০৮ অক্টোবর ২০২৬, ২২ আশ্বিন ১৪৩৩

চেরনোবিল ভয়াবহতার চার দশক: ধ্বংসস্তূপ থেকে বর্তমান

কোটি মানুষের জীবন ও প্রকৃতিকে চিরতরে বদলে দেওয়া এ ভয়াবহ বিপর্যয়ের সূত্রপাত ঘটেছিল ভুলভাবে পরিচালিত এক পরীক্ষা থেকে।

চেরনোবিল ভয়াবহতার চার দশক: ধ্বংসস্তূপ থেকে বর্তমান
চেরনোবিল ইতিহাসের অন্যতম বড় বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত। ছবি: এআই

প্রযুক্তি ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 13 May 2026, 10:34 AM

Updated : 26 Aug 2026, 03:36 PM

সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিলে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের ভয়াবহতম পারমাণবিক বিপর্যয়ের চার দশক পূর্ণ হয়েছে এ বছর। সাধারণ পরীক্ষার ভুল থেকে শুরু হওয়া এ মহাবিপর্যয় কোটি মানুষের জীবন ও প্রকৃতিকে চিরতরে বদলে দিয়েছিল।

১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিল এ দুর্ঘটনাটি ঘটলেও বিশ্ববাসী এর খবর পায় দুই দিন পর, অর্থাৎ ২৮ এপ্রিল। সে সময় চেরনোবিল থেকে প্রায় এক হাজার কিলোমিটার দূরে সুইডেনের এক পারমাণবিক কেন্দ্রে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে বিষয়টি সবার নজরে আসে।

পরবর্তী দিন, সপ্তাহ ও মাসগুলোতে এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের প্রকৃত চিত্র ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকে, যার সূত্রপাত ভুলভাবে পরিচালিত এক পরীক্ষা থেকে হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে লিখেছে নটিলাস সাময়িকী।

ওই সময় বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কর্মীরা এক কৃত্রিম দুর্ঘটনার মহড়া দিচ্ছিলেন। তাদের উদ্দেশ্য ছিল বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার পর কীভাবে পারমাণবিক চুল্লিকে ঠান্ডা রাখা যায় তা পরীক্ষা করা।

তবে পরীক্ষার জন্য চুল্লির শক্তি নির্দিষ্ট মাত্রায় কমিয়ে আনা হলে তা হঠাৎ করেই প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পৌঁছে যায়। চুল্লির শক্তি পুনরায় বাড়ানোর জন্য কর্মীরা বেশ কিছু ‘কন্ট্রোল রড’ সরিয়ে ফেলেন, যা পরিস্থিতিকে অস্থির করে তোলে।

ফলে চুল্লির ভেতরে পারমাণবিক বিক্রিয়া তীব্র ও শীতলকারক তরল বা কুল্যান্ট অনিয়ন্ত্রিতভাবে ফুটতে শুরু করে। অতিরিক্ত বাষ্পের চাপে পারমাণবিক জ্বালানি ধরে রাখা বিভিন্ন দেয়াল ফেটে যায় ও তেজস্ক্রিয় বিভিন্ন পদার্থ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

ভয়াবহ বিস্ফোরণ ও চুল্লির গলন বা মেল্টডাউনের ফলে পুরো ভবনটি ধ্বংস হয়। চুল্লির মূল অংশ বা কোর জ্বলতে শুরু করলে সেখান থেকে কম করে হলেও ৫ শতাংশ তেজস্ক্রিয় পদার্থ আগুনের শিখার সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে মিশে যায়। এ বিষাক্ত তেজস্ক্রিয়তা তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ইউরোপের বড় এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।

পরিস্থিতি ঠেকাতে সোভিয়েত উদ্ধারকারী দল দ্রুত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশে এক ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ তৈরি করে, যা শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ মাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল।

ওই সময় জরুরি ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়া হয় এক লাখেরও বেশি মানুষকে। এ দুর্ঘটনার কয়েক বছর পরও আশপাশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আরও দুই লাখেরও বেশি মানুষকে অপেক্ষাকৃত কম দূষিত এলাকায় সরিয়ে নিয়ে পুনরায় বসতি গড়ে তোলা হয়।

বিস্ফোরণে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মত থাকলেও, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০০৬ সালের প্রতিবেদন অনুসারে, দুর্ঘটনার সময় ও এর পরপরই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৩০ জন কর্মী ও অগ্নিনির্বাপক কর্মী মারা যান। এর পরবর্তী বছরগুলোতে দুর্ঘটনার প্রভাবে তৈরি অন্যান্য কারণে আরও অনেকের মৃত্যু ঘটে।

