Published : 19 Jan 2026, 10:43 AM
কেউ ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করেন, কেউবা আবার শুরু করেন উচ্চকণ্ঠে তর্ক। মাঝেমধ্যে এ সংলাপে যোগ হয় গালিগালাজ বা অদ্ভুত সব কাল্পনিক গল্প। মানুষের চেতনার প্রদীপ যখন নিভে যাওয়ার কথা তখনই মস্তিষ্কের কিছু অংশ হুট করে জেগে উঠলে এই বিচিত্র পরিস্থিতির তৈরি হয়।
‘লড়াইটা সোয়া একটায় শুরু হবে। সবাই কি এর জন্য লাইন ধরে প্রস্তুত?’, ‘আমরা ফুড রুলেত খেলছি, ফুড রুলেত! হ্যাঁ, সেখানে বিষাক্ত এক্লেয়ার বা এক ধরনের মিষ্টি রয়েছে’, ‘সেই কুমিরটা যখন এডউইনার পা কামড়ে ছিঁড়ে নিল, তখনও সে কাঁদল না।”
উপরের এসব উক্তিই ডিওন ম্যাকগ্রেগরের অদ্ভুত ও অবচেতন জগতের কথা। তিনি ছিলেন মার্কিন গীতিকার ও ঘুমের মধ্যে প্রচুর কথা বলায় পারদর্শী লোক।
খাবার, বিচিত্র সব চরিত্র ও কাল্পনিক সব অদ্ভুত ঘটনা নিয়ে ঘুমের মধ্যে দীর্ঘ বক্তৃতার জন্য বন্ধু মহলে বেশ পরিচিত ছিলেন ম্যাকগ্রেগর। তার রাতের বেলার এসব সংলাপ তার রুমমেট ও বন্ধুদের কাছে এতটাই পরিচিত ও বিরক্তিকর ছিল যে, তারা সেগুলো রেকর্ড ও একটি অ্যালবাম তৈরি করেন, যা ১৯৬৪ সালে ‘ডেকা রেকর্ডস’ থেকে তা প্রথম প্রকাশ পায় বলে প্রতিবেদনে লিখেছে বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট পপুলার সায়েন্স।
কয়েক দশক পরে তার ঘুমের মধ্যে বলা এসব কথা আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্লেষণ করেন মনোবিজ্ঞানীদের একটি দল। ঘুমের ঘোরে কথা বলাটা বিস্ময়করভাবে অনেক বেশি সাধারণ বিষয়।
পরিসংখ্যান অনুসারে, ঘুমের মধ্যে কথা বলার হার ভিন্ন ভিন্ন হলেও প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষ দাবি করেন, জীবনে অন্তত একবার হলেও ঘুমের মধ্যে কথা বলেছেন তারা।
‘ইতালির সাপিয়েনজা ইউনিভার্সিটি অফ রোম’-এর মনোবিজ্ঞানী ও ঘুম গবেষক লুইজি ডি জেনারো বলেছেন, জনসংখ্যার প্রায় ৩ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ নিয়মিত ঘুমের মধ্যে কথা বলেন। এ অভ্যাসটি শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যা সম্ভবত মা-বাবা তাদের সন্তানদের ঘুমানো পর্যবেক্ষণ করেন বলে তা বেশি ধরা পড়ে। তবে বড় হওয়ার পরও এ অভ্যাস থেকে যেতে পারে।
ডি জেনারোর মতে, মানুষ ঘুমের মধ্যে যা যা করে, তার মধ্যে ঘুমের ঘোরে কথা বলা অন্যতম সাধারণ একটি আচরণ।
কিন্তু কেন আমরা ঘুমের সময়টাতেও মুখ বন্ধ রাখতে পারি না? আর আমাদের অবচেতন মন ঘুমের ঘোরে ঠিক কী শেয়ার করার জন্য এত মরিয়া হয়ে ওঠে? জেনে নেওয়া যাক–
মানুষ কেন ঘুমের মধ্যে কথা বলে?
