চার বছর মেয়াদী চুক্তিতে ১৯ কোটি ২০ লাখ ডলার তহবিল দেওয়ার কথা ছিল প্ল্যাটফর্মটির।

এক বছর আগেও স্পন্সরশিপের পেছনে ৪০টি ক্রিপ্টো এক্সেচেঞ্জ পয়সা খরচ করছিল। এখন টিকে আছে বড় জোর তিন থেকে চারটি।

কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে ক্রিপ্টো বাজারের দৃশ্যপট এখন কার্যত উল্টে গেছে; মুদ্রাস্ফীতির বাস্তবতায় কর্মী ছাটাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে কয়েনবেইজ এবং ক্রিপ্টো ডটকমসহ একাধিক প্ল্যাটফর্ম। বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দার আশঙ্কা আর বাজার অস্থিতিশীলতায় মূল্য হারিয়েছে বাজারের প্রথম সারির ক্রিপ্টো মুদ্রাগুলো।

বর্তমান পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে লাটজ বলেন, “আমরা আগে থেকেই বলে আসছি যে এটা ছিল ব্যান্ড নিয়ে সচেতনতা আর ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ানোর ‘অস্ত্র প্রতিযোগিতা’। এক বছর আগেও স্পন্সরশিপের পেছনে ৪০টি ক্রিপ্টো এক্সেচেঞ্জ পয়সা খরচ করছিল। এখন টিকে আছে বড় জোর তিন থেকে চারটি।”

অন্যান্য প্ল্যাটফর্মগুলো যখন স্পন্সরশিপ চুক্তি দখলে নিতে কাড়াকাড়ি করছিল তখন চুপ করে বসেছিল বাইন্যান্স। এ প্রসঙ্গে বছরের শুরুতেই নতুন কর্মী নিয়োগ দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বাইন্যান্স প্রধান ঝাও চ্যাংপেং বলেছিলেন, “সুপার বোলের বিজ্ঞাপন, স্টেডিয়ামের নামকরণের অধিকার এবং কয়েক মাস আগেও স্পন্সরশিপ চুক্তিকে না বলা সহজ ছিল না, কিন্তু আমরা সেটাই করেছি।”

বাজার অস্থিতিশীলতার দৃশ্যপটে তুলনামূলক স্থিতিশীল অবস্থাতেই আছে এ কোম্পানিটি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক