Published : 31 May 2026, 04:14 PM
দীর্ঘ ৮৮ দিন পর ইরানে আংশিক ইন্টারনেট সেবা চালু হলেও সাধারণ মানুষের মনে ফেরেনি স্বস্তি। দীর্ঘদিন আটকে থাকা বার্তা ও ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষোভ, আতঙ্ক ও স্বজন হারানোর কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে দেশটির অনলাইন দুনিয়া।
সরকারের কঠোর নজরদারির ভয় ও পশ্চিমা মিডিয়ার বিষয়টিকে ‘সাফল্য’ হিসেবে প্রচার করার প্রবণতা এসব মিলিয়ে এ আংশিক ইন্টারনেট ফিরে আসাকে কোনোভাবেই ‘স্বাধীনতা’ হিসেবে মানতে পারছেন না সাধারণ ইরানিরা।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান প্রতিবেদনে লিখেছে, মঙ্গলবার বিকেল ৫টার দিকে ঢিমে তালে ইন্টারনেট সংযোগ আবার সচল হতে শুরু করলে মানুষের ফোন ও সামাজিক মাধ্যমে জমা হয়ে থাকা পুরানো মেসেজ, ছবি ও কবিতার বন্যা বয়ে যায়।
তবে ইন্টারনেট ফিরে পাওয়ার পর মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া আনন্দের ছিল না। নতুন যেসব পোস্ট আসছিল, তার বেশিরভাগ জুড়েই ছিল সন্দেহ, উদ্বেগ ও ক্ষোভের ছোঁয়া।
তেহরানের ৪২ বছর বয়সী চিত্রশিল্পী এলি (ছদ্মনাম) ২৮ ফেব্রুয়ারির পর এ প্রথম ইন্টারনেটে ঢুকতে পেরেছেন। অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, “আমি একটা সিগারেট ধরালাম, সাউন্ডক্লাউড অ্যাপে আমাদের প্রিয় গানটা ছাড়লাম। আমি আর আমার স্বামী আলী প্রথমে চোখের পানি ধরে রাখার চেষ্টা করলাম, তারপর দুজনেই কেঁদে ফেললাম।”
এরইমধ্যে ইন্টারনেট আংশিক চালু হওয়ার ঘটনাটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রধান শিরোনামে এসেছে। সরকারের সমর্থকরাও প্রশাসনের এ পদক্ষেপকে সাধুবাদ জানিয়েছে।
তবে তেহরানের একজন আলোকচিত্রী মরিয়ম (ছদ্মনাম) বিষয়টিকে দেখছেন ভিন্নভাবে। তিনি বলেছেন, “এসব উদযাপন আর হাততালি দেখাটাও একটা চরম অস্বস্তির বিষয়।”
ক্ষোভ প্রকাশ করে মরিয়ম বলেছেন, “পুরো বিষয়টা তামাশা ছাড়া আর কিছু নয়। পশ্চিমা মিডিয়াগুলো এ আংশিক ইন্টারনেট ফিরে আসাকে এমনভাবে প্রচার করছে যেন সরকার খুব বড় কোনো কৃতিত্বের কাজ করেছে! একদম হাস্যকর। ইন্টারনেট তো আমাদের কোনো দয়া নয়, এটা আমাদের মৌলিক অধিকার।”
মরিয়ম বলেছেন, গত ছয় সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে তিনি কোনো কাজের বুকিং পাননি। বাধ্য হয়ে তাকে মা-বাবার কাছ থেকে অর্থ ধার করতে হয়েছে। এ আংশিক ইন্টারনেট সংযোগ তার কাজের জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।
“মোবাইল ইন্টারনেট এখনও কানেক্ট হচ্ছে না। হোয়াটসঅ্যাপও প্রায় অচল। একমাত্র সুবিধা ভিপিএন এখন কিছুটা সহজে কানেক্ট করা যাচ্ছে। ব্যস, এইটুকুই।”
৮ জানুয়ারি দেশজুড়ে চলা সরকারবিরোধী আন্দোলন দমন করতে প্রথম ইন্টারনেট পুরোপুরি বন্ধ করে দেয় ইরান কর্তৃপক্ষ। ফেব্রুয়ারিতে সংযোগ কিছুটা স্বাভাবিক হলেও মাসের শেষদিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর আবারও ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়।
মাঝের এ সময়ে কিছু মানুষ চড়া দামের ভিপিএন ও স্যাটেলাইট ইন্টারনেটের মাধ্যমে মাঝেমধ্যে অনলাইনে আসতে পারলেও দেশের সিংহভাগ মানুষই ছিলেন পুরোপুরি ডিজিটাল বিচ্ছিন্নতায়।
ভিপিএনের দাম এখন আকাশচুম্বী, তাও আবার বেশিরভাগ সময় কাজই করে না। যারা এই চড়া খরচ জোগাতে পারেননি, তাদের জন্য মঙ্গলবারই ছিল দীর্ঘদিন পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রথম কিছু পোস্ট করার সুযোগ।
