০৭ নভেম্বর ২০২৬, ২৩ কার্তিক ১৪৩৩

সাইবেরীয় সমাধি বলছে ২৮০০ বছর আগেও গাঁজার প্রচলন ছিল

গাঁজা বহুমুখী উদ্ভিদ, যা ফাইবার বা আঁশ ও তেলবীজ উৎপাদনের পাশাপাশি দীর্ঘ হাজার হাজার বছর ধরে সাইকোঅ্যাকটিভ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

সাইবেরীয় সমাধি বলছে ২৮০০ বছর আগেও গাঁজার প্রচলন ছিল

প্রাচীন সাইবেরীয় সমাধিতে উদ্ধার হওয়া মানুষের চুলের বেণীতে গাঁজার রাসায়নিক উপাদানের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে। ছবি: রয়টার্স

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 07 Nov 2026, 04:10 PM

Updated : 07 Nov 2026, 04:10 PM

রাশিয়ার সুদূর ত্যভা প্রজাতন্ত্রের উয়ুক উপত্যকায় আবিষ্কৃত প্রায় ২৮০০ বছরের পুরনো এক প্রাচীন স্কিথিয়ান সমাধিসৌধ থেকে মাদক উপাদান হিসেবে গাঁজা ব্যবহারের সবচেয়ে প্রাচীনতম প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষণায় উঠে এসেছে, ওই প্রাচীন সমাধির ভেতরে থাকা বিভিন্ন পরলৌকিক বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সামগ্রীর মধ্যে গাঁজার বীজ ও সে সময়ের মানুষের চুলে এ উদ্ভিদের রাসায়নিক উপস্থিতির শক্ত প্রমাণ মিলেছে।

গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স’-এ।

রয়টার্স লিখেছে, এ গবেষণার মাধ্যমে প্রাচীন মানুষের মাদক ব্যবহারের ইতিহাসের এক নতুন দুয়ার খুলল। প্রায় ৪৬০ ফুট ব্যাসওয়ালা এই বড় আকৃতির সমাধিটি ছিল দক্ষিণ সাইবেরিয়ার তৎকালীন স্কিথিয়ান সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের শেষ শয়নস্থল।

ইউরেশীয় তৃণভূমিতে ঘোড়ার পিঠে যুদ্ধকৌশল, স্বর্ণশিল্প ও যাযাবর জীবনধারার জন্য ইতিহাসজুড়ে বিশেষ খ্যাতি ছিল স্কিথিয়ান সংস্কৃতির।

গাঁজা বহুমুখী উদ্ভিদ, যা ফাইবার বা আঁশ ও তেলবীজ উৎপাদনের পাশাপাশি দীর্ঘ হাজার হাজার বছর ধরে সাইকোঅ্যাকটিভ উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নেশাজাতীয় দ্রব্যগুলোর মধ্যে গাঁজা অন্যতম। তবে উদ্ভিদের অংশবিশেষ দ্রুত পচনশীল হওয়ায় অতীতে এর ব্যবহারের সঠিক ইতিহাস উদঘাটন করা গবেষকদের জন্য বরাবরই বেশ কঠিন ছিল।

এ গবেষণার প্রধান লেখক, সুইজারল্যান্ডের ‘ইউনিভার্সিটি অফ বার্ন’ ও জার্মানির ‘ম্যাক্স প্ল্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট অফ জিওঅ্যানথ্রপোলজি’র প্রত্নতত্ত্ববিদ জিনো কাসপারি বলেছেন, “অতীতে বিভিন্ন যুগে মাদকদ্রব্যের ব্যবহার নিয়ে অনেক জল্পনা-কল্পনা প্রচলিত রয়েছে।

Image

বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত নেশাজাতীয় দ্রব্যগুলোর মধ্যে গাঁজা অন্যতম। ছবি: রয়টার্স

“তবে কোনো নির্দিষ্ট উদ্ভিদ যে ঠিক এই উদ্দেশ্যেই সেবন করা হয়েছিল এমন কংক্রিট প্রমাণ আমরা কেবল বিরল ক্ষেত্রেই পেয়ে থাকি।

