Published : 30 Aug 2025, 11:07 AM
২৬ বছর বয়সী কার্তিক শ্রীনিবাস (ছদ্ম নাম) এখন অনলাইন বাজির কথা শুনলেই ভয়ে কাঁপেন। শুরুতে দ্রুত কিছু অর্থ উপার্জনের উত্তেজনা শেষ পর্যন্ত তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ফেলে পাঁচ বছরের নেশায়। প্রায় ছিনিয়ে নিয়েছিল তার সঞ্চয়, মানসিক শান্তি আর ভবিষ্যৎ।
বিবিসি লিখেছে, ২০১৯ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি রুপি বা ১৭ হাজার ডলার হারিয়েছেন শ্রীনিবাস। এ পরিমাণ অর্থের মধ্যে ছিল তার তিন বছরের আয়, সঞ্চয়, বন্ধু ও পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া ঋণও।
শ্রীনিবাস বলেছেন, “আমি সবকিছুই চেষ্টা করে দেখেছি। অ্যাপস থেকে শুরু করে স্থানীয় বুকিদের সঙ্গে, এমনকি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মেও। আমি একেবারে আসক্ত হয়ে পড়েছিলাম।”
২০২৪ সালের মধ্যে আর্থিক ক্ষতির মধ্যে গলাঅবধি ডুবে গিয়েছিলেন শ্রীনিবাস।
তার গল্পটি ভারতের এক সময়ের দ্রুত বিকাশমান ‘রিয়াল মানি গেইমস’ বা আরএমজি ইন্ডাস্ট্রির অন্ধকার দিকটিই তুলে ধরেছে, সেগুলোর পেছনে এক ভয়ংকর আসক্তির দিকও আছে। যেখানে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে নগদ অর্থ দিয়ে পোকার, ফ্যান্টাসি স্পোর্টস ও অন্যান্য গেইমে বাজি ধরে অনেকের জীবন নষ্ট হত।
কয়েক দিন আগে এসব গেইম নিষিদ্ধের জন্য একটি বিল পাস করেছে ভারত সরকার, যেখানে যুক্তি হিসেবে বলা হয়েছে, এসব গেইম দিন দিন আরও বেশি আসক্তিকর হয়ে উঠছিল ও মানুষের আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছিল।
নতুন আইন অনুসারে, এ ধরনের বেটিং বা রিয়াল মানি গেইম চালু করা বা চালাতে সহায়তা করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। যার শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ তিন বছর জেল ও এক কোটি রুপি পর্যন্ত জরিমানা। এসব গেইম প্রচার করলেও শাস্তি হতে পারে সর্বোচ্চ দুই বছর জেল ও ৫০ লাখ রুপি জরিমানা। তবে যারা গেইম খেলছেন বা বাজি ধরছেন তাদেরকে অপরাধী হিসেবে নয়, বরং ভুক্তভোগী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এমন পদক্ষেপকে মানুষকে অনলাইন জুয়া ও বেটিংয়ের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে রক্ষার উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে ভারত সরকার।
ভারতের আইটি মন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেছেন, অনলাইন অর্থের গেইম প্রায় ৪৫ কোটি ভারতীয়কে ক্ষতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। এর ফলে ২০ হাজার কোটি রুপির বেশি ক্ষতি হয়েছে এবং অনেকের মধ্যে ‘হতাশা ও আত্মহত্যার’ মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
তবে এসব তথ্য গত সপ্তাহে ভারতের পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হলেও এগুলোর সূত্র স্পষ্ট নয় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিবিসি।
এদিকে, অনলাইন গেইম ও বেটিং খাতে কাজ করা লোকজন বলছেন, এ নিষেধাজ্ঞা তাড়াহুড়ো করে নেওয়া এক সিদ্ধান্ত, যা একটি ভালোভাবে বেড়ে ওঠা খাতকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং এই নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সরকার যাদের সুরক্ষা দিতে চেয়েছিল, তারাই এখন বিপদে পড়বেন।
নিষেধাজ্ঞার আগে ভারতে প্রায় চারশটি ‘রিয়াল মানি গেইম’ স্টার্টআপ ছিল, যা বছরে প্রায় দুইশো ৩০ কোটি ডলার কর দিত এবং দুই লাখেরও বেশি লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছিল।
এসব কোম্পানির মধ্যে একটি ছিল ‘ড্রিম১১’, যেটি ভারতের জাতীয় ক্রিকেট দলেরও স্পন্সর ছিল।
নতুন আইনটি ভারতে অনলাইন বেটিং প্ল্যাটফর্ম নিষিদ্ধের প্রথম কেন্দ্রীয় আইন হলেও এই খাত দীর্ঘদিন ধরেই দেশটির সরকারের নজরদারির মুখে ছিল। আরও আগে নিজেদের রাজ্যে এসব গেইমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল ওড়িষ্যা, আসাম, অন্ধ্রপ্রদেশ ও তেলেঙ্গানার মতো কিছু রাজ্য।