চেরনোবিল ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল বিপর্যয় হিসেবে বিবেচিত। ‘ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়া’র এক গবেষণা অনুসারে, ৩০ বছরে এ ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ছিল প্রায় ৭০ হাজার কোটি ডলার।

গবেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের রক্ষণাবেক্ষণ, পরিত্যক্ত ভূমির ব্যবস্থাপনা ও দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণে এ খরচের পাল্লা দিন দিন আরও ভারী হচ্ছে।

এ বিপর্যয়ের অন্যতম ভয়াবহ পরিণতি ছিল শিশুদের স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব। চেরনোবিল থেকে ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে আসা শিশু ও তরুণদের মধ্যে থাইরয়েড ক্যান্সারের হার নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়।

২০০৪ সালের গবেষণাপত্র অনুসারে, চেরনোবিলের প্রভাবে যারা বেশি মাত্রায় তেজস্ক্রিয়তার শিকার হয়েছিল তাদের মধ্যে থাইরয়েড ক্যান্সারের ঝুঁকি অন্যদের তুলনায় প্রায় ৪৫ গুণ দেখা গেছে, বিশেষ করে যারা খুব সামান্য তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে এসেছিল তাদের তুলনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের এ ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার ছিল আশঙ্কাজনক।

চেরনোবিলকে ঘিরে থাকা সেই ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ আজও রয়েছে। তবে সম্প্রতি সেখান থেকে কিছু বিস্ময়কর পরিবেশগত তথ্য সামনে এসেছে।

বিপর্যায়ের পর চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রের চার নম্বর রিয়্যাকটর। ছবি: রয়টার্স

বিপর্যায়ের পর চেরনোবিল পারমাণবিক শক্তি কেন্দ্রের চার নম্বর রিয়্যাকটর

বিজ্ঞানীরা কয়েক দশক ধরে এ এলাকার টিকে থাকা বাস্তুসংস্থান নিয়ে গবেষণা করছেন, যেখানে এখনও তীব্র তেজস্ক্রিয়তা রয়ে গেছে।

প্রকৃতির ওপর এ বিপর্যয়ের ক্ষতিকর প্রভাবের কিছু উদ্বেগজনক লক্ষণ তারা খুঁজে পেয়েছেন। যেমন, টিউমারে আক্রান্ত পাখি, তেজস্ক্রিয়তা সহ্য করতে পারা ছত্রাক, জার্মানির বন পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয় বুনো শুকর।

প্রচণ্ড বিকিরণ থাকার পরও এ প্রতিকূল পরিবেশে প্রাণের অস্তিত্ব বিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলছে।

মানুষের উপস্থিতি না থাকায় নিষিদ্ধ এ এলাকায় এখন পশুপাখি ও গাছপালার এক বড় সমারোহ দেখা যাচ্ছে। তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব থাকার পরও এরা যেন সেখানে ডানা মেলে বিকশিত হচ্ছে।

তবে বিকিরণের প্রভাবে ওই অঞ্চলের ভূপ্রকৃতিতে পরিবর্তন এসেছে, যে কারণে কিছু নির্দিষ্ট প্রজাতির গাছ ও প্রাণী অন্যদের তুলনায় টিকে গেছে।

দীর্ঘ কয়েক দশক অনুপস্থিত থাকার পর বাদামী ভাল্লুক ও নেকড়ের মতো শিকারি প্রাণীরাও এখন ধ্বংসপ্রাপ্ত এ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশে ফিরে এসেছে। সেইসঙ্গে এদের শিকারযোগ্য প্রাণীর সংখ্যাও বেড়েছে।

‘ম্যাকমাস্টার ইউনিভার্সিটি’র রেডিওবায়োলজিস্ট কারমেল মাদারসিল বলেছেন, “এলাকাটি এখন গাছপালা আর বন্যপ্রাণীতে পরিপূর্ণ। তবে তা দুর্ঘটনার আগের অবস্থার মতো আর নেই।”

ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ এ মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ের ফলে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের ওপর যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে এখনও তা নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন গবেষকরা।

চার দশক আগে শুরু হওয়া এ মহাবিপর্যয় পৃথিবীকে চিরদিনের জন্য বদলে দিয়েছিল। সেই স্মৃতিকে মনে রেখেই এ বছর ৪১ বছর পূর্ণ হল।