Published : 25 May 2026, 05:04 PM
সৌদি আরব সরকারের নির্দেশে সে দেশের ভিন্নমতালম্বী ও মানবাধিকার কর্মীদের অ্যাকাউন্ট ব্লক করেছে ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামের মূল কোম্পানি মেটা এবং স্ন্যাপচ্যাট।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুসারে, দেশের ভেতর থেকে যাতে এসব সমালোচকদের পোস্ট দেখা না যায় সেজন্যই এই পদক্ষেপ নিয়েছে সৌদি আরব।
যাদের অ্যাকাউন্ট ব্লক করা হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত মানবাধিকার কর্মী আবদুল্লাহ আলাউধ। সৌদি আরবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার তিনি।
এ ছাড়াও আছেন কানাডা ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক কর্মী ওমর আবদুল আজিজ। তিনি ২০১৮ সালে সৌদি এজেন্টদের হাতে নিহত সাংবাদিক জামাল খাশোগজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেছিলেন।
মধ্যপ্রাচ্যের মানবাধিকার বিষয়ক অ্যাডভোকেসি গ্রুপ ‘আমেরিকান কমিটি ফর মিডল ইস্ট রাইটস’-এর তথ্য অনুসারে, এপ্রিলের শেষ নাগাদ মেটা অন্তত সাতটি অ্যাকাউন্ট ব্লক করেছে। যার মধ্যে দুজন মার্কিন নাগরিক ও ইউরোপে বসবাসরত দুজন ব্যক্তির অ্যাকাউন্ট রয়েছে।
এসিএমইআর-এর সিনিয়র পলিসি অ্যাডভাইজার হিসেবে কর্মরত আলাউধ বলেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসকারী আমেরিকানদের বিরুদ্ধে মেটা সৌদি আরবের হয়ে নোংরা কাজটি করছে। ভিন্নমত দমনের জন্য কুখ্যাত কোনো সরকারের অনুরোধে যখন একটি কোম্পানি নির্দিষ্ট অঞ্চলের জন্য অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দেয় তখন তারা নিজেরাই দমনের হাতিয়ারে পরিণত হয়। মেটার উচিত এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়া।”
এ ‘নোংরা কাজ’ করার অভিযোগে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি মেটা।
তবে এক বিবৃতিতে কোম্পানিটি বলেছে, তাদের প্ল্যাটফর্মে কোনো দেশের আইন লঙ্ঘন করেছে ‘এমন কিছু ঘটলে’ তা কোম্পানিটির নিজস্ব ‘কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড’ বা নীতিমালার মধ্যে পড়ে না। এক্ষেত্রে ওই দেশে এমন কাজ বেআইনি বলে দাবি করা হলে কেবল তখনই তারা সেই দেশের ভেতরে ওই কনটেন্ট ব্লক করে।
মেটা আরও বলেছে, ‘অধিকাংশ ক্ষেত্রে’ তারা ভুক্তভোগীদের জানিয়ে দেয় যে কোন দেশের সরকারি কর্তৃপক্ষ এই অনুরোধ পাঠিয়েছে।
‘পাবলিক ট্রান্সপারেন্সি সেন্টার’ বা স্বচ্ছতা কেন্দ্রও পরিচালনা করে মেটা, যেখানে তারা স্বীকার করেছে, এপ্রিলে সৌদি কর্তৃপক্ষ কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল এবং মোট ১৪৪টি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট, ফেইসবুক পেইজ ও ফেইসবুক প্রোফাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা চেয়েছিল।
ওই সাইটের তথ্য অনুসারে, মেটা ১০৮টি ‘আইটেম’ বা অ্যাকাউন্টের অ্যাক্সেস সীমিত করেছে।
তবে ভুক্তভোগী কয়েকজন ভিন্নমতালম্বীর সাক্ষাৎকার থেকে জানা গেছে, সৌদি কর্তৃপক্ষের অনুরোধে সব সামাজিক মাধ্যম কোম্পানি একইভাবে সাড়া দেয়নি।
