Published : 01 Mar 2026, 05:55 PM
পেন্টাগনের গোপন সামরিক নেটওয়ার্কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সরবরাহের জন্য বড় এক চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ওপেনএআই।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে ফেডারেল বিভিন্ন কাজে ওপেনএআইয়ের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানি ‘অ্যানথ্রপিক’-এর সেবা বন্ধের কেবল কয়েক ঘণ্টার মাথায় এমন ঘোষণা এল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ পত্রিকা গার্ডিয়ান।
গণ নজরদারি ও অটোনমাস মারণাস্ত্র তৈরির ক্ষেত্রে নীতিগত অবস্থান থেকে সরতে রাজি না হওয়ায় অ্যানথ্রপিককে পেন্টাগন থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পেন্টাগনের সঙ্গে কাজ করতে রাজি হয় ওপেনএআই।
শুক্রবার রাতে এ চুক্তির কথা বলেছেন ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যান। তবে ওপেনএআই স্পষ্ট করে বলেছে, মারণাস্ত্র বা অবৈধ নজরদারির ক্ষেত্রে তাদের ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমারেখা লঙ্ঘিত হবে না।
এর আগে, পেন্টাগনের কাছে নিজেদের ‘ক্লড’ সিস্টেম ব্যবহারের ক্ষেত্রে অ্যানথ্রপিক গ্যারান্টি চেয়েছিল যে, তাদের প্রযুক্তি যেন গণ নজরদারি বা মানুষের সিদ্ধান্ত ছাড়াই লক্ষ্যবস্তু নিধন করতে পারে এমন ‘অটোনমাস মারণাস্ত্র’ তৈরিতে ব্যবহৃত না হয়।
পেন্টাগনের সঙ্গে চুক্তির ঘোষণা দেওয়ার সময় অল্টম্যান জোর দিয়ে বলেছেন, সরকারের সঙ্গে ওপেনএআইয়ের চুক্তিতেও এ নিশ্চয়তা রয়েছে যে, তাদের এআই মডেল এ ধরনের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হবে না।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ অল্টম্যান লিখেছেন, “আমাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি নিরাপত্তা নীতিমালা হচ্ছে, অভ্যন্তরীণ গণ নজরদারি নিষিদ্ধ ও মারণাস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে মানুষের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, যার মধ্যে অটোনমাস অস্ত্র ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পেন্টাগন এসব নীতির সঙ্গে একমত হয়েছে, যা তাদের আইন ও নীতিতে প্রতিফলিত হয় এবং আমরা আমাদের চুক্তিতেও এগুলো অন্তর্ভুক্ত করেছি।”
অল্টম্যান বলেছেন, তার ধারণা, পেন্টাগন “সব এআই কোম্পানির জন্যই এই একই শর্তমালা রাখবে”, যাতে আইনি বা সরকারি কঠোর পদক্ষেপের বদলে “যৌক্তিক চুক্তির মাধ্যমে উত্তেজনা কমিয়ে আনা যায়।”
ওপেনএআইয়ের এ চুক্তিটি যদি সত্যিই অনৈতিক কাজে প্রযুক্তি ব্যবহার নিষিদ্ধ করে থাকে তবে বোঝা যাচ্ছে, কোম্পানিটি পেন্টাগনের এমন সব নিশ্চয়তা আদায়ে সফল হয়েছে যা অ্যানথ্রপিক পারেনি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট যখন সব ধরনের সরকারি সংস্থাকে অ্যানথ্রপিকের প্রযুক্তি ব্যবহার ‘অবিলম্বে বন্ধের’ নির্দেশ দেন তার ঠিক পরেই অল্টম্যান এ চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন।
পেন্টাগনের দাবি, অ্যানথ্রপিক যেন তাদের এআই সিস্টেমের নৈতিক বিভিন্ন নীতিমালা শিথিল করে, অন্যথায় তাদের কঠোর পরিণতির মখে পড়তে হবে।
নিজের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ট্রুথ সোশাল’-এ ট্রাম্প লিখেছেন, “অ্যানথ্রপিকের বামপন্থী পাগলরা পেন্টাগনকে জবরদস্তির চেষ্টা করে আমাদের সংবিধানের বদলে তাদের ‘টার্মস অফ সার্ভিস’ মানতে বাধ্য করে এক ভয়াবহ ভুল করেছে।”
