Published : 05 May 2026, 03:42 PM
শিশু নিরাপত্তা সংক্রান্ত এক বড় আইনি লড়াইয়ের মুখে পড়েছে মেটা। অভিযোগ উঠেছে, ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মতো বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ও শিশুদের সুরক্ষায় তারা ব্যর্থ হয়েছে।
নিউ মেক্সিকোর আদালতে দায়ের করা এ মামলার রায়ের ওপর ভিত্তি করে মেটাকে তাদের ব্যবসায়িক মডেলে আমূল পরিবর্তন আনতে এবং শত শত ডলারের বিশাল জরিমানা গুনতে হতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান সংবাদমাধ্যম সিএনবিসি।
সোমবার নিউ মেক্সিকোর আদালতে আবারও হাজির হয়েছে মেটা। মামলাটি শিশু নিরাপত্তা সংক্রান্ত চলমান এক মামলার অংশ, যা নির্ধারণ করতে পারে কোম্পানিটিকে ‘জনসাধারণের জন্য ক্ষতিকর’ হিসেবে গণ্য করা হবে কি না।
নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেল রাউল তোরেজের আনা অভিযোগের ভিত্তিতে হওয়া এ মামলার প্রথম ধাপে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কোম্পানিটি হেরেছিল।
অভিযোগ ছিল, মেটা তাদের বিভিন্ন অ্যাপে যৌন নিপীড়নকারীদের হাত থেকে শিশুদের রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং ইনস্টাগ্রাম ও ফেইসবুকের মতো অ্যাপ ব্যবহারের ফলে হওয়া সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করেছে।
এর আগে, গেল মার্চে নিউ মেক্সিকোর জুরি রায় দিয়েছিল, মেটা স্বেচ্ছায় অঙ্গরাজ্যটির ‘অন্যায্য কার্যকলাপ আইন’ লঙ্ঘন করেছে। ওই সময় অপরাধের সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে কোম্পানিটিকে সাড়ে সাঁইত্রিশ কোটি ডলার জরিমানার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
বিচারের দ্বিতীয় ধাপটি এখন তিন সপ্তাহ ধরে চলবে, যাকে বলা হচ্ছে ‘জুরিবিহীন বেঞ্চ ট্রায়াল’। এখানে বিচারক নির্ধারণ করবেন মেটার কর্মকাণ্ড জনসাধারণের জন্য উপদ্রব বা ‘পাবলিক নুইসেন্স’ তৈরি করেছে কি না। এমনটি প্রমাণিত হলে মেটাকে তাদের পণ্যে আমূল পরিবর্তন আনতে বাধ্য করা হতে পারে।
গত সপ্তাহে ত্রৈমাসিক নথিতে মেটা বলেছে, নিউ মেক্সিকোর অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় ‘অ্যাবেটমেন্ট কস্ট’ বা ক্ষতিপূরণ বাবদ প্রায় ৩৭০ কোটি ডলার দাবি করেছে।
সেইসঙ্গে তারা মেটার পরিষেবার ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা বা ‘ইনজাঙ্কটিভ রিলিফ’ চাইছে, যার মধ্যে নিউ মেক্সিকোতে মেটা যেভাবে তাদের সেবা দেয় তাতে ব্যাপক পরিবর্তনের অনুরোধ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মেটা ও তার সমপর্যায়ের কোম্পানিগুলোর জন্য এ মামলাটি এ বছরের এমন কিছু মামলার অন্যতম, যাকে বিশেষজ্ঞরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ‘বিগ টোব্যাকো’ বা বড় তামাক কোম্পানিগুলোর সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে নব্বইয়ের দশকে তামাক কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যের নিরাপত্তা ও সম্ভাব্য ক্ষতি সম্পর্কে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার কারণে কোটি কোটি ডলার জরিমানা দিতে বাধ্য হয়েছিল। ফলশ্রুতিতে কোম্পানিগুলোর সক্ষমতা ও প্রভাব নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