মানুষ ঘুমের যে কোনো পর্যায়েই কথা বলতে পারে, তা সে গভীর স্বপ্ন দেখার সময় বা ‘আরইএম স্লিপ’ হোক বা স্বপ্নহীন হালকা ঘুমের সময় বা ‘নন আরইএম’ হোক না কেন। তবে স্বপ্নহীন ঘুমের মধ্যেই এমনটি বেশি ঘটে।
ম্যাকগ্রেগরের ঘুমের কথার ওপর গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ২০০১ সালে প্রকাশিত ‘কমিটি অফ স্লিপ’ বইয়ের লেখক ও ‘হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি’র মনোবিজ্ঞানী ও স্বপ্ন গবেষক ডেইড্রে ব্যারেট।
গবেষক ব্যারেট বলেছেন, স্বপ্ন দেখার সময় চোখের নড়াচড়া ছাড়া শরীরের বাকি সব অংশ সাময়িকভাবে অবশ বা প্যারালাইজড থাকে। ফলে এ সময়ে কেউ কথা বললে বুঝতে হবে, নড়াচড়া বন্ধ রাখার জন্য মস্তিষ্ক থেকে যে সংকেত যাওয়ার কথা ছিল তাতে কোনো গোলযোগ হয়েছে।
অন্যদিকে, ঘুমের সময় শরীর অবশ থাকে না। ব্যারেট বলেছেন, এ পর্যায়ে ঘুমের ঘোরে কথা বলার কারণ ভাষার সঙ্গে জড়িত মস্তিষ্কের কিছু অংশ আংশিকভাবে জেগে ওঠে, যা ইইজি যন্ত্রের সাহায্যে শনাক্ত করা সম্ভব।
“ওই সময়ে মানুষের পুরো মস্তিষ্ক জেগে ওঠে না, তবে মস্তিষ্কের ছোট ছোট কিছু অংশ বা কিছু মুহূর্ত সাধারণ ঘুমের চেয়ে জাগ্রত অবস্থার মতো দেখায়।”
এ তত্ত্বটি অন্যান্য গবেষণার সঙ্গেও মেলে, যেখানে বলা হয়েছে, ঘুমের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যা সাধারণত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কিছু অংশে ‘জেগে থাকার মতো’ অস্বাভাবিক আচরণের কারণে ঘটে।
তবে ঠিক কী কারণে মস্তিষ্ক এভাবে জেগে ওঠে ও কোন পর্যায়ে গেলে মানুষ কথা বলে ওঠে সে সম্পর্কে এখনও খুব কম তথ্যই জানা গেছে।
ঘুমের ঘোরে আমরা আসলে কী বলি?
ঘুমের মধ্যে কথা বলাটা কখনো অস্পষ্ট বিড়বিড়ানি থেকে শুরু করে আবার কখনো পূর্ণ গলার চিৎকার বা বকবকানিও হতে পারে। তবে আমাদের মধ্যে বিশাল সংখ্যার মানুষ যে ঘুমের মধ্যে কথা বলে তা জানার একমাত্র উপায় যখন অন্য কেউ আমাদের সেটা জানায়।
ডি জেনারো বলেছেন, “মানুষ এই ব্যাপারে পুরোপুরি স্মৃতিভ্রমের শিকার থাকে। তারা যে কথা বলছে সে সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণাই থাকে না।”
আমরা ঘুমের কথার ওপর যেসব তথ্য পাই তার সবই আসে পরোক্ষভাবে, বিশেষ করে হয় রেকর্ডিং থেকে বা ঘুমের ওপর করা বিভিন্ন গবেষণা থেকে। অল্প কিছু গবেষণায় আমাদের ঘুমের কথার বিষয়বস্তু তালিকাভুক্তের চেষ্টাও হয়েছে।
ম্যাকগ্রেগরের রাতের বেলার বিভিন্ন চিন্তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের পর গবেষকরা দেখেছেন, তার এই একা কথা বলার ধরনটি একজন সাধারণ মানুষের দেখা স্বপ্নের মতোই অদ্ভুত ছিল। তবে চরিত্রের গঠন ও আবেগের দিক থেকে এগুলো সামান্য আলাদা ছিল, যা মনোবিজ্ঞানীরা তার ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য বলেই মনে করেন।
