Published : 20 Mar 2026, 03:10 PM
রাস্তায় বেরোলে দুই চাকার যানে চড়ে দাপিয়ে বেড়ানো মানুষদের দেখা পাওয়া এখন নিত্যদিনের ঘটনা। তবে এ তাদের ঠিক কী নামে ডাকা হয়? কেউ বলেন ‘বাইকার’, কেউ ‘রাইডার’, আবার কেউবা ‘মোটরসাইক্লিস্ট’।
আপাতদৃষ্টিতে শব্দগুলো একই মনে হলেও এদের পেছনে লুকিয়ে আছে ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক প্রেক্ষাপট ও দৃষ্টিভঙ্গি।
প্রযুক্তি সাইট স্ল্যাশগিয়ার প্রতিবেদনে লিখেছে, এসব শব্দ কখনও শখের বহিঃপ্রকাশ ঘটায় আবার কখনও তা জড়িয়ে যায় কোনো গ্যাং বা নির্দিষ্ট সংস্কৃতির সঙ্গে। চালকদের ঠিক কী নামে ডাকা হবে তা বলা মাঝেমধ্যে কিছুটা কঠিন হয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বা প্রেক্ষাপট ভেদে এসব নাম আলাদা হতে পারে।
যেমন, ‘বাইকার’ শব্দটি দিয়ে মোটরবাইক বা বাইসাইকেল উভয় আরোহীকে বোঝানো যেতে পারে। আবার অনেকের কাছে ‘বাইকার’ মানে এমন একজন ব্যক্তি, যিনি কোনো আইন অমান্যকারী গ্যাংয়ের সদস্য, কোনো সাধারণ মোটরসাইকেল ক্লাবের সদস্য নন।
তবে এ ধরনের ব্যক্তিদের ‘আউট’ল মোটরসাইকেল গ্যাংয়ের সদস্য’ হিসেবে উল্লেখ করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ।
অন্যদিকে, ‘রাইডার’ শব্দটি দিয়ে বোঝানো হয়, যে বাইকটি চালায় তাকে। চালকদের বোঝাতে এ শব্দটিই ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল হাইওয়ে ট্রাফিক সেইফটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’। চালকদের বর্ণনা করতে আরও নিরপেক্ষ শব্দ ‘মোটরসাইক্লিস্টস’ ব্যবহার করে সংস্থাটি।
এ ছাড়া, আমেরিকান মোটরসাইক্লিস্ট অ্যাসোসিয়েশনও এ শব্দটি ব্যবহার করে এবং মোটরবাইক চালকদের সম্পর্কে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার নেতিবাচক ধারণা বা স্টেরিওটাইপ ভাঙতে কাজ করে।
আসল কথা, এর কোনো নির্দিষ্ট বা সঠিক উত্তর নেই। কারণ পুরো বিষয়টিই আপেক্ষিক। একই বাইক চালককে বোঝাতে তিনজন আলাদা মানুষ তিনটি ভিন্ন শব্দ ব্যবহার করতে পারেন। আপনি কে, তার ওপর ভিত্তি করে এসব শব্দ একটির বদলে অন্যটি ব্যবহৃত হয়। বিভিন্ন সংস্থা যেমন তাদের পছন্দমতো শব্দ বেছে নেয়, মোটরসাইকেল চালকরাও ঠিক তেমনটাই করতে পারেন।
শব্দটি যে ব্যবহার করছে সেই ব্যক্তিই এখানে মূল সিদ্ধান্ত নেন। শব্দটির প্রকৃত অর্থ নির্ভর করে তা কোন প্রেক্ষাপটে, কী উদ্দেশ্যে ও কোন সংস্কৃতির ভিত্তিতে বলা হচ্ছে তার ওপর।
‘বাইকার’ শব্দটির সঙ্গে কেন নেতিবাচক ধারণা জড়িয়ে থাকে?
এর পেছনে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও ভাষাগত কারণ রয়েছে। মানুষ একেকজন একেকভাবে মোটরসাইকেল চালকদের বর্ণনা করলেও ‘বাইকার’ শব্দটি তার নেতিবাচক ভাবমূর্তির কারণে অন্যদের থেকে আলাদা।
২০১৩ সাল পর্যন্ত অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে ‘বাইকার’ শব্দের সংজ্ঞায় লেখা ছিল, “একজন মোটরসাইকেল চালক, বিশেষ করে যিনি কোনো গ্যাং বা দলের সদস্য। যেমন নোংরা ডেনিম পরা দীর্ঘ চুলের একজন বাইকার।”
অনেক মোটরসাইকেল চালক এ সংজ্ঞার তীব্র প্রতিবাদ জানান। পরবর্তীতে তা পরিবর্তন করে লেখা হয়, “একজন মোটরসাইকেল চালক, বিশেষ করে যিনি কোনো গ্যাং বা গোষ্ঠীর সদস্য।”
‘বাইকার’ শব্দটি কেন ইতিহাসের পাতায় মার্কিন ‘আউট’ল বা আইন অমান্যকারী গ্যাংয়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার সূত্রপাত হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ দিকে। যুদ্ধ ফেরত অনেক মার্কিন সৈন্য সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন অভ্যাসবশত মোটরবাইক চালাতেন এবং অনেকে মিলে ছোট ছোট ক্লাব তৈরি করেছিলেন।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব ক্লাবের মধ্যে কিছু দল বেআইনি কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে এবং এভাবেই ‘আউটল বাইকার’ শব্দগুচ্ছটি দানা বাঁধতে শুরু করে। সংবাদমাধ্যমের খবর ও হলিউড সিনেমায় এ অপরাধীদের যেভাবে দেখানো হয়েছিল তাতে শব্দটি মানুষের মনে গেঁথে যায়।
দ্রুতই তা সাধারণ মোটরসাইকেল চালকদের এক ধরনের ‘আদর্শ রূপ’ হিসেবে উপস্থাপিত হতে থাকে। তবে বাস্তবে অধিকাংশ চালকের সঙ্গে এর কোনো মিল নেই।
‘আউটল বাইকার’ এবং তাদের ক্লাবগুলোকে প্রায়ই ‘ওয়ান পার্সেন্টার্স’ বলে ডাকা হয়। এ শব্দটির উৎপত্তি ১৯৪৭ সালের কুখ্যাত ‘হলিডে মোটরসাইকেল ইভেন্ট’-এর পর তৈরি নেতিবাচক প্রচারকে কেন্দ্র করে।
তৎকালীন প্রতিবেদনে অনুসারে, এ নেতিবাচক প্রচারের প্রতিবাদ জানিয়ে ‘আমেরিকান মোটরসাইকেল অ্যাসোসিয়েশন’ বলেছিল, ৯৯ শতাংশ বাইকারই নিয়মিত আইন মেনে চলেন।
তবে পরবর্তীতে ‘আমেরিকান মোটরসাইকেল অ্যাসোসিয়েশন’ দাবি করেছে, এমন কোনো বিবৃতি কখনোই দেয়নি তারা। এরপরও এ শতাংশের হিসাবটি মানুষের মনে গেঁথে যায়। সেই থেকে এসব তকমা আজও ব্যবহৃত হয়ে আসছে।