‘ইউনিভার্সিটি অফ হিউস্টন ল সেন্টার’-এর সহকারী অধ্যাপক নিকোলাস গুগেনবার্জার বলেছেন, “সেই পরিবর্তন তাৎক্ষণিক ছিল না। তবে বর্তমানে বড় বড় তামাক কোম্পানির যে সক্ষমতা রয়েছে এর সঙ্গে ১৯৮০ বা ৯০ এর দশকের সক্ষমতার তুলনা করা হলে দেখা যাবে এদের মধ্যে কোনো তুলনাই চলে না। সত্যি বলতে, তাদের সেই প্রভাবশালী অবস্থান এখন আর নেই।”
এ বছরে লস অ্যাঞ্জেলেসে শেষ হওয়া আরেকটি বড় সামাজিক মাধ্যম ট্রায়ালের প্রসঙ্গও এখানে উঠে এসেছে।
গেল মার্চে অনুষ্ঠিত সেই বিচারে মেটা ও গুগলের ইউটিউব পরিষেবা ব্যক্তিগত ক্ষতির মামলায় হেরে যায়। সেখানে মামলার বাদী অভিযোগ করেছিলেন, শৈশবে তিনি ইনস্টাগ্রাম ও ইউটিউবের মতো অ্যাপে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন।
নিউ মেক্সিকোর ক্ষেত্রে অ্যাটর্নি জেনারেল তোরেজ চান মেটা যেন তাদের অ্যাপগুলোতে আমূল পরিবর্তন আনে। গত সপ্তাহে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছেন, তারা এমন কিছু ফিচারের বাস্তবায়ন চান, যা কার্যকরভাবে বয়স যাচাই করতে পারবে।
এ ছাড়া তিনি ‘রেকমেন্ডেশন অ্যালগরিদম’ পরিবর্তনের দাবি জানিয়েছেন, যাতে শিশুদের কল্যাণ বাধার মুখে না পড়ে। তারা এমন কিছু পরিবর্তন চাইছেন, যার ফলে ‘নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যে মেটা যেভাবে ব্যবসা করে তার পুরো কাঠামোটিই মৌলিকভাবে বদলে যাবে’।
তোরেজ আরও বলেছেন, এসব প্রস্তাবিত পরিবর্তন মেটা ঠিকঠাক মেনে চলছে কি না তা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র একজন ‘স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষক’ নিয়োগের দাবি জানাচ্ছে।
“কারণ, আমরা এখন জানি, মেটা নিজে থেকে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করবে বা স্বাধীনভাবে নিজের আচরণ সংশোধন করে নিয়ম মেনে চলবে এমনটা বিশ্বাস করা যায় না।”
মেটার একজন মুখপাত্র এক বিবৃতিতে বলেছেন, নিউ মেক্সিকোর এসব দাবি ‘প্রযুক্তিগতভাবে অবাস্তব, যে কোনো কোম্পানির পক্ষেই তা পূরণ করা অসম্ভব এবং এখানে ইন্টারনেটের প্রকৃত বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে করা হয়েছে।
“এমনটা করা মেটার উদ্দেশ্যের মধ্যে নেই। তবে অ্যাটর্নি জেনারেল তোরেজের এসব দাবির যদি কোনো কার্যকর সমাধান না পাওয়া যায় তবে নিউ মেক্সিকোর ব্যবহারকারীদের জন্য আমাদের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের সুবিধা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের আর কোনো উপায় থাকবে না।”
‘প্রথম পরীক্ষামূলক মামলা’
মেটা ও ইউটিউবের অবহেলা বাদীর গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার পেছনে ‘বড় কারণ’ ছিল বলে খুঁজে পেয়েছেন লস অ্যাঞ্জেলেসের বিচারে জুরি সদস্যরা।