ইনস্টাগ্রামে তেহরানের এক ছাত্র পোস্ট করেছেন, “হ্যালো, আমার বন্ধুরা! আমার মনে হচ্ছে আমি যেন জেলখানা থেকে সাময়িক ছুটির দেখা পেয়েছি।”
এদিকে, নির্দিষ্ট কিছু খাতের ব্যবসায়িক ক্ষতি পুষিয়ে নিতে গেল মাসে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল শর্তসাপেক্ষে ‘ইন্টারনেট প্রো’ চালুর অনুমোদন দিয়েছে। এ আংশিক সংযোগ ফিরে আসাকে কেউ কেউ কিছুটা ইতিবাচকভাবে দেখলেও, অনেকের চোখেই তা এখনও গভীর সন্দেহের বিষয়।
জানুয়ারিতে গ্রেপ্তার হওয়া ২৩ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী মিনা (ছদ্মনাম) বলেছেন, ইন্টারনেট পুরোপুরি চালু হওয়া তো দূরের কথা, তিনি বরং নজরদারি আরও বেড়ে যাওয়ার ভয় পাচ্ছেন।
“জনগণকে এ ‘ইন্টারনেট প্রো’-এর দিকে ঠেলে দেওয়া বা এমন কোনো টানেলে আটকে ফেলা যেখানে আমাদের ওপর আরও সহজে নজর রাখা যায়– এমন কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া সরকারের ইন্টারনেট খুলে দেওয়ার কোনো কারণই নেই। আমরা একে বলি ‘ফিল্টারনেট’, যা কোনো স্বাধীনতার লক্ষণ নয়।”
ইন্টারনেট আসতেই স্ক্রিন জুড়ে ভেসে উঠছে মানুষদের জন্য শোকবার্তা। সেইসঙ্গে যুদ্ধবিধ্বস্ত ধ্বংসযজ্ঞের নানা ছবিও সামনে আসছে। অনেক ইরানি বলেছেন, ফোনের স্ক্রিনে একের পর এক এ হারানোর খতিয়ান দেখতে দেখতে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছেন না তারা।
তেহরানের একজন অধ্যাপক আমিন (ছদ্মনাম) নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন, “আমার সামাজিক মাধ্যম অ্যাকাউন্টগুলো এখন কেবল মায়েদের আহাজারি, বাবাদের আর্তনাদ আর মা-বাবার কবরের ওপর সন্তানদের শুয়ে থাকার ছবিতে ভরে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা ইসলামিক রিপাবলিক (ইরান সরকার) হারেনি। হারিয়েছি আমরা, আমরা আমাদের জীবিকা, আমাদের তারুণ্য ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ওপর আমাদের শেষ ভরসাটুকু হারিয়েছি।”
এ চরম হতাশার মধ্যেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু রসাত্মক পোস্ট ফিরে এসেছে। তবে তার মধ্যেও মিশে আছে একরাশ তিক্ততা।
কারাজ শহরের একজন আইটি পেশাজীবী মঈন (ছদ্মনাম) বলেছেন, “ট্রাম্পের এখন উচিত তার মেসেজ অপশন বন্ধ করে রাখা। কারণ যারা তাকে সাহায্য করবে বলে ভরসা করেছিল, তাদের আসল ক্ষোভের মুখে তিনি এখনও পড়েননি।
“সরকার নিশ্চিতভাবেই এ প্রচারণামূলক যুদ্ধে জিতেছে, কারণ যারা সরকারকে মনেপ্রাণে ঘৃণা করে, তারাও এখন ট্রাম্পের ওপর সমান ক্ষিপ্ত।”
বিদেশে থাকা ইরানিদের (প্রবাসী) কাছে তাদের বন্ধুবান্ধব ও পরিবারের সদস্যদের অনলাইনে ফিরে আসার এ ঘটনাটি মিশ্র অনুভূতি নিয়ে এসেছে।
প্যারিস প্রবাসী ৩৮ বছর বয়সী মানবাধিকার কর্মী মাহশিদ নাজেমী বলেছেন, “আমার মনের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল, যা একইসঙ্গে আনন্দ ও কষ্টের। যেসব বন্ধুরা এখনও অনলাইনে আসেনি, তাদের জন্য আমার খুব খারাপ লাগছিল। তারা আদৌ কানেক্ট হতে পেরেছে কি না, তা দেখতে আমি বারবার তাদের অ্যাকাউন্টগুলো চেক করছিলাম। আমি নিশ্চিত নই যে, তারা কি গ্রেপ্তার হয়েছে নাকি মারা গেছে।”
অধ্যাপক আমিন বলেছেন, ইন্টারনেটের এই ফিরে আসা যেন হারিয়ে যাওয়া সবকিছুর কথাই বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে।
“আসলে ইন্টারনেট চালু হওয়ার পর যা অনলাইনে ফিরে এসেছে তা কোনো স্বাধীনতা নয় তা আমাদের সীমাহীন দুর্দশা ও হাহাকার।”