“এর মূল কারণ উদ্ভিদের অবশিষ্টাংশ ও মানুষের নরম টিস্যু সাধারণত দীর্ঘকাল টিকে থাকে না। আর একইসঙ্গে একই পারিপার্শ্বিকতায় উভয়ের অবিকৃতভাবে সংরক্ষিত থাকার ঘটনা আরও বেশি দুর্লভ।

“আমাদের নতুন গবেষণাটিই মাদক উপাদান হিসেবে গাঁজা সেবনের সবচেয়ে প্রাচীন ও সরাসরি প্রমাণ তুলে ধরেছে।”

সুনির্দিষ্ট সমাধিস্থল ও জটিল অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আচার-অনুষ্ঠানের প্রেক্ষাপট থেকে এসেছে বলেই এ আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ।

এর আগে, মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার পামির পর্বতমালার অঞ্চলগুলোতে গাঁজা পোড়ানোর পাত্রের প্রথম সহস্রাব্দের যেসব প্রাচীন প্রমাণ মিলেছিল, এই সাইবেরীয় আবিষ্কারটি সেগুলোর চেয়েও বেশ পুরনো।

সাইবেরিয়ার ওই সমাধি থেকে গবেষক দল ১ হাজার ৪০০টিরও বেশি গাঁজার বীজ উদ্ধার করেছে। আধুনিক বৈজ্ঞানিক ডেটিং প্রযুক্তির মাধ্যমে গবেষকরা নিশ্চিত হয়েছেন, এগুলো খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দীর প্রথমার্ধের।

সমাধিতে এসব সামগ্রীর উপস্থিতি সম্পর্কে প্রত্নতত্ত্ববিদ জিনো কাসপারি বলেছেন, “এই অঞ্চলে জীবিত মানুষের কাছে যেসব জিনিস মূল্যবান বলে বিবেচিত হত পরকালের অর্ঘ্য হিসেবে সেগুলোই সমাধিক্ষেত্রে দিয়ে দেওয়া হত।”

প্রাচীন স্কিথিয়ানদের সেই বিশ্বাস ও আচারই উন্মোচন করে দিল মানবসভ্যতার প্রাচীন মাদক ব্যবহারের হাজার বছরের রহস্য।

চুলের বিনুনির মধ্যে মিলল প্রমাণ

প্রাচীন সাইবেরীয় সমাধিতে উদ্ধার হওয়া মানুষের চুলের বেণীতে গাঁজার রাসায়নিক উপাদানের স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে।

মূল সমাধিকক্ষে সংরক্ষিত বেশ কয়েকজন মানুষের মরদেহের বেণী করা চুল রাসায়নিক বিশ্লেষণ করে ক্যানাবিসের প্রধান সাইকোঅ্যাকটিভ উপাদান ‘টিএইচসি’ ও টিএইচসি-সম্পর্কিত যৌগ ‘ক্যানাবিনল’-এর উপস্থিতি নিশ্চিত করেছেন গবেষকরা।

প্রত্নতত্ত্ববিদ জিনো কাসপারি বলেছেন, “মানুষের দেহ টিএইচসি ও সিবিডির মতো ক্যানাবিস-সম্পর্কিত অণুগুলোকে চুলে জমা করে রাখে। এই বিজ্ঞানের ওপর ভিত্তি করেই আধুনিক ডোপ টেস্ট বা ড্রাগ টেস্ট কাজ করে।

“কেবলমাত্র চুলের নমুনা বিশ্লেষণ করে তারা কীভাবে এটা সেবন করেছিলেন তা নিখুঁতভাবে বলা কঠিন। তবে এই অঞ্চলের পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা যায়, তারা ধোঁয়া শ্বাসের মাধ্যমে গ্রহণে এটা ব্যবহার করতেন।”

