Published : 26 Jan 2026, 10:43 AM
বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই নিয়ে আমেরিকা ও চীনের মধ্যে এক তীব্র লড়াই চলছে। এই দৌড়ে আমেরিকা এগিয়ে থাকলেও ২০২৫ সালের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। এখন নিজেদের সেবাকে আরও উন্নত ও সাশ্রয়ী করতে চীনের তৈরি এআই মডেল ব্যবহার করছে বড় বড় মার্কিন কোম্পানি।
বিবিসি লিখেছে, প্রতি মাসে নতুন সব স্টাইলের খোঁজে পিন্টারেস্টে ভিড় করেন কোটি কোটি মানুষ। অ্যাপটিতে ‘সবচেয়ে অদ্ভুত সব কাণ্ড’ শিরোনামের এক পেইজ রয়েছে, যা সৃজনশীল মানুষদের নতুন কিছু ভাবার খোরাক যোগায়।
ওই পেইজে দেখা যায়, ফুলের টব হিসেবে ব্যবহৃত রাবারের জুতা, চিজবার্গারের আকৃতির আইশ্যাডো বা সবজি দিয়ে বানানো চমৎকার সব ঘর। তবে সাধারণ ব্যবহারকারীরা হয়ত জানেন না, এর পেছনের প্রযুক্তিটি আমেরিকার তৈরি নয়।
পিন্টারেস্ট এখন তাদের সার্চ ও সাজেশন ব্যবস্থাকে আরও নিখুঁত করতে চীনা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল নিয়ে কাজ করছে। এর প্রধান বিল রেডি বলেছেন, “আমরা পিন্টারেস্টকে কার্যত এআইচালিত এক কেনাকাটার সহকারীতে রূপান্তর করেছি।”
স্যান ফ্রান্সিসকোভিত্তিক এ ফ্যাশনসচেতন কোম্পানিটি চাইলে তাদের পর্দার পেছনের কাজের জন্য যেকোনো মার্কিন এআই ল্যাবের সাহায্য নিতে পারত। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চীনের ‘ডিপসিক আর-১’ মডেলটি বাজারে আসার পর থেকে পিন্টারেস্টে চীনা প্রযুক্তির ব্যবহার অনেক বেড়েছে।
এ পরিবর্তনকে ‘যুগান্তকারী ঘটনা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন রেডি। তার মতে, “এ প্রযুক্তিটি সবার জন্য উন্মুক্ত বা ওপেন-সোর্স করে দিয়েছে চীন, যা বিশ্বজুড়ে ওপেন-সোর্স মডেলের এক নতুন জোয়ার তৈরি করেছে।”
চীনের অন্যান্য প্রতিযোগীদের মধ্যে রয়েছে আলিবাবার ‘কুয়েন’ ও মুনশটের ‘কিমি’। একই ধরনের প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছে টিকটকের মালিক কোম্পানি বাইটড্যান্সও।
পিন্টারেস্টের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা ম্যাট মাদ্রিগাল বলেছেন, এসব চীনা মডেলের বড় শক্তি হচ্ছে, যে কেউ এগুলো বিনামূল্যে ডাউনলোড করতে ও পিন্টারেস্টের মতো বিভিন্ন কোম্পানি নিজেদের প্রয়োজনমতো সেগুলোকে সাজিয়ে নিতে পারে।
অন্যদিকে, চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআইয়ের মতো মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের তৈরি বেশিরভাগ মডেলে এই সুবিধা মেলে না।
মাদ্রিগাল বলেছেন, “আমাদের নিজস্ব মডেলকে প্রশিক্ষণের জন্য আমরা যে ওপেন সোর্স পদ্ধতি ব্যবহার করি তা বাজারের প্রচলিত বিভিন্ন মডেলের তুলনায় ৩০ শতাংশ বেশি নিখুঁত ফলাফল দেয়।”
কেবল তাই নয়, এ উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে কেনাকাটার পরামর্শ দেওয়ার খরচও অনেক কম। আমেরিকান এআই ডেভেলপারদের তৈরি নিজস্ব বা পেটেন্ট করা বিভিন্ন মডেল ব্যবহারের চেয়ে এতে খরচ কখনো কখনো প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায় বলেও উল্লেখ করেছেন তিনি।
‘দ্রুত ও সাশ্রয়ী’
পিন্টারেস্টই একমাত্র মার্কিন কোম্পানি নয় যারা চীনের এআই প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে, বরং ‘ফরচুন ৫০০’ তালিকার অনেক বড় বড় কোম্পানিতেই এখন এসব চীনা মডেলের জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
গত অক্টোবরে মার্কিন বাণিজ্য প্রকাশনা ব্লুমবার্গকে ‘এয়ারবিএনবি’ প্রধান ব্রায়ান চেস্কি বলেছিলেন, নিজেদের এআই কাস্টমার সার্ভিস এজেন্ট চালানোর জন্য আলিবাবার ‘কুয়েন’ মডেলের ওপর ‘অনেক’ নির্ভর করেন তারা। এর পেছনে তিনটি সহজ কারণ দেখিয়েছেন তিনি, যেখানে মডেলটি ‘খুবই ভালো’, ‘দ্রুত’ ও ‘সাশ্রয়ী’।
এর আরও প্রমাণ মেলে এআই ও মেশিন লার্নিং নিয়ে কাজ করা জনপ্রিয় ওপেন সোর্স প্ল্যাটফর্ম ‘হাগিং ফেইস’ থেকে। মেটা বা আলিবাবার মতো বড় ডেভেলপারদের তৈরি করা এআই মডেল ডাউনলোডের জন্য এ প্ল্যাটফর্মটিই ব্যবহার করেন মানুষ।
