মানুষের মন ‘পড়তে পারবে’ এই চীনা এআই কম্পিউটার?
কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা প্রযুক্তির সাহায্যে মস্তিষ্কের সংকেত সঠিকভাবে পড়া এবং সেগুলোর ব্যাখ্যার উপায় খুঁজছেন। এজন্য বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে।
মানুষের মস্তিষ্কের চিন্তা পড়তে পারা এখন আর বোধহয় কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়, বরং বাস্তব হতে চলেছে। চীনের নতুন এক স্টার্টআপ এমন এক কম্পিউটার প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে, যা কোনো জটিল অস্ত্রোপচার বা মাথায় চিপ বসানো ছাড়াই মানুষের মনের সংকেত বুঝতে পারবে।
আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্স প্রতিবেদনে লিখেছে, কয়েক দশক ধরে বিজ্ঞানীরা প্রযুক্তির সাহায্যে মস্তিষ্কের সংকেত সঠিকভাবে পড়া এবং সেগুলোর ব্যাখ্যার উপায় খুঁজছেন। এজন্য দেহের ভেতর ইমপ্ল্যান্ট বসানো বা বাইরে থেকে ইইজি ও আল্ট্রাসাউন্ডের মতো বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে।
১৯৭৩ সালে ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া’র কম্পিউটার বিজ্ঞানী জ্যাক ভিডাল এক গবেষণাপত্রে প্রথম ‘ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেইস’ বা বিসিআই শব্দটি ব্যবহার করেন। এ প্রযুক্তির মূল লক্ষ্য, প্যারালাইজড বা পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীদের সক্ষম করে তোলা এবং মানুষ ও যন্ত্রের মধ্যে যোগাযোগের বাধা দূর করা।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন উদীয়মান প্রযুক্তির ছোঁয়ায় বিসিআইয়ের ধারণাটি আরও জোরালো হয়েছে। ইলন মাস্কের কোম্পানি নিউরালিংক যেমন দেহের ভেতরে যন্ত্র বসানোর বিভিন্ন পদ্ধতির উন্নয়ন করছে তেমনই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের আগমনে ইইজি ও আল্ট্রাসাউন্ড থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ গবেষকদের জন্য সহজ হয়েছে। ফলে বিশ্বজুড়ে নতুন নতুন এআই স্টার্টআপ এই খাতে বিনিয়োগে আগ্রহী হচ্ছে।
গত মাসেই ওপেনএআই ঘোষণা করেছে, ‘মার্জ ল্যাবস’ নামের এক স্টার্টআপে বিনিয়োগ করছে তারা। আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিসিআই তৈরিতে কাজ করছে কোম্পানিটি। এ সপ্তাহে ওয়্যার্ড ম্যাগাজিন বলেছে, চীনের চেংদু থেকে ‘গেস্টালা’ নামে এ ধরনের আরও এক স্টার্টআপের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে।
গেস্টালা’র সিইও ফিনিক্স পেং বলেছেন, “বৈদ্যুতিক ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেইস সাধারণত মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট কোনো অংশ যেমন মোটর কর্টেক্স থেকে তথ্য সংগ্রহ করে। অন্যদিকে, আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে আমরা পুরো মস্তিষ্কের তথ্য পাওয়ার সক্ষমতা পেতে পারি।”
আল্ট্রাসাউন্ড প্রযুক্তি বেছে নেওয়ার কারণ, এ প্রযুক্তি সাধারণত দেহের ভেতরের ছবি বা ইমেজিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়। তবে আল্ট্রাসাউন্ডের গভীর চিকিৎসাগত গুণও রয়েছে। যেমন, ‘ফোকাসড আল্ট্রাসাউন্ড’ এমন তাপ উৎপন্ন করতে পারে, যা পারকিনসন রোগের জন্য দায়ী বিভিন্ন নিউরনকে ধ্বংস করতে পারে।
পেং দাবি করেছেন, গেস্টালার দ্বিতীয় প্রজন্মের ডিভাইসটি হবে বিশেষ এক হেলমেট, যা “দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা বা বিষণ্নতার মতো মস্তিষ্কের বিশেষ অবস্থাগুলো শনাক্ত করতে এবং মস্তিষ্কের ঠিক যে অংশে অস্বাভাবিক কার্যকলাপ চলছে সেখানে নিরাময়মূলক তরঙ্গ বা স্টিমুলেশন পৌঁছে দেবে”।
বর্তমানে এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এ প্রযুক্তি, যা মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহ মেপে তথ্য সংগ্রহের জন্য আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করলেও মাথার খুলি নিজেই এ তথ্যের নির্ভুলতা কমিয়ে দিতে পারে। কারণ মানুষের খুলি আল্ট্রাসাউন্ড তরঙ্গকে বিকৃত বা বাধাগ্রস্ত করার প্রবণতা রাখে। ফলে খুলির ওপর দিয়ে থেরাপি বা চিকিৎসা দেওয়া পরিচিত বিষয় হলেও আল্ট্রাসাউন্ড ব্যবহার করে মস্তিষ্ক থেকে সূক্ষ্ম তথ্য বের করে আনা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং কঠিন কাজ।
তবে মস্তিষ্কের ধরন বিশ্লেষণের জন্য আল্ট্রাসাউন্ডই একমাত্র অস্ত্রোপচারহীন পদ্ধতি নয়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে জ্যাক ভিডালের দেওয়া বিসিআই ধারণার ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস’ বা ইউসিএলএ-এর বিজ্ঞানীরা বিসিআইয়ের এক অনন্য সাফল্য দেখিয়েছেন।
‘ইলেকট্রোএনসেফালোগ্রাফি’ বা ইইজি’র সঙ্গে এআই যোগ করে সফলভাবে মস্তিষ্কের সংকেতকে শারীরিক নড়াচড়ায় রূপান্তর করতে পেরেছেন। এজন্য কোনো জটিল নিউরোসার্জারির প্রয়োজন হয়নি, কেবল বিশেষ এক ‘ব্রেইন ক্যাপ’ পরলেই কাজ হয়েছে।
প্রায় এক শতাব্দী ধরে মানুষ ও যন্ত্র যেভাবে একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠছে, সেই ধারা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে। তবে এ সংযোগ সরাসরি মস্তিষ্কের ভেতর ইমপ্ল্যান্ট বসানোর মাধ্যমে হবে নাকি অন্য কোনো সহজ ও নিরাপদ প্রযুক্তির মাধ্যমে হবে তা দেখার জন্য আরও অপেক্ষা করতে হবে।