এখন দেখার বিষয়, সরকারের সঙ্গে এ চুক্তির বিষয়ে ওপেনএআইয়ের কর্মীরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানান। ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে এ লড়াইয়ে অ্যানথ্রপিক তাদের কট্টর প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছ থেকেও সমর্থন পেয়েছে।
ওপেনএআই ও গুগলের প্রায় ৫০০ কর্মী এমন এক খোলা চিঠিতে স্বাক্ষর করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে, “আমাদের বিভক্ত করা যাবে না।”
চিঠিটিতে আরও উল্লেখ রয়েছে, “অ্যানথ্রপিক যা প্রত্যাখ্যান করেছে, পেন্টাগন এখন গুগল ও ওপেনএআইয়ের সঙ্গে আলোচনা করে সেটিই করিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। তারা প্রতিটি কোম্পানির মনে এই ভয় ঢুকিয়ে দিচ্ছে যে অন্য কোম্পানি হয়ত রাজি হয়ে যাবে। আর এভাবেই তারা আমাদের বিভক্ত করতে চাইছে।”
শুক্রবার রাতে পাঠানো এক মেমোতে ওপেনএআই কর্মীদের আশ্বস্ত করতে অল্টম্যান বলেছেন, “আমরা এখানে কীভাবে পৌঁছেছি তা বড় কথা নয়, বিষয়টি এখন আর কেবল অ্যানথ্রপিক ও পেন্টাগনের মধ্যকার সমস্যা নয়, বরং গোটা এআই শিল্পের জন্য বড় ইস্যু এবং আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করা খুব জরুরি।
“আমরা দীর্ঘকাল ধরেই বিশ্বাস করে আসছি, গণ নজরদারি বা অটোনমাস মারণাস্ত্র তৈরিতে এআই ব্যবহার করা উচিত নয়। উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে অবশ্যই মানুষের নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে। এগুলোই আমাদের প্রধান ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমারেখা।”
শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোর মধ্যে নিজেদের সবচেয়ে ‘নিরাপত্তা সচেতন’ হিসেবে দাবি করা অ্যানথ্রপিক গেল কয়েক মাস ধরে পেন্টাগনের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ছিল।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তারা তাদের ‘ক্লড’ সিস্টেমের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চেয়েছিলেন, যা কোম্পানিটির মতে দেশের সুরক্ষায় সহায়ক হবে।
অন্যদিকে, অ্যানথ্রপিক তাদের প্রযুক্তিকে গণ নজরদারি বা মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়া চলতে পারে এমন মারণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করতে দিতে রাজি হয়নি।
শুক্রবার রাতে এক বিবৃতিতে অ্যানথ্রপিক বলেছে, “পেন্টাগনের কোনো প্রকার ভয়ভীতি বা শাস্তি আমাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারবে না। আমরা গণ নজরদারি বা সম্পূর্ণ অটোনমাস অস্ত্রের বিপক্ষে অটল থাকব।
“আমরা সদিচ্ছা নিয়েই পেন্টাগনের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি এবং স্পষ্ট করেছি, ওপরের দুটি ব্যতিক্রম ছাড়া জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এআইয়ের সকল বৈধ ব্যবহারকে আমরা সমর্থন করি। আমাদের জানামতে, এ দুটি বিধিনিষেধ এ পর্যন্ত সরকারের কোনো মিশনেই বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।”
এদিকে, শুক্রবার ওপেনএআই বলেছে, ১১ হাজার কোটি ডলারের এক বিশাল তহবিল সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়েছে তারা, যা সফল হলে কোম্পানির বাজারমূল্য দাঁড়াবে ৮৪ হাজার কোটি ডলারে।