২০২৩ সালে কেন্দ্র সরকার অনলাইন গেইমিং বেটের ওপর ২৮ শতাংশ করও বসিয়েছিল। এরপরও এ শিল্প খুব দ্রুতই বড় হয়েছে এবং এতে বড় বড় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ আসার পাশাপাশি বিখ্যাত তারকারাও এতে সমর্থন জুগিয়েছেন।
মুম্বাইভিত্তিক গেইমিং আইনজীবী জে সায়তা বলেছেন, যেসব কোম্পানি এ ধরনের অনলাইন গেইমে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে তাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সরকারের এ নিষেধাজ্ঞা।
তিনি বলেছেন, এই শিল্পে কিছু নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন ছিল। তবে আইনটি খুব তাড়াহুড়ো করে ও কোনো পরামর্শ ছাড়াই আনা হল।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ‘ড্রিম১১’, যার মূল্য আটশ কোটি ডলার এবং যা একসময় ভারতের ক্রিকেট দলের প্রধান স্পন্সরও ছিল। এদিকে, ‘মাই১১সার্কেল’ নামের আরেকটি স্টার্টআপও ক্ষতির মুখে পড়েছে, কোম্পানিটির মূল্য আড়াইশ কোটি ডলার, যেটি ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের পার্টনার। উভয় কোম্পানি নিজেদের রিয়াল মানি গেইমিং কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
এ শিল্পখাতের দাবি, আইনটি এমন গেইমও নিষিদ্ধ করেছে যেগুলোতে ‘মেধা বা কৌশল লাগে’ এবং এমন গেইমও নিষিদ্ধ করেছে, যা কেবল ‘ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে’। অথচ এই দুইয়ের মধ্যে তফাৎ অনেক বড়।

এর আগে, ভারতের বেশ কিছু উচ্চ আদালত বলেছিল, অনলাইন বিভিন্ন গেইমে দক্ষতা লাগে। ফলে এগুলো জুয়ার মতো নিষিদ্ধ হওয়া উচিত নয়।
কর্ণাটক ও তামিলনাড়ুতে আদালতগুলো একই কারণে নিজেদের রাজ্য পর্যায়ে এসব গেইমিং প্ল্যাটফর্মে নিষেধাজ্ঞা রদ করেছিল। আর ২০২২ সালে পাঞ্জাব ও হারিয়ানা হাইকোর্টের সেই রায়কে সমর্থন করেছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও, যেখানে মেনে নেওয়া হয়েছে যে ফ্যান্টাসি স্পোর্টস ‘দক্ষতার খেলা’।
ভারতের বিভিন্ন গেইমিং ফেডারেশন বলছে, ‘নিয়ন্ত্রিত ও দায়িত্বশীল ভারতীয় প্ল্যাটফর্মগুলো’ বন্ধ করে দিলে লাখ লাখ খেলোয়াড় অবৈধ নেটওয়ার্ক, বিদেশি জুয়া ওয়েবসাইট ও এমন অপারেটরদের কাছে চলে যাবে যারা কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা গ্রাহক সুরক্ষা দেয় না।
ভারতের অনেক শহরে এখনো স্থানীয় বুকির কাছে বাজি ধরা হয়ে থাকে, যারা কোনো নিয়ন্ত্রণ বা নজরদারি ছাড়াই কাজ করেন এবং অনেক সময় তাদের কার্যক্রম অনলাইন গেইমের চেয়েও খারাপ।
বাজি ধরার বিভিন্ন খবর বা লিঙ্ক সাধারণত হোয়াটসঅ্যাপ বা টেলিগ্রাম গ্রুপের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে একসঙ্গে শত শত ব্যবহারকারীর কাছে তা শেয়ার হয়। আর অনেকেই ভিপিএন ব্যবহার করে বিদেশি বিভিন্ন গেইমিং অ্যাপও চালান। ফলে সেগুলো নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
তবে ভারত সরকার বলেছে, বৈধ রিয়াল মানি গেইমিং বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এমন ‘অস্পষ্ট অ্যালগরিদম’ ব্যবহার করে, যা ব্যবহারকারীদের জন্য জেতাকে প্রায় অসম্ভব করে তোলে। আর এ কথাটি কিছু বিশেষজ্ঞও মেনে নিয়েছেন।
ভিডিও গেইমিং কোম্পানি ‘এনকোর গেইমস’-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা ভিশাল গোদাল বলেছেন, অনলাইন ‘রামি’র মতো গেইম প্রতিযোগিতায় অনেক সময় ব্যবহারকারীরা জানতেই পান না যে তারা নিজেদের অজান্তেই কম্পিউটার বটের সঙ্গে খেলছেন।
গোদাল আরও বলেছেন, এসব বটের অ্যালগরিদম এমনভাবে তৈরি যাতে প্ল্যাটফর্মই সবসময় জিতে যায় ও খেলোয়াড়দের জেতার সুযোগ খুব কম থাকে।
“এসব গেইম আসলে জুয়ার মতোই। ফলে এগুলোকে দক্ষতার খেলা বলা মদকে ফলের রস বলার মতোই।”
তবে শ্রীনিবাসের মতো অনেকেই এ নিষেধাজ্ঞা এত দ্রুত ও হঠাৎ হওয়ায় বিস্মিত হয়েছেন। এখন আর না খেললেও তিনি বলেছেন, জুয়ারের ক্ষতির বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এই সার্বিক নিষেধাজ্ঞার চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর হত।
“এসব অ্যাপে কিছু নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন ছিল। তবে এখন এগুলো বন্ধ হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।”