ফেইসবুকের মূল কোম্পানি মেটা ব্যবহারকারীদের সতর্ক করে বলেছে, ‘স্থানীয় আইনি বাধ্যবাধকতা বা সরকারের অনুরোধের’ কারণে তাদের কনটেন্ট ব্লক করা হচ্ছে।
তবে স্ন্যাপচ্যাট অ্যাকাউন্ট মালিকদের কোনো কিছু না জানিয়েই সৌদি আরবে অ্যাকাউন্টগুলোর গতি ধীর বা সেগুলো সরিয়ে ফেলেছে, যার মধ্যে রয়েছে আবদুল আজিজের অ্যাকাউন্টও।
এর ফলে স্ন্যাপচ্যাটের কতগুলো অ্যাকাউন্টের ওপর প্রভাব পড়েছে তা স্পষ্ট নয় এবং এ বিষয়ে গার্ডিয়ানের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি এর মালিকানাধীন কোম্পানি ‘স্ন্যাপ ইনকর্পোরেটেড’।
ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এর অন্তত দুজন ব্যবহারকারী অফিসিয়াল চিঠি পেয়েছেন, যেখানে তাদের জানানো হয়েছে, সৌদি আরবের যোগাযোগ, মহাকাশ ও প্রযুক্তি কমিশনের পক্ষ থেকে একটি অনুরোধ এসেছে।
এ অনুরোধে সৌদি আরব দাবি করেছে, তাদের অ্যাকাউন্টগুলো সৌদির আইন লঙ্ঘন করছে।
চিঠির সঙ্গে জড়িত ও গার্ডিয়ানের দেখা এক সৌদি সরকারি অধ্যাদেশে বলা হয়েছে, এসব অ্যাকাউন্ট এমন সব তথ্য বা উপাদান প্রচার করেছে, যা ‘জনশৃঙ্খলা, ধর্মীয় মূল্যবোধ, জননিরাপত্তা বা ব্যক্তিগত জীবনের পবিত্রতা ক্ষুণ্ন করে’।
তবে এক্স কর্তৃপক্ষ আবদুল আজিজসহ অন্যান্য ব্যবহারকারীদের বলেছে, তারা এখনও রিপোর্টেড কনটেন্ট বা অ্যাকাউন্টের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
সৌদি আরবে চিঠির জবাবে কোম্পানিটি পাল্টা চিঠিতে লিখেছে, “এক্স তার ব্যবহারকারীদের কণ্ঠস্বর রক্ষা এবং সম্মান করার বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাসী।”
এরপর তারা ব্যবহারকারীদের পরামর্শ দিয়েছে, তারা চাইলে আইনি পরামর্শ নিতে বা স্বেচ্ছায় সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কনটেন্ট মুছে ফেলতে পারেন।
এ বিষয়ে গার্ডিয়ানের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি এক্স।
আবদুল আজিজ বলেছেন, “আমার মনে হয় এমনটা বিরোধীদের মুখ বন্ধ করার জন্য সৌদি সরকারের বড় ধরনের এক দমনপীড়নের সূচনা মাত্র, যা এমন এক ভয়াবহ রূপ নিতে পারে, যেমনটি তারা ২০১৮ সালে সাংবাদিক জামাল খাশোগজিকে হত্যার মাধ্যমে করেছিল।”
ওয়াশিংটনে অবস্থিত সৌদি দূতাবাসের মাধ্যমে সৌদি সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পায়নি গার্ডিয়ান।
সৌদি কর্তৃপক্ষের লক্ষ্যবস্তু হওয়া অন্যান্য অ্যাকাউন্টের মধ্যে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘অলকাস্ট’-এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের অ্যাকাউন্টও রয়েছে, যার মধ্যে এর প্রতিষ্ঠাতা ইয়াহইয়া আসিরির অ্যাকাউন্টও অন্তর্ভুক্ত।
সংগঠনটি বলেছে, সৌদি আরবের এসব অনুরোধ কোনো নিরপেক্ষ আইনি প্রক্রিয়ার অংশ নয়, বরং এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে, কীভাবে একনায়কতান্ত্রিক সেন্সরশিপ বা কণ্ঠরোধের চেষ্টাকে আইনি প্রক্রিয়ার রূপ দেওয়া হতে পারে।