Published : 13 Dec 2025, 04:35 PM
‘ওপেন সোর্স’ শব্দটি শুনলে মনে হয় এ যেন এমন কোনো ডিজাইন বা প্রজেক্ট, যা সবার জন্য উন্মুক্ত, যে কেউ চাইলে এটি দেখতে, পরিবর্তন ও শেয়ার করতে পারেন। এর যাত্রা শুরু হয়েছিল সফটওয়্যার তৈরির ক্ষেত্রে, যেখানে কোড সবাই দেখতেন, বদলাতেন ও অন্যদেরও ব্যবহার করতে দিতেন।
কিন্তু, এরপর থেকেই অনেক বড় পরিসরে দর্শনের মডেল হয়ে উঠেছে এই ‘ওপেন সোর্স’। এটি এমন এক প্রোগ্রাম, যা বিভিন্ন ক্ষেত্রেই মানুষের মধ্যে সহযোগিতা, উদ্ভাবন ও নতুন ধারা তৈরিকে উৎসাহিত করে চলেছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি বিষয়ক সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
সফটওয়্যারের দিক থেকে দেখলে ‘ওপেন সোর্স’ এমন কোনো প্রোগ্রাম, যার সোর্স কোড বা মূল কাঠামো ও কার্যপদ্ধতি সবার জন্যই উন্মুক্ত। প্রোগ্রামাররা এই কোড দেখতে ও ইচ্ছে মতো পরিবর্তন করতে পারেন।
যেমন, সফটওয়্যারের কার্যকারিতা উন্নত, বাগ ঠিক করা বা পুরোপুরি নতুন কোনো কাজে ব্যবহারের কাজটি তারা করতে পারেন। এর বিপরীতে রয়েছে ‘ক্লোজড সোর্স’, যা মাইক্রোসফট বা অ্যাডোবি’র মতো লাভজনক কোম্পানির সফটওয়্যার। এসব কোডের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকে কেবল এসব পণ্যের নির্মাতার হাতেই।
লাইসেন্স হচ্ছে ওপেন সোর্সের মূল চালিকাশক্তি। ‘ওপেন সোর্স’ সফটওয়্যারটিকে যে কোনো উদ্দেশ্যে সবার ব্যবহারের আইনি অনুমতি দেওয়ার পাশাপাশি পরিবর্তিত কোড অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করার স্বাধীনতাও দেয় লাইসেন্স। কিছু লাইসেন্সের ক্ষেত্রে শর্ত থাকে, যেমন– কেউ যদি কোড পরিবর্তন করতে চান তবে তা প্রকাশ করতে হবে। আর এটিই ‘কপিলেফট’ নীতি, যা সহযোগিতামূলক মনোভাবকে ধরে রাখে। ফলে প্রোগ্রামাররা একে অপরের কাজের ওপর আরও উন্নতি ও পুরো ওপেন সোর্স ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করতে পারে।
যেভাবে শুরু হয়েছিল ওপেন সোর্স
ওপেন সোর্স ধারণার সূত্রপাত ঘটে ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকে। ওই সময় আধুনিক ইন্টারনেটের আগের টেলিকমিউনিকেশন নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করছিলেন গবেষকরা, যা ছিল ‘অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্টস এজেন্সি নেটওয়ার্ক’। এ কাজের পেছনের গবেষকরা তাদের কোড ও ফলাফল একে অপরের সঙ্গে খোলাখুলি ভাগ করে নিতেন, যাতে আরও উন্নত প্রকল্প তৈরি করা যায়।
