দেড়শ বছর আগে মানুষের দেহের তাপমাত্রা বেশি ছিল, কিন্তু কেন?
উনিশ শতকের শুরুর দিকের আমেরিকান পুরুষদের তুলনায় বর্তমান পুরুষদের দেহের তাপমাত্রা প্রায় ০.৫৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম।
দেড়শ বছর আগের তুলনায় বর্তমান মানুষের দেহের গড় তাপমাত্রা অনেকটাই কমেছে বলে ধারণা গবেষকদের। কেন এমন পরিবর্তন ঘটছে তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা এখনও নানা ব্যাখ্যা ও প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন।
১৮৬০-এর দশকে জার্মানির খ্যাতনামা চিকিৎসক কার্ল ভনডারলিখ এক বিশেষ জিজ্ঞাসার মুখে পড়েছিলেন। জ্বর কি কেবলই কোনো রোগের উপসর্গ না কি নিজেই আলাদা একটি রোগ?
বিবিসি লিখেছে, এমন সময়ে তিনি এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে শুরু করেছিলেন যখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে থার্মোমিটারের ব্যবহার নিয়মিত বিষয় ছিল না।
টানা ১৫ বছর ধরে তিনি সব বয়সি ও নারী-পুরুষ মিলিয়ে প্রায় ২৫ হাজার রোগীর দেহের তাপমাত্রা পরিমাপের বড় উদ্যোগ নিয়েছেন। তার এই গবেষণার ঝুলিতে জমা হয় ১০ লাখেরও বেশি রিডিং।
এই বিশাল তথ্যভাণ্ডার বিশ্লেষণ করে ভনডারলিখ সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের গড় তাপমাত্রা হিসাব করেন ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট। আর এ তথ্যই পরবর্তী সময়ে মানুষের স্বাভাবিক তাপমাত্রার সর্বজনীন মাপকাঠি হয়ে ওঠে।
তিনি বলেছিলেন, দেহের তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (১০০.৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ওপরে উঠলেই তাকে জ্বর হিসেবে ধরে নিতে হবে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড’-এর চিকিৎসাবিজ্ঞান ইতিহাসবিদ ও সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ফিলিপ ম্যাকাউইয়াক বলেছেন, ভনডারলিখের আগেই অনেকে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছালেও তার সংগৃহীত তথ্যভাণ্ডার এতটাই বড় যে, তার দেওয়া পরিসংখ্যান বিশ্বজুড়ে ‘উচ্চ মর্যাদার’ ডায়াগনস্টিক টুল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
তবে সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া একাধিক গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, গত দেড়শ বছরে মানুষের স্বাভাবিক দেহের গড় তাপমাত্রা ক্রমশ কমেছে।
এ তথ্যের পর নতুন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তবে কি ভনডারলিখের দেওয়া মূল হিসাবটিই ভুল ছিল? নাকি দ্রুত পরিবর্তনশীল এ বিশ্ব মানুষের শারীরিক গঠন ও বৈচিত্র্যকেও বদলে দিচ্ছে?
তাপমাত্রা কমে যাওয়ার রহস্য
‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র সংক্রামক রোগ বিষয়ক বিশেষজ্ঞ জুলিয়ে পারসনেট বলেছেন, “দেহের তাপমাত্রার তারতম্য সম্পর্কে আমরা আজ যা যা সত্য বলে জানি, তার বড় অংশই প্রতিষ্ঠা করে গেছেন ভনডারলিখ।”
জার্মানির ‘লাইপজিগ হসপিটাল’-এর মেডিকেল ডিরেক্টর হিসেবে ভনডারলিখ যেসব শ্রমজীবী রোগীর দেহ থেকে রিডিং নিয়েছিলেন তা বিশ্লেষণ করেই তিনি প্রথম বুঝতে পারেন, মানুষের স্বাভাবিক তাপমাত্রা স্থির নয়, বরং স্থান-কাল ভেদে পরিবর্তিত হয়।
পুরুষদের তুলনায় নারীদের দেহের তাপমাত্রা বেশি, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাপমাত্রা কমতে থাকে ও দিনের সময়ের ওপর নির্ভর করেও এতে কম-বেশি ঘটে।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ১৫০ বছর আগের মানুষের তুলনায় আধুনিককালের মানুষের দেহ তুলনামূলক বেশি ঠান্ডা। উনিশ শতকের শুরুর দিকের আমেরিকান পুরুষদের তুলনায় বর্তমান পুরুষদের দেহের তাপমাত্রা প্রায় ০.৫৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম।