বড় পরিসরে গবেষণা করে আরও কিছু নতুন প্রবণতা দেখা গেছে। গবেষণায় একটি অ্যাপের মাধ্যমে বাড়িতে রেকর্ড করা হাজার হাজার মানুষের ঘুমের কথা বিশ্লেষণ করেছেন ব্যারেট। এসব ঘুমের কথাকে মানুষের নিজের বলা স্বপ্নের বিষয়বস্তু ও জেগে থাকা অবস্থার কথাবার্তার সঙ্গে তুলনা করেছেন তিনি।
ব্যারেট বলেছেন, কয়েকটি ক্ষেত্রে ঘুমের মধ্যে কথা বলার বিষয়টি একদম আলাদা। স্বপ্ন বা জেগে থাকা অবস্থার তুলনায় ঘুমের ঘোরে বলা কথায় নেতিবাচক আবেগ, রাগ, শারীরিক কাজ, খাবার ও যৌনতার উল্লেখ অনেক বেশি থাকে।
জেগে থাকা অবস্থার কথাবার্তা ও ঘুমের ঘোরের কথার মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি ছিল গালিগালাজের পরিমাণ। ব্যারেটের সংগৃহীত তথ্যে দেখা গেছে, মানুষ জেগে থাকা অবস্থার তুলনায় ঘুমের মধ্যে প্রায় ছয় গুণ গালি দেয়।
“এসব কথার কিছু কিছু শুনলে সত্যিই মনে হয় যেন কেউ গালি দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।”
এসব পর্যবেক্ষণকে আরও জোরালো করেছে ২০১৭ সালে ‘স্লিপ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা। ওই গবেষণায় ২৩২ জন মানুষের রাতের বেলার ৮৮৩টি বক্তব্য বা উক্তি তালিকাভুক্ত করেছিলেন গবেষকরা।
তারা বলছেন, ঘুমের ঘোরে বলা শব্দগুলোর মধ্যে ‘না’ ছিল সবচেয়ে সাধারণ ও স্পষ্ট শব্দ। এ ছাড়া তাদের বলা বিভিন্ন বাক্যের ২১ শতাংশেরও বেশি ছিল কোনো কিছু অস্বীকার বা নেতিবাচকতা সংক্রান্ত। ঘুমের কথার চার ভাগের এক ভাগেরও বেশি ছিল বিভিন্ন প্রশ্নবোধক শব্দ বা বাক্য।
সবশেষে গবেষণাটিপত্রটিতে বলা হয়েছে, ঘুমের মধ্যে বলা কথার প্রায় ১০ শতাংশই ছিল গালিগালাজ ও একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল কাউকে বা কোনো কিছুকে অপমান করার মতো কথাবার্তা। তবে এর মানে এই নয় যে, আমরা সবাই মনে মনে কাউকে গালি দেওয়ার জন্য বা খারাপ কথা বলার জন্য ছটফট করছি।
গবেষক ব্যারেট বলেছেন, আমরা জেগে থাকা অবস্থায় যা বলি, তার চেয়ে ঘুমের ঘোরের বিভিন্ন কথা যে বেশি সত্য বা এগুলো মনের ভেতরের কোনো গোপন কথা এমন কোনো প্রমাণ নেই।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে যারা ঘুমের মধ্যে কথা বলেন তারা ‘আসলে বাস্তব জগতের সঙ্গে খুব একটা জড়িয়ে থাকেন না’। প্রায়ই দেখা যায়, ঘুমের ঘোরে বলা স্পষ্ট বিভিন্ন বাক্যেরও কোনো অর্থ হয় না, আর সেগুলো গভীর কোনো আবেগঘন স্বীকারোক্তি হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।