এ সহযোগিতা ও সহকর্মীদের পিয়ার রিভিউ বা পর্যালোচনার বিষয়টি ছিল তাদের গবেষণার মূল ভিত্তি এবং এখান থেকেই সেই মূল্যবোধের জন্ম, যা আজও ওপেন সোর্সকে সংজ্ঞায়িত করে আসছে।
১৯৮০-এর দশকে ‘ওপেন সোর্স’ ধারাটি পূর্ণাঙ্গ ও সংগঠিত এক আন্দোলনে রূপ নিতে শুরু করে। ওই সময় ‘ফ্রি সফটওয়্যার’ আন্দোলন নামে পরিচিত ছিল এ ধারা, যার মূল নীতি ছিল সফটওয়্যার ব্যবহারকারীর স্বাধীনতা সম্মান করবে, যাতে কোড নিয়ে ইচ্ছে মতো কাজ করতে পারেন তারা।
তবে স্বাভাবিকভাবেই ‘ফ্রি সফটওয়্যার’ শব্দটি কিছু বিভ্রান্তি তৈরি করেছিল। কারণ নামটি শুনলে মনে হতে পারে সফটওয়্যারটি বিনামূল্যের। তবে আসলে এর অর্থ ছিল, ব্যবহারকারীদের সফটওয়্যারটি ব্যবহারে স্বাধীনতা।
১৯৯০-এর দশকের শেষ দিকে ‘ফ্রি সফটওয়্যার’ আন্দোলন রূপ নেয় ‘ওপেন সোর্স’-এ। ঠিক সেই সময় নিজেদের মজিলা ব্রাউজারের সোর্স কোড ‘ওপেন সোর্স’ হিসেবে প্রকাশ করে ‘নেটস্কেপ’। ফলে মজিলা (পরবর্তীতে ফায়ারফক্স) কর্পোরেট দুনিয়া ও সাধারণ ব্যবহারকারীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
সেই বছরই ‘ওপেন সোর্স ইনিশিয়েটিভ’ বা ওএসআই প্রতিষ্ঠিত হয়, যেটি আনুষ্ঠানিকভাবে ওপেন সোর্সের সংজ্ঞা তৈরি করে এবং ব্যবহারকারীদের জন্য এর ব্যবহারিক ও ব্যবসাবান্ধব বিভিন্ন সুবিধা প্রচার করতে শুরু করে।
‘ওপেন সোর্স’ প্রকল্পের জনপ্রিয় উদাহরণ
‘লিনাক্স’ হচ্ছে ইতিহাসের অন্যতম পরিচিত ওপেন সোর্স প্রজেক্ট। ওএসআই আন্দোলনের সময় জন্ম নেয় ‘লিনাক্স’ এবং তারপর থেকে অসংখ্য ওয়েব সার্ভার, মোবাইল ডিভাইস, ক্লাউড অবকাঠামোর ভিত্তি হয়ে উঠেছে এটি।
ইন্টারনেট নিজেই লিনাক্স অপারেটিং সিস্টেম এবং অ্যাপাচি ওয়েব সার্ভারের মতো ওপেন প্রযুক্তির ওপর চলে। বিভিন্ন ধরনের স্ট্রিমিং পরিষেবা বা অনলাইন সহযোগিতামূলক ওয়ার্কস্পেসের ক্লাউড কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্ম থেকেও ইঙ্গিত মেলে, আমাদের দৈনন্দিন ডিজিটাল সেবার কত বড় অংশে ভূমিকা রেখে চলেছে ওপেন সোর্স।
বর্তমানে ওপেন সোর্স কেবল সফটওয়্যারেই আটকে নেই। এর প্রভাব এখন বিজ্ঞান, শিক্ষা, আইন, স্বাস্থ্য, রাজনীতি ও আরও অসংখ্য ক্ষেত্রে রয়েছে, যেখানে ওপেন মডেল ব্যবহার করে দ্রুত উন্নয়ন ও নতুন উদ্ভাবন সম্ভব হচ্ছে।
তবে ‘ওপেন সোর্স’ মানে ‘বিনামূল্যে’ পরিষেবা পাওয়ার মতো বিষয় নয়। ডেভেলপাররা ওপেন সোর্স সফটওয়্যার বিক্রি করতে বা পেইড পরিষেবা, যেমন সাপোর্ট, কাস্টমাইজেশন বা ট্রেনিং দিতে পারেন। এরপরও এগুলো ওপেন সোর্স সংজ্ঞার আওতায় পড়ে।