Published : 23 Apr 2026, 12:54 PM
ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা করেছেন খোদ কোম্পানিটির উপদেষ্টাদের একজন ধনকুবের ব্যবসায়ী জাস্টিন সান।
তার দাবি, জালিয়াতির মাধ্যমে তার কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং ট্রাম্পের কোম্পানিটি এখন দেউলিয়া হওয়ার পথে রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অসহযোগিতার কারণে বর্তমানে তার বিপুল পরিমাণ অর্থ সেখানে আটকে আছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট প্রতিবেদনে লিখেছে, ট্রাম্প পরিবারের ক্রিপ্টোকারেন্সি কোম্পানি ‘ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল’ বা ডব্লিউএলএফ-এর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন তিনি।
কোম্পানিটি পরিচালনা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দুই ছেলে ডনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প। সান নিজেও এ কোম্পানির একজন উপদেষ্টা।
ধনকুবের ব্যবসায়ীর দাবি, ১৫ এপ্রিল জমা দেওয়া এক নতুন পরিচালনা প্রস্তাবের শর্তাবলী মেনে নিতে অস্বীকার করার পর থেকে তার বিভিন্ন টোকেন ট্রাম্পের কোম্পানি অনির্দিষ্টকালের জন্য আটকে রেখেছে। সানের ভোটাধিকারও বাতিল করেছে তারা।
ওই নতুন প্রস্তাবে কোম্পানির সকল উপদেষ্টার টোকেনের ১০ শতাংশ স্থায়ীভাবে নষ্ট বা ‘বার্নের’ শর্ত দেওয়া হয়েছিল।
সোমবার ক্যালিফোর্নিয়ার নর্দার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে দায়ের করা ৫২ পৃষ্ঠার এক অভিযোগে সান বলেছেন, ২০২৪ সালে তিনি ‘আইনগতভাবে’ সাড়ে চার কোটি ডলার মূল্যের ডব্লিউএলএফ টোকেন কিনেছিলেন।
সেই সময়টি ছিল এ উদ্যোগের জন্য ‘গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত’ এবং কোনো কোনো সময়ে তার কেনা সেসব টোকেনের বাজারমূল্য ‘১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল’।
সান বলেছেন, তার সেই ‘বিনিয়োগ’ ডব্লিউএলএফ-এর গ্রহণযোগ্যতা তৈরিতে সাহায্য করেছিল। শুরুর দিকে যখন এ উদ্যোগটি ‘চাহিদার অভাবে যখন ধুঁকছিল’ তখন তিনি বিনিয়োগের মাধ্যমে জনসাধারণের মাঝে এ প্রজেক্টের প্রতি ‘আস্থা তৈরি’ করেছিলেন বলেও উল্লেখ করেছেন সান।
তিনি এ প্রকল্পের সঙ্গে যোগ হতে উৎসাহিত হয়েছিলেন কারণ ট্রাম্পের কোম্পানিটি ‘নিজেদেরকে ডিসেন্ট্রালাইজড ফাইন্যান্স বা বিকেন্দ্রীভূত অর্থব্যবস্থাকে জনপ্রিয় করার দাবি করেছিল’, যা সানের পছন্দের বিষয়।
এ ছাড়া ‘প্রকল্পটির সঙ্গে ট্রাম্প পরিবারের সম্পৃক্ততাও’ বড় কারণ ছিল। তিনি নিজেকে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার পরিবারের দীর্ঘদিনের একজন ‘একনিষ্ঠ সমর্থক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মামলায় আরও অভিযোগ রয়েছে, বর্তমানে ট্রাম্পের কোম্পানি ‘পতনের দ্বারপ্রান্তে’ এবং ‘চরম আর্থিক ক্ষতির’ মধ্যে রয়েছে। কোম্পানিটি টোকেন বিক্রির অধিকাংশ অর্থ ‘প্রায় ৯৫ শতাংশ পর্যন্ত কোম্পানির ভেতরের মানুষদের দেওয়ারও পরিকল্পনা করেছে’।
অভিযোগপত্রে আরও উঠে এসেছে, কোম্পানিটি একাধিক মিথ্যা বিবৃতি দিয়েছে, প্রতারণার মাধ্যমে সানকে বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করেছে এবং তার কাছ থেকে আরও পুঁজি হাতিয়ে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করেছে।
