Published : 14 Jan 2026, 12:21 PM
মহাকাশের গভীরে এক মৃত তারা থেকে বেরিয়ে আসছে রহস্যময় তরঙ্গ, যা হতবাক করেছে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের।
তারা থেকে নির্গত গ্যাস ও ধূলিকণা এর আশপাশে থাকা পদার্থের ওপর সজোরে আছড়ে পড়ে। ফলে মহাবিশ্বজুড়ে এক শক্তিশালী শকওয়েভ বা তরঙ্গ ছড়িয়ে পড়ে। বিষয়টি অনেকটা শান্ত পুকুরে বড় পাথর ছোড়ার মতো বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ দৈনিক ইন্ডিপেনডেন্ট।
তবে এবার বিজ্ঞানীরা যে তরঙ্গটি দেখেছেন, তা আগের সব পর্যবেক্ষণ থেকে আলাদা। মৃত তারা থেকে এমন অপূর্ব সুন্দর তরঙ্গ এর আগে কেউ দেখেনি। মহাকাশ বিজ্ঞানের প্রচলিত তত্ত্ব অনুযায়ী এমন ঘটনা ঘটার কথা নয়। এই নজিরবিহীন আবিষ্কার শুধু গবেষকদের অবাকই করেনি, মহাবিশ্ব সম্পর্কে দীর্ঘদিনের ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
গবেষণার নেতৃত্বে থাকা ডারহাম ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক সাইমন স্কারিংগি বলেন, “আমরা এমন কিছুর সন্ধান পেয়েছি যা আগে কখনও দেখা যায়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, পুরো ঘটনাটিই আমাদের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত।”
নিকোলাস কোপার্নিকাস অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সেন্টারের গবেষক ক্রিস্টিয়ান ইলকিউইচ বলেন, “আমাদের পর্যবেক্ষণে এমন এক শক্তিশালী প্রবাহ ধরা পড়েছে, যা আমাদের বর্তমান ধারণা অনুযায়ী সেখানে থাকার কথা নয়।”
গবেষণাটি চালানো হয়েছে পৃথিবী থেকে প্রায় ৭৩০ আলোকবর্ষ দূরে থাকা ‘আরএক্সজে০৫২৮+২৮৩৮’ নামের এক তারাকে ঘিরে। সূর্য যেমন মিল্কিওয়েকে কেন্দ্র করে ঘোরে, এই তারাটিও তেমনভাবেই আমাদের ছায়াপথ প্রদক্ষিণ করেই চলছে। পরিচিত এই গতিপথের মধ্যেই তারা থেকে আসছে অচেনা সব সংকেত।
মহাকাশে চলার সময় তারাটি এক ধরনের তরঙ্গ বা শকওয়েভ তৈরি করছে, ঠিক যেমন নৌকা পানির বুক চিরে এগিয়ে গেলে দুপাশে ঢেউ তৈরি হয়। সাধারণত এ ধরনের ঢেউ তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় পদার্থ তারার ভেতর থেকেই বেরিয়ে আসে। কিন্তু বিজ্ঞানীদের ধারণা অনুযায়ী, এই তারাটির ক্ষেত্রে সেভাবে পদার্থ নির্গত হওয়ার কথা নয়।
অধ্যাপক স্কারিংগি বলেন, “শান্ত ও চাকতিহীন একটি তারামণ্ডলী যে এমন দর্শনীয় নীহারিকা তৈরি করতে পারে, তা আমাদের জন্য বিরল সেই মুহূর্তগুলোর একটি। আমরা তখন শুধু অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকেছি।”
এই তরঙ্গ থেকে পাওয়া তথ্য বলছে, মৃত তারাটি অন্তত এক হাজার বছর ধরে ক্রমাগত পদার্থ নির্গত করে চলেছে। কীভাবে এটি সম্ভব হচ্ছে, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত নন গবেষকরা। তবে তাদের ধারণা, তারাটির ভেতরে এমন কোনো শক্তির উৎস লুকিয়ে আছে, যা এখনো শনাক্ত করা যায়নি।
ইলকিউইচ বলেন, “এই আবিষ্কার দেখায় যে, কোনো গ্যাসীয় চাকতি ছাড়াও তারামণ্ডলীগুলো শক্তিশালী প্রবাহ তৈরি করতে পারে। এটি এমন এক প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়, যা আমরা এখনও পুরোপুরি বুঝতে পারিনি।” তার মতে, এই পর্যবেক্ষণ চরম বাইনারি সিস্টেম বা জোড়া তারার মধ্যে পদার্থ কীভাবে চলাচল করে এবং একে অপরের ওপর কী প্রভাব ফেলে, সে বিষয়ে প্রচলিত ধারণাকেও চ্যালেঞ্জ করছে।
গবেষকরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এমন আরও উদাহরণ পাওয়া যাবে, যা এই রহস্যময় প্রক্রিয়ার কার্যকারণ বুঝতে সাহায্য করবে। তাদের মতে, আসন্ন ‘এক্সট্রিমলি লার্জ টেলিস্কোপ’ এই রহস্যময় শক্তির উৎস খুঁজে বের করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’-তে।