প্রায় এক দশক আগে পারসনেটের গবেষণা দল ১৮৬২ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গৃহীত প্রায় ১ লাখ ৯০ হাজার মানুষের তাপমাত্রা সংক্রান্ত তিনটি বড় ডেটাসেট বিশ্লেষণ করেছে।
গবেষণার ফলাফল তুলে ধরে পারসনেট বলেছেন, “বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্কদের দেহের জন্য ‘নতুন স্বাভাবিক’ বা নতুন গড় তাপমাত্রা ৩৬.৩৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা প্রায় ৯৭.৫ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি।”
পারসনেটের এই গবেষণার আগেও এবং পরে হওয়া অসংখ্য গবেষণায় দেহের তাপমাত্রা কমে যাওয়ার এই ধারাবাহিক প্রবণতা স্পষ্ট ধরা পড়েছে।
উন্নত বিশ্বের উন্নত জীবনযাত্রায় থাকা মানুষের মধ্যেই এই পরিবর্তনের প্রবণতা আটকে নেই।
সুইজারল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অফ জুরিখ’-এর বায়োলজিক্যাল অ্যানথ্রপোলজিস্ট আর্ড্রিয়ান জাগি বলেছেন, ২০০০-এর দশকের শুরুতে অ্যামাজন রেইনফরেস্টে বসবাসকারী আধাযাযাবর আদিবাসী গোষ্ঠী ‘সিমানে’দের গড় শারীরিক তাপমাত্রা ছিল ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি।
কেবল দুই দশকের দ্রুত আর্থ-সামাজিক পরিবর্তনের পর, ২০১৮ সালে এসে তাদের গড় তাপমাত্রা কমে দাঁড়ায় ৩৬.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৭.৭ ডিগ্রি ফারেনহাইটে।
তাপমাত্রা কমার পেছনে সম্ভাব্য কারণ ও থার্মোমিটারের বিভ্রান্তি
আধুনিক মানুষের দেহের গড় তাপমাত্রা কমে যাওয়ার পেছনে বেশ কিছু সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছেন গবেষকরা।
‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র বিশেষজ্ঞ জুলিয়ে পারসনেট বলেছেন, সার্বিকভাবে মানুষের স্বাস্থ্যগত উন্নতির ফলেই এ পরিবর্তন এসেছে। ভনডারলিখের যুগে মানুষের গড় আয়ু ছিল ৩৮ বছর, যা বর্তমান যুগে এসে প্রায় দ্বিগুণে দাঁড়িয়েছে।
“সে আমলে মানুষ আজকের মতো স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন করতে পারত না। তাদের দেহে যক্ষ্মা, দাঁতের সমস্যা, আমাশয়, বাতজ্বর ও অস্টিওমাইলাইটিসের মতো একাধিক শারীরিক জটিলতা লেগে থাকত।
“দেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা মারাত্মক সব রোগের বিরুদ্ধে লড়াই চালালে অনেক ক্যালরি খরচ হয়। আর ক্যালরির অপর নামই তাপ।”
একইভাবে অ্যামাজনের আদিবাসী ‘সিমানে’ সম্প্রদায়ের বিষয়ে ‘জুরিখ ইউনিভার্সিটি’র আর্ড্রিয়ান জাগি বলেছেন, টিকাদান কর্মসূচি ও উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে তাদের স্বাস্থ্যে বড় পরিবর্তন এসেছে।
কুড়ি বছর আগের তুলনায় সেখানে টয়লেটের ব্যবহার ও জুতা পরার প্রবণতা বেড়েছে। খালি পায়ে হাঁটার অভ্যাস কমায় দূষিত মাটি থেকে হওয়া সংক্রমণের হারও অনেক কমেছে।
এ ছাড়া, গৃহস্থালি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত ৮৮ শতাংশ ঘরে এয়ার কন্ডিশনার রয়েছে ও যুক্তরাজ্যের সিংহভাগ বাড়িতে রয়েছে সেন্ট্রাল হিটিং ব্যবস্থা।
পারসনেট বলেছেন, “আমাদের জীবনের সিংহভাগ সময় কাটে এমন এক নিখুঁত আবহাওয়ায়, যাকে বলে ‘থার্মাল-নিউট্রাল জোন’, যেখানে দেহের তাপমাত্রা ধরে রাখতে বাড়তি কোনো কসরত করতে হয় না। আর দেহকে যদি বাড়তি কাজ করতে না হয় তবে শক্তি যেমন তৈরি হয় না, তাপও উৎপন্ন হয় না।”
ভনডারলিখের হিসাব কি তবে ভুল ছিল?