বিশালাকার সমাধিসৌধটি নির্মিত হয়েছিল লার্চ কাঠের কড়িকাঠ ও কাদা মাটি দিয়ে, যার পুরো কাঠামোটি ঘিরে ঢেকে দেওয়া হয়েছিল হাজার হাজার টন পাথর দিয়ে।

সমাধির ভেতরে প্রত্নতত্ত্ববিদরা প্রাচীন স্কিথিয়ান ‘অ্যানিমেল স্টাইল’ বা প্রাণীর আদলে নিখুঁতভাবে খোদাই করা বেশ কিছু শিল্পকর্ম এবং বিরল সব স্বর্ণালঙ্কার ও স্বর্ণ নির্মিত বস্তু উদ্ধার করেছেন।

সমাধির ওপরের উপরিভাগে স্কিথিয়ানরা সম্ভবত ঘোড়া ও মানুষের বলি বা নরবলির মতো ভয়াবহ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া আচার সম্পন্ন করেছিল। কারণ সেখানে অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের সঙ্গে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মানুষের হাড়ের অংশবিশেষও মিলেছে।

জিনো কাসপারি বলেছেন, “বড় কোনো সমাধিতে গাঁজার মতো উপাদানের উপস্থিতিই প্রমাণ করে, একে বিশেষ ধর্মীয় বা আনুষ্ঠানিক আচার হিসেবে দেখা হত।

“আমরা দেখেছি, ঢিবির উপরিভাগে ঘোড়া ও মানুষের বলি দিয়ে এক ধরনের কাল্পনিক অশ্বারোহী বাহিনী সাজিয়ে রাখা হত। খুঁটিতে বেঁধে রাখা ঘোড়া ও মৃত আরোহীদের এই ভয়াল প্রদর্শনীটি ছিল স্তেপ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে চরম সামাজিক ও রাজকীয় ক্ষমতার বহিপ্রকাশ।”

খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর বিখ্যাত গ্রিক ইতিহাসবিদ হেরোডোটাস তার লেখায় স্কিথীয় সংস্কৃতির সঙ্গে প্রাচীন গ্রিসের মতো সভ্যতার যোগাযোগের কথা তুলে ধরেছিলেন।

হেরোডোটাসের ঐতিহাসিক সূত্রের সত্যতা নিয়ে কাসপারি বলেছেন, “হেরোডোটাস তার বর্ণনায় এই ভূতুড়ে অশ্বারোহী বাহিনীর বলিদানের আচারের কথা বলেছিলেন। তবে আমরা সবসময় তার লেখা বিশ্বাস করতে খানিকটা দ্বিধাগ্রস্ত ছিলাম, কারণ তিনি মাঝেমমধ্যেই কল্পকাহিনীর দিকে ভেসে যেতেন।

“দক্ষিণ সাইবেরিয়ায় এই ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কারের পর আমরা এখন নিশ্চিত যে, স্তেপ অঞ্চলের মানুষদের সম্পর্কে তার অন্তত কিছু বিবরণ শতভাগ সত্য ছিল।”

সমাধিস্থলে পাওয়া গাঁজার বীজগুলো অবিকৃত অবস্থায় সংরক্ষিত ছিল, যা বিজ্ঞানীদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

কাসপারি বলেছেন, “বিষয়টি এখান থেকেই আরও বেশি রোমাঞ্চকর হয়ে উঠেছে। আমরা এরইমধ্যে কিছু বীজের সিকোয়েন্সিং শুরু করে নিখুঁত সংরক্ষিত ডিএনএ পেয়েছি।

“উদ্ভিদের ভৌত অবশিষ্টাংশ পাওয়ার চেয়েও অক্ষত ডিএনএ পাওয়া বহুগুণ দুর্লভ ঘটনা। এটা এখন পর্যন্ত বিশ্বে আবিষ্কৃত সবচেয়ে প্রাচীন ক্যানাবিস ডিএনএ।

“আমি বিশ্বাস করি, আগামী বছরগুলোতে আমরা এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদের ইতিহাস আরও ভালোভাবে জানতে ও এর চাষাবাদের পুরনো ইতিহাস লিখতে পারব।”