Published : 09 Aug 2026, 11:36 AM
মহাবিশ্বে প্রকাণ্ড ও দানবীয় তারার চরম বিলুপ্তি বা সুপারনোভা বিস্ফোরণের ঘটনা একদম সূচনা থেকে সমাপ্তি পর্যন্ত সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
টানা তিন মাসের এই বিরল পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বে এ ধরনের মারাত্মক ও সহিংস ঘটনা ঠিক কত ভিন্ন ভিন্ন উপায়ে ঘটতে পারে সে বিষয়ে গবেষণার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে রয়টার্স।
এ বছরের মার্চে চীনের ‘আইনস্টাইন প্রোব’ স্পেস টেলিস্কোপে প্রথম এক্স-রের ক্ষণস্থায়ী এক উজ্জ্বল আলোর ঝিলিক ধরা পড়েছে।
ধসে পড়া তারার কেন্দ্রস্থল বা কোর থেকে উৎপন্ন শক্তিশালী শক ওয়েব যখন সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত তারার পৃষ্ঠদেশ ভেদ করে তীব্র গতিতে বাইরে বেরিয়ে আসে ঠিক তখনই এ আলোর ঝলকানি তৈরি হয়।
বিজ্ঞানের ভাষায় সংক্ষিপ্ত সময়ের এ ঘটনাকে বলে ‘শক ব্রেকআউট’। বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রতিটি সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় এ ঘটনা ঘটলেও এর স্থায়িত্ব কম হওয়ায় তা খালি চোখে বা সাধারণ প্রযুক্তিতে চিহ্নিত করা কঠিন।
২০০৮ সালের পর এই প্রথমবার মহাকাশে কোনো তারার মৃত্যুর মুহূর্তে এমন শক ব্রেকআউট সরাসরি পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হল।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স'-এ।
এ গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক ও ‘কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি’র ফেলো জ্যোতির্বিজ্ঞানী ব্রেন্ডন ও’কনোর বলেছেন, “রিয়াল টাইমে এই দৃশ্য ধারণ করতে পারাটা সৌভাগ্যের বিষয়।”
এ গবেষণার অন্যতম প্রধান লেখক ও ‘ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড’-এর নাসা আইনস্টাইন ফেলো জিলিয়ান রাস্টিনেজাদ বলেছেন, “আপনি এই শক তরঙ্গটিকে একটি রেডারের মতো ভাবতে পারেন, যেখানে শক তরঙ্গটি যখন তারার বাইরের স্তর ও আশপাশের পদার্থ ভেদ করে ধেয়ে যায় তখন এটি এক্স-রে সংকেতে নিজের নির্দিষ্ট ছাপ রেখে যায়।
“এ এক্স-রে ব্যবহার করেই ধসের চূড়ান্ত দ্বারপ্রান্তে থাকা একটি তারার রূপ আমরা বিস্ময়করভাবে একদম কাছ থেকে দেখার সুযোগ পেয়েছি।”
পৃথিবী থেকে প্রায় ৫০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত এক ছায়াপথে ঘটেছে এই বিরল ও মহাজাগতিক বিস্ফোরণ। সূর্যের চেয়ে প্রায় ৩০ গুণ বেশি ভরের এক বিরল ‘উল্ফ-রায়েট’ তারার মৃত্যুতে জন্ম নিয়েছে এক দানবীয় কৃষ্ণগহ্বর বা ব্লাক হোল।
চরম ধ্বংসাত্মক সুপারনোভাটি থেকে শক্তিশালী কোনো ‘গামা-রে বার্স্ট’ বা গামা-রশ্মির ঝলকানি নির্গত হয়নি, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আগের সব ধারণাকে নতুন করে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে।
প্রাথমিক সংকেত পাওয়ার পরপরই বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা একযোগে মহাকাশে থাকা ‘চন্দ্রা এক্স-রে অবজারভেটরি’সহ বেশ কয়েকটি শক্তিশালী ভূকেন্দ্রিক টেলিস্কোপকে এ গবেষণায় কাজে লাগান। পৃথিবীর সাপেক্ষে তারাটি সূর্যের আড়ালে চলে যাওয়ার আগ পর্যন্ত টানা প্রায় তিন মাস ধরে চলে এর পর্যবেক্ষণ।
গবেষক জিলিয়ান রাস্টিনেজাদ বলেছেন, “বিস্ফোরণের আগে মহাকাশের অন্যতম দানবীয় তারা হিসেবে ছিল এটা, যা আমাদের কালপুরুষ তারামণ্ডলের ‘বেটেলগিউস’ তারার চেয়েও আকারে বড় হতে পারে।”
মারা যাওয়ার আগে এই বিরল তারাটি তার নিজস্ব প্রচণ্ড শক্তিশালী বাতাসের মাধ্যমে হাইড্রোজেন ও হিলিয়ামের বাইরের বিভিন্ন স্তর আগেই ছেড়েছিল।
কেন গামা-রশ্মি তৈরি হল না?
এ ধরনের ‘ব্রড-লাইন্ড টাইপ ১সি’ সুপারনোভা বিস্ফোরণের সময় তারার নির্গত বিভিন্ন উপাদান আলোর গতির ১০ শতাংশেরও বেশি বেগে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে ও সঙ্গে প্রচণ্ড গামা-রশ্মি নির্গত হয়। তবে এবার সেই সংকেত ছিল না।
গবেষক ব্রেন্ডন ও’কনর বলেছেন, “জ্যোতির্বিজ্ঞানে উত্তর না মেলা অন্যতম প্রধান প্রশ্ন হল, কেন কিছু বড় তারা ভেঙে পড়ার সময় গামা-রশ্মি তৈরি করে, আর একই ধরনের অন্যান্য তারা তা করে না।”
বিজ্ঞানীদের ধারণা, তারাটির কেন্দ্রস্থল থেকে আলোর কাছাকাছি গতিতে ছুটে আসা যে শক্তিশালী জেটের কারণে গামা-রশ্মি তৈরি হয় তা হয়ত তারার উপরিভাগ বা তার আশপাশে থাকা ঘন পদার্থের স্তরে আটকে গিয়ে ধ্বংস হয়েছে।
কয়েক দশক আগে তাত্ত্বিকভাবে এমন ‘চকড জেট’-এর ধারণা দেওয়া হলেও এবারই প্রথম কোনো গামা-রশ্মিহীন সুপারনোভার মাধ্যমে বাস্তব প্রমাণ মিলল।
গামা-রশ্মি ও প্রকাণ্ড উপাদান ছাড়াই এ ধরনের চরম বিস্ফোরণ প্রত্যক্ষ করার ঘটনা বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটাই প্রথম।
গবেষক রাস্টিনেজাদ বলেছেন, “এ আবিষ্কার থেকে প্রমাণ মেলে, জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এতদিন মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় আকৃতির তারার মৃত্যু যেভাবে হয় বলে ভাবতেন, বাস্তবে তার চেয়েও বেশি বিচিত্র ও ভিন্ন উপায়ে হতে পারে।
“এসব অতিমাত্রার সুপারনোভা পদার্থবিজ্ঞানীদের জন্য এমন এক একটি গবেষণাগার, যা পৃথিবীর বুকে কৃত্রিমভাবে তৈরি করা অসম্ভব। এগুলো নিয়ে পড়াশোনা করেই আমরা আমাদের মহাবিশ্বের মৌলিক বিভিন্ন নিয়ম আরও গভীরভাবে বুঝতে পারি।”