‘ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ড’-এর চিকিৎসাবিজ্ঞান ইতিহাসবিদ ফিলিপ ম্যাকাউইয়াক বলেছেন, দেহের গড় তাপমাত্রা কমার পেছনে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো কারণ থাকতে পারে।
ভনডারলিখের ব্যবহৃত কাঁচের বিভিন্ন থার্মোমিটার সরাসরি পরীক্ষার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে ম্যাকাউইয়াক বলেছেন, সেসব যন্ত্রের ক্যালিব্রেশন বা পরিমাপ স্কেল আধুনিক থার্মোমিটারের চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। মানে, ওই সময়কার যন্ত্রে নেওয়া যে কোনো তাপমাত্রা প্রকৃত মাত্রার চেয়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি দেখা যেত।
ম্যাকাউইয়াক বলেন, সে আমলে তাপমাত্রা মাপা ছিল বেশ জটিল এক প্রক্রিয়া। ফুটন্ত পানি ও গলানো বরফ দিয়ে প্রায় এক ফুট লম্বা পারদপূর্ণ বিভিন্ন থার্মোমিটারের স্কেল আগে থেকে নির্ধারণ করা হত।
এরপর রোগীকে ১৫ থেকে ২০ মিনিট স্থির হয়ে শুয়ে থাকতে হত। কারণ ‘থার্মোমিটারে তাপমাত্রা উঠতে দীর্ঘ সময় লাগত’।
ভনডারলিখের মূল পরিসংখ্যানটি শুরু থেকেই ত্রুটিপূর্ণ ছিল বলে ধারণা ম্যাকাউইয়াকের।
এ ছাড়া তিনি বগলের নিচের তাপমাত্রা পরিমাপ করেছিলেন, যা আধুনিককালের মুখে নেওয়া পদ্ধতির চেয়ে আলাদা। ফলে ভনডারলিখের ডেটার সঙ্গে বর্তমান তথ্যের হুবহু তুলনা করা কঠিন।
তবে পারসনেট থার্মোমিটারের ত্রুটিকে দায়ী করতে নারাজ।
১৮৬২ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সেনাদের কাছ থেকে সংগৃহীত ডেটা বিশ্লেষণ করে তার দল দেখেছে, অপেক্ষাকৃত আগে জন্ম নেওয়া ব্যক্তিদের গড় তাপমাত্রা আগের প্রজন্মের চেয়ে সত্যিই বেশি ছিল।
“যেহেতু আমরা একই সময়ে ভিন্ন ভিন্ন জন্মবছরের ও ভিন্ন সময়ে একই জন্মবছরের মানুষদের তাপমাত্রা তুলনা করেছি ফলে থার্মোমিটারের প্রভাব থেকে বয়স ও জন্মবছরের মূল পার্থক্য আলাদা করা সম্ভব হয়েছে।”
পরবর্তীকালে ১৯৭১ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যকার দুটি আধুনিক ডেটাসেট বিশ্লেষণ করেও একইরকম কমার প্রবণতা দেখতে পান পারসনেটের গবেষকরা।
সেই যুগে একই ধরনের ক্যালিব্রেশনের থার্মোমিটার ব্যবহার করার পরও এ ফলাফল মিলছিল।
তাপমাত্রার নতুন নির্দেশিকা
এসব গবেষণার পর তবে কি ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা ৯৮.৬ ডিগ্রি ফারেনহাইটকে সর্বজনীন মাপকাঠি হিসেবে দেখার দিন শেষ?
চিকিৎসকদের মাধ্যমে বহুল ব্যবহৃত দুটি নির্ভরযোগ্য উৎস ‘হ্যারিসন’স প্রিন্সিপলস অফ ইন্টারনাল মেডিসিন’ বই ও ‘আপটুডেট’ অনলাইন ডেটাবেইস এরইমধ্যে এই ধারণায় পরিবর্তন এনেছে।
তবে দেহের স্বাভাবিক তাপমাত্রার একটি ভিত্তি থাকা দরকারি হলেও কোনো একক নির্দিষ্ট সংখ্যার ওপর অতিরিক্ত জোর না দেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
জাগি বলেছেন, “এ ধরনের পরিমাপকে কঠোর কোনো সীমারেখা হিসেবে না দেখাই শ্রেয়। ৩৬.৯৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস আর ৩৭.০১ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে খুব বড় কোনো মৌলিক পার্থক্য রয়েছে এমন দাবি কেউ করবে না।”
দেহের তাপমাত্রা অতিরিক্ত কমে গেলে বা খুব বেশি বেড়ে গেলে প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (৯৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট) নিচে বা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের (১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট) ওপরে উঠলে তা দেহে বড় কোনো জটিলতারই স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