কোম্পানিটির বিরুদ্ধে আইনের সঠিক প্রয়োগ নিয়ে ভুল তথ্য দেওয়া, অন্যায়ভাবে সানের টোকেন আটকে রাখা, হুমকি দেওয়া এবং মানহানির অভিযোগও উঠেছে।
সান ও তার বিভিন্ন কোম্পানি এ ঘটনার বিচার বিভাগীয় তদন্ত বা জুরি ট্রায়াল দাবি করছে। তারা চান আদালত যেন কোম্পানিটিকে সানের বিভিন্ন টোকেন ছেড়ে দিতে বাধ্য করে এবং সেগুলো ‘বাজেয়াপ্ত, ধ্বংস বা কোনোভাবে দায়বদ্ধ’ করা থেকে দূরে রাখে। পাশাপাশি তারা ক্ষতিপূরণ ও মামলার খরচও দাবি করেছে।
এ বিষয়ে ইন্ডিপেনডেন্টের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি ট্রাম্প অর্গানাইজেশন।
তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স পোস্টে একটি বিষয় স্পষ্ট করার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন সান। মামলা করার পরও ওই পোস্টে তিনি ব্যক্তিগতভাবে ট্রাম্পের প্রতি তার সমর্থন ধরে রেখেছেন।
তিনি বলেছেন, “ট্রাম্পের ওয়ার্ল্ড লিবার্টি প্রজেক্ট টিমের কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি এমনভাবে প্রকল্পটি পরিচালনা করছেন, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আদর্শের পরিপন্থী।”
নিজের সঙ্গে হওয়া বিভিন্ন অন্যায়ের তালিকা দিলেও খোদ প্রেসিডেন্টকে দোষারোপ করেননি সান। ট্রাম্পের কোম্পানির ‘প্রধান ক্রিপ্টো অ্যাডভোকেট’ হিসেবে রয়েছেন সান।
তিনি বলেছেন, “আমি বিশ্বাস করি না, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব কাজ সম্পর্কে জানলে তা সমর্থন করতেন।”
চীনে জন্মগ্রহণ করলেও জাস্টিন সান সেন্ট কিটস ও নেভিসের নাগরিক এবং বর্তমানে হংকংয়ে বসবাস করছেন। বাইডেন প্রশাসনের সময় মার্কিন বিচার বিভাগ ও ‘ট্রেজারির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইমস এনফোর্সমেন্ট নেটওয়ার্ক’-এর নজরে এসেছিল তার কোম্পানি ‘ট্রন’।
ওই সময় কারণ হিসেবে বলা হয়েছিল, অবৈধ কাজে জড়িত ব্যক্তিদের কাছে কোম্পানিটি ‘অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠছে’। ‘সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন’ বা এসইসি এর আগে সানের বিরুদ্ধে প্রতারণামূলকভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগও এনেছিল।
এদিকে, মার্কিন বাণিজ্য সংবাদপত্র ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল প্রতিবেদনে লিখেছে, সান ডব্লিউএলএফে বিনিয়োগ শুরুর পর তার ‘ভাগ্য বদলে যায়’। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে এসইসি তার বিরুদ্ধে আনা বিভিন্ন অভিযোগ প্রত্যাহার করে নেয় এবং সরকারের অন্যান্য তদন্তও বন্ধ হয়ে যায়।
সান সব সময়ই অন্যায়ের কথা অস্বীকার করে বলেছেন, প্রেসিডেন্টের ক্রিপ্টোকারেন্সি প্রজেক্টে তার সম্পৃক্ততা ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ছিল না।
গত বছর ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই নিয়মিতভাবে স্বার্থের সংঘাত এবং বিদেশি প্রভাবের আশঙ্কার মতো নানা অভিযোগের মুখে পড়েছে ডব্লিউএলএফ।
সম্প্রতি ট্রাম্প পরিবারকে আক্রমণ করতে গিয়ে এ প্রজেক্টের প্রসঙ্গ টেনে হান্টার বাইডেন বলেছেন, “তাদের ভণ্ডামির কোনো সীমা নেই।”