প্ল্যাটফর্মটির পণ্য নির্মাতা জেফ বুডিয়ার বলেছেন, খরচের কথা মাথায় রেখেই নতুন বিভিন্ন স্টার্টআপ মার্কিন মডেলের বদলে চীনা মডেলগুলোর দিকে ঝুঁকছে।
“আপনি যদি হাগিং ফেইস-এর সবথেকে জনপ্রিয় ও ট্রেন্ডিং বিভিন্ন মডেলের দিকে তাকান, বিশেষ করে যেগুলো মানুষ সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড ও পছন্দ করেন তবে দেখবেন, সেরা ১০টি মডেলের অনেকগুলোই চীনের ল্যাব থেকে আসা।
“আমাদের এমন অনেক সপ্তাহ যায় যখন হাগিং ফেইসের সেরা পাঁচটি মডেলের মধ্যে চারটিই থাকে চীনা ল্যাবে তৈরি।”
গেল বছরের সেপ্টেম্বরে মেটার এআই মডেল ‘লামা’কে টপকে এ প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে বেশিবার ডাউনলোড হওয়া এআই মডেলের তালিকায় শীর্ষে উঠে আসে আলিবাবার ‘কুয়েন’।
২০২৩ সালে নিজেদের ওপেন সোর্স ‘লামা’র বিভিন্ন মডেল বাজারে এনেছে মার্কিন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম জায়ান্টটি। ডিপসিক ও আলিবাবার বিভিন্ন মডেল আসার আগে পর্যন্ত, যারা বিশেষ কোনো অ্যাপ তৈরি করতেন তাদের কাছে ‘লামা’ই ছিল প্রথম পছন্দ।
তবে গত বছর মেটা ‘লামা ৪’ চালুর পর খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারেননি ডেভেলপাররা। এ বসন্তে নতুন এক মডেল বাজারে আনতে এখন আলিবাবা, গুগল ও ওপেনএআইয়ের বিভিন্ন ওপেন সোর্স মডেল ব্যবহার করে নিজেদের এআই মডেলকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে মেটা।
মার্কিন মডেলসহ বেশ কয়েকটি এআই মডেল ব্যবহার করে ‘এয়ারবিএনবি’। তবে সেগুলো কোম্পানির নিজস্ব সার্ভারে অত্যন্ত নিরাপদে রাখে তারা।
কোম্পানিটি বলেছে, গ্রাহকদের কোনো তথ্যই এসব এআই মডেলের মূল নির্মাতা, যেমন আলিবাবা বা ওপেনএআইয়ের কাছে সরবরাহ করে না কোম্পানিটি।
চীনের সাফল্য
২০২৫ সালের শুরু থেকে প্রযুক্তি বিশ্বের সবাই একটি বিষয়ে একমত হয়েছিলেন যে, মার্কিন বিভিন্ন টেক জায়ান্ট শত শত কোটি ডলার খরচের পরও চীনা বিভিন্ন কোম্পানি তাদের ছাড়িয়ে যাওয়ার হুমকিতে রয়েছে।
বুডিয়ার বলেছেন, “গল্প এখন আর আগের মতো নেই। এখনকার সেরা বিভিন্ন মডেলই ওপেন সোর্স মডেল।”
গত মাসে ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’ থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কার্যসক্ষমতা ও ব্যবহারকারী সংখ্যা, উভয় দিক থেকেই এখন বিশ্বমানের অন্যান্য মডেলের তুলনায় ‘সমান তালে বা এগিয়ে গেছে’ চীনা বিভিন্ন এআই মডেল।
সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ব্রিটেনের সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী স্যার নিক ক্লেগ বলেছেন, আমেরিকান বিভিন্ন কোম্পানি এমন এক এআই তৈরির পেছনে অতিরিক্ত মনোযোগ দিচ্ছে, যা একদিন মানুষের বুদ্ধিমত্তাকেও ছাড়িয়ে যাবে।
গত বছর মেটা’র গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স প্রধানের পদ ছেড়েছেন ক্লেগ। আর ‘সুপার ইন্টেলিজেন্স’ তৈরির জন্য শত শত কোটি ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন মেটা প্রধান মার্ক জাকারবার্গ।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞ বলছেন, আমেরিকার ওপেন সোর্স এআইয়ের লক্ষ্য অস্পষ্ট ও ঠিকভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। এ সুযোগটিকে কাজে লাগিয়ে ওপেন সোর্স এআইয়ের জগতে নিজের আধিপত্য বিস্তার করছে চীন।
নিক বলেছেন, পরিহাসের বিষয় যে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় ‘একনায়কতান্ত্রিক’ দেশ (চীন) ও সবচেয়ে বড় ‘গণতান্ত্রিক’ দেশ (আমেরিকা)-এর লড়াইয়ের মধ্যে চীনই আসলে ‘এ প্রযুক্তিকে সব মানুষের জন্য বেশি গণতন্ত্রীকরণ করছে’।
‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’র প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ওপেন সোর্স মডেল তৈরিতে চীনের এ সাফল্যের পেছনে দেশটির সরকারি সমর্থনের বড় ভূমিকা থাকতে পারে।
অন্যদিকে, ওপেনএআইয়ের মতো মার্কিন বিভিন্ন কোম্পানির ওপর আয় বাড়ানো ও লাভজনক হওয়ার প্রচণ্ড চাপ রয়েছে। সেই লাভের মুখ দেখতে এখন বিজ্ঞাপনের দিকে ঝুঁকছে তারা।