জাপান এই আইন তৈরি ও প্রয়োগ করতে পারলে সেটি গোটা বিশ্বেই, বিশেষ করে, ইউরোপের স্মার্টফোন বাজারে ‘রিফল ইফেক্ট’ ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে।
Published : 19 Jun 2023, 02:50 PM
অ্যাপল ও গুগলের অ্যাপ স্টোরের নিজস্ব পেমেন্ট সিস্টেম ব্যবহার করতে হয় সফটওয়্যার ডেভলোপারদের। গোটা বিশ্বে চলে আসা এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আর জাপানে চালানো যাবে না। আর এর ফল হতে পারে সুদূরপ্রসারী।
বাজার নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে জাপান সরকারের একটি কমিটি তাদের এক প্রতিবেদনে এই ঘোষণা দিয়েছে বলে উঠে এসেছে রয়টার্সের প্রতিবেদনে।
কমিটি শুক্রবার তাদের প্রকাশিত চূড়ান্ত প্রতিবেদনে বলেছে স্মার্টফোনের জন্য অপারেটিং সিস্টেম নির্মাতা কোম্পানিগুলো (মূলত অ্যাপল ও গুগল) তাদের নিজস্ব স্টোরে লেনদেন ব্যবস্থার পাশাপাশি গ্রাহকদেরকে অন্যান্য নিরাপদ মাধ্যম দিতে বাধ্য থাকবে।
জাপানের মোবাইল অপারেটিং সিস্টেমের বাজার মোটাদাগে কেবল অ্যাপলের আইওএস ও গুগলের অ্যান্ড্রয়েডের দখলে।
অ্যাপলের গ্রাহকরা শুধু তাদের নিজস্ব অ্যাপস্টোরের অ্যাপ ডাউনলোড করতে পারেন। এদিকে দুটি স্টোরেই কেবল তাদের নিজস্ব পেমেন্ট মাধ্যম ব্যবহার করতে হয় যার কমিশন হার শতকরা ৩০ শতাংশ।
প্যানেলটির প্রতিবেদন বলছে জাপান সরকার এ বিষয়ে আইন তৈরির ধাপ চূড়ান্ত করবে। সরকার আগামী বছরের শুরু নাগাদ যত দ্রুত সম্ভব বিলটি পার্লামেন্টে উত্থাপন করার লক্ষ্যে এগিয়ে যাচ্ছে বলে শনিবারের একটি প্রতিবেদনে লিখেছে আসাহি শিমবুন।
জাপান সরকারের এই কমিটির সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন দেশটির শিল্পমন্ত্রী ইয়াতোশি নিশিমুরা এবং অর্থমন্ত্রী শিগেইয়ুকি গোতো।
এই সিদ্ধান্তের ফল কী হতে পারে?
জাপান এই আইন প্রয়োগ করতে পারলে সেটি গোটা বিশ্বেই স্মার্টফোন বাজারে ‘রিফল ইফেক্ট’ ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে, ইউরোপ সম্ভবত দ্রুততার সঙ্গে একই ধরনের উদ্যোগ নেবে।
গত কয়েক বছরে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে নানাভাবে বাজারে মনোপলি বা একচেটিয়া পরিস্থিতি তৈরি ও সেখান থেকে অস্বাভাবিক পরিমান অর্থ আয়ের রেওয়াজ দেখা গেছে। পাশাপাশি এই মনোপলি ব্যবহার করে নাগরিক ও শিশু অধিকারকে জেনেশুনে অবজ্ঞা করার অভিযোগও উঠেছে।
কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারিতে বেরিয়ে এসেছে, ফেইসবুক তার ব্যবহারকারী ও তাদের পরিচিতদের (যারা ফেইসবুকের ব্যবহারকারী নন, তাদেরও) ডেটা বিক্রি করেছে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কাছে যারা ওই ডেটা ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করার জন্য ব্যবহার করেছে। ফেইসবুকেরই অপর প্ল্যাটফর্ম ইনস্টাগ্রামের অ্যালগরিদম যে টিনএজারদের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এটা নিজেদের গবেষণার মাধ্যমে জানার পরও তারা সেটি চালিয়ে গেছে।
গুগল প্রতিনিয়ত ব্যবহারকারীর অজান্তেই তাদের ডেটা সেংগ্রহ করে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই ডেটা কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার হয় সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ব্যবহারকারীর পক্ষে পাওয়া সম্ভব হয় না। এই ডেটা অপব্যবহার আড়াল করার জন্য গুগল ইচ্ছা করেই গোটা ডেটা ব্যবস্থা জটিল করে রেখেছে, এমন অভিযোগও উঠেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে।
ফেইসবুকের মালিক কোম্পানি মেটা ও গুগলের মালিক কোম্পানি অ্যালফাবেট নিজেদের প্রযুক্তি কোম্পানি দাবি করলেও এরা মূলত প্রযুক্তিনির্ভর বিজ্ঞাপন ব্যবসায়ী এবং এখান থেকেই তাদের সিংহভাগ আয় আসে।
অ্যাপল এখনও বিজ্ঞাপন বাণিজ্যে আসেনি। পাশাপাশি, ব্যবহারকারীর প্রাইভেসির প্রতি তাদের অঙ্গীকার অন্য দুটি জায়ান্টের তুলনায় ভালো দাবি করলেও, বাজারে একচেটিয়া অবস্থান তৈরিতে অ্যাপলের অবস্থান সম্ভবত সবচেয়ে কঠোর।
আটলান্টিকের দুই পাড়েই সরকার ও কর্তৃপক্ষ সম্ভবত সে কারণেই যে যে ক্ষেত্রে প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর একচেটিয়া প্রভাব রযেছে সেটি ভেঙে দেওয়ার জন্য প্রচলিত আইনের পাশাপাশি নতুন আইনও তৈরি করছে।
বাজারে একচেটিয়া প্রভাব নিয়ে ইউরোপ আমেরিকায় অনেক আগে থেকেই আইন আছে এবং নানা সময়ে তার প্রয়োগও দেখা গেছে। উদাহরণ হিসাবে ব্রাউজার বাণিজ্যে মাইক্রোসফটের বিরুদ্ধে ৯০-এর দশকে অ্যান্টিট্রাস্ট মামলার কথা বলা যায়।
তবে, কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারীর পর প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর একচেটিয়া অবস্থানের বিরুদ্ধে সরকারগুলো কঠোরতা বেড়েছে অনেকগুণ।
ফলে, অ্যাপ স্টোরের আয়ে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেওয়ার পথ পাওয়া গেলে সেটি সম্ভবত ইউরোপ, আমেরিকার পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য দেশও গ্রহন করবে।