আদালত কোম্পানি দুটিকে ক্ষতিপূরণ ও শাস্তিমূলক জরিমানা হিসেবে মোট ৬০ লাখ ডলার দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে, যার মধ্যে মেটাকে ৭০ শতাংশ জরিমানা পরিশোধ করতে হবে।
এদিকে, ক্যালিফোর্নিয়ার নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্টে বড় ধরনের ফেডারেল মামলার সঙ্গেও জড়িয়ে আছে মেটা, ইউটিউব, টিকটক ও স্ন্যাপ। সেখানেও অভিযোগ প্রায় একই ধরনের- এসব কোম্পানি গ্রাহকদের বিভ্রান্ত ও ত্রুটিপূর্ণ অ্যাপ তৈরি করেছে, যার ফিচারগুলো টিনএজার ও শিশুদের মধ্যে অস্বাস্থ্যকর এবং আসক্তিমূলক আচরণকে উৎসাহিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শত শত স্কুল ডিস্ট্রিক্ট জড়িয়ে থাকা এ মামলার বিচারটি আগামী ১৫ জুন শুরুর কথা রয়েছে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া গোল্ড স্কুল অফ ল’ এর অধ্যাপক অ্যাডাম জিমারম্যান বলেছেন, বাদীদের আইনজীবীরা সম্ভবত নিউ মেক্সিকোর এ বিচারের দিকে কড়া নজর রাখবেন। কারণ উভয় ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রের ‘পাবলিক নুইসেন্স’ বা জনউপদ্রব সংক্রান্ত অভিযোগ জড়িয়ে আছে।
“এ মামলাটি কেবল যে নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের জন্য বড় কোনো প্রতিকার বা সমাধান নিশ্চিত করবে তা নয়, বরং এটিই হবে ‘প্রথম পরীক্ষামূলক মামলা’। যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিভিন্ন স্কুল ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল আদালতে যে আইনি যুক্তির ওপর ভিত্তি করে মামলা করেছে, যেগুলো এখন সব একত্রে একটি মামলায় পরিণত হয়েছে, আর এ মামলাটিতে সেই যুক্তির কার্যকারিতাই যাচাই হবে।”
নিউ মেক্সিকোর ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস গ্রেসন গত সপ্তাহের সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, জনউপদ্রব বা ‘পাবলিক নুইসেন্স’ মামলার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিল ২০২২ সালে সান্তা ফে-তে ওয়ালগ্রিনসের বিরুদ্ধে চলা ওপিওড সংকট সংক্রান্ত একটি বিচার। শেষ পর্যন্ত ওয়ালগ্রিনসের সঙ্গে অঙ্গরাজ্যটির ৫০ কোটি ডলারের একটি সমঝোতা হয়েছিল।
গ্রেসন আরও বলেন, “ওই ঘটনা এ ধরনের ক্ষেত্রে জনউপদ্রব সংক্রান্ত আইন ব্যবহারের পথ তৈরি করে দিয়েছে। আমরা আসলে এ আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে পুরো অঙ্গরাজ্যজুড়ে হওয়া ক্ষতি ও নিউ মেক্সিকোর মানুষের ওপর এর প্রকৃত প্রভাব তুলে ধরার চেষ্টা করছি।”
তবে, নিউ মেক্সিকোর এ প্রচেষ্টাকে ‘ভুল কৌশল’ হিসেবে বর্ণনা করেছে মেটা। তাদের দাবি, এ পদক্ষেপে এমন আরও শত শত অ্যাপের কথা উপেক্ষা করা হয়েছে যেগুলো টিনএজাররা প্রতিদিন ব্যবহার করছে।
অধ্যাপক জিমারম্যান বলেছেন, মেটা ও অন্যান্য সামাজিক মাধ্যম কোম্পানি যদি ধারাবাহিকভাবে মামলাগুলোতে হারতে থাকে তবে তারা শেষ পর্যন্ত মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের শরণাপন্ন হতে পারে।
আরও পড়ুন…