Published : 21 May 2026, 10:23 AM
প্রযুক্তিবিশ্বের নজর এখন ক্যালিফোর্নিয়ার মাউন্টেন ভিউ শহরের দিকে। স্যান ফ্রান্সিসকো বে অঞ্চলের এ শহরেই গুগলের প্রধান কার্যালয় অবস্থিত, যা কোম্পানিটির বার্ষিক ডেভেলপার কনফারেন্স আয়োজনের জন্য সেরা জায়গা।
মঙ্গলবার এক জমকালো উদ্বোধনী বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ‘গুগল আই/ও ২০২৬’ ইভেন্ট। সাধারণত এই উদ্বোধনী পর্বেই গ্রাহকদের জন্য সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও দরকারি বিভিন্ন ঘোষণা নিয়ে আসে কোম্পানিটি।
গতানুগতিক মোবাইল ইকোসিস্টেম বা অ্যান্ড্রয়েডকে সরিয়ে এবারের পুরো আয়োজন জুড়েই ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের জয়জয়কার। সার্চ ইঞ্জিন থেকে শুরু করে জেমিনাইয়ের নতুন সংস্করণ, চমৎকার সব এআই টুলস ও নতুন হার্ডওয়্যারসহ ইভেন্টটির উদ্বোধনী মঞ্চে আরও যা যা ঘোষণা এসেছে তা একনজরে দেখে নেওয়া যাক–
গুগল সার্চে এআই
অ্যান্ড্রয়েড সংক্রান্ত বেশিরভাগ খবরই আগের সপ্তাহে চলে এসেছে। ফলে এবার নজর দেওয়ার পালা গুগলের সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ‘সার্চ’-এর দিকে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এসেছে গুগলের সার্চ বক্সে, যা গত কয়েক দশক ধরে কোটি কোটি মানুষের কাছে ইন্টারনেটের মূল প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করছে।
বুধবার থেকে সব ভাষা ও দেশে, বিশেষ করে যেখানে ‘এআই মোড’ সচল আছে সেখানে ‘ইন্টেলিজেন্ট এআই-পাওয়ার্ড সার্চ বক্স’ চালু করছে গুগল। কোম্পানিটি বলেছে, এ নতুন সার্চ বক্সটি সাধারণ ‘অটো-কমপ্লিট’ বা টাইপিংয়ের সময় কিওয়ার্ড সাজেস্টের চেয়ে উন্নত সেবা দেবে।
এ ফিচার ব্যবহারকারীর মনের উদ্দেশ্য বুঝতে ও সঠিক প্রশ্ন তৈরিতে সাহায্য করবে। এখন থেকে সার্চিংয়ের জন্য কেবল টেক্সট বা লেখাই নয়, বরং ছবি, ফাইল, ভিডিও ও ক্রোম ব্রাউজারের ট্যাবও ইনপুট হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
বিশ্বজুড়ে ডেস্কটপ ও মোবাইল ব্যবহারকারীরা এখন ‘এআই ওভারভিউ’তে যে কোনো ফলো-আপ প্রশ্ন করতে ও সরাসরি ‘এআই মোড’-এ প্রবেশ করতে পারবেন।

গুগলের দাবি, ব্যবহারকারী কোনো বিষয় নিয়ে যত গভীরভাবে খুঁজবেন সার্চ রেজাল্টে আসা লিংক ও তথ্যগুলো তার প্রয়োজনের সঙ্গে তত বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে।
তবে, অনেক ব্যবহারকারী যারা গুগলের সার্চ রেজাল্টে এআই ওভারভিউ বা অন্যান্য এআই ফিচার এড়িয়ে চলতে চান তাদের জন্য এসব পরিবর্তন ঝামেলার কারণ হবে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।
প্রকৃতির নিয়মেই গুগল তাদের ‘এআই মোড’কে আরও উন্নত করতে নতুন মডেল যোগ করছে। বুধবার থেকে এআই মোড ডিফল্টভাবে চলবে ‘জেমিনাই ৩.৫ ফ্ল্যাশ’ মডেলের মাধ্যমে, যা গুগলের একেবারে নতুন ফ্ল্যাশ মডেল।
পাশাপাশি, গুগল এআই মোডে ‘পার্সোনাল ইন্টেলিজেন্স’ ফিচারের পরিধি আরও বাড়াচ্ছে। এ সুবিধার মাধ্যমে কেউ চাইলে জেমিনাই’কে নিজের জিমেইল ও গুগল ফটোস-এর মতো অ্যাপ থেকে তথ্য নেওয়ার অনুমতি দিতে পারবেন, যা শিগগিরই গুগল ক্যালেন্ডারেও যোগ হচ্ছে।
মার্চেই গুগল যুক্তরাষ্ট্রের সব ব্যবহারকারীর জন্য এ পার্সোনাল ইন্টেলিজেন্স ফিচারটি বিনামূল্যে চালু করেছিল। আর বুধবার থেকে বিশ্বের প্রায় দুইশটি দেশ ও অঞ্চলে ৯৮টি ভাষায় এ টুলটি ব্যবহার করা যাচ্ছে।
গুগল সার্চে ‘ভাইব কোডিং’
গুগল সার্চ ইঞ্জিনে ‘ভাইব কোডার’ সবার জন্য চমক নিয়ে এসেছে। নিজেদের নতুন প্রযুক্তি ‘গুগল অ্যান্টিগ্র্যাভিটি’কে সার্চের সঙ্গে যোগ করছে গুগল। ফলে ব্যবহারকারীরা নিজেদের পছন্দমতো কাস্টমাইজড ‘ইউজার ইন্টারফেইস’ তৈরি করতে পারবেন, যেমন কোনো জিনিস কীভাবে কাজ করে তার ভিজুয়াল প্রেজেন্টেশন বা ঝটপট কোনো টেবিল, গ্রাফ ও সিমুলেশন বানিয়ে নেওয়া।
এ গ্রীষ্মেই সবাই বিনামূল্যে ‘জেনারেটিভ ইউআই’ টুলটি ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। এ ছাড়া সার্চের মধ্যেই এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নির্দিষ্ট কিছু কাজের জন্য ছোটখাটো ‘মিনি অ্যাপ’, যেমন ড্যাশবোর্ড বা ট্র্যাকার তৈরি করা যাবে।
গুগল বলেছে, টুলটি বিয়ে বা যে কোনো অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ও ফিটনেস ট্র্যাকিংয়ের মতো কাজে দারুণ সাহায্য করবে। কারণ অ্যান্টিগ্র্যাভিটি সরাসরি গুগলের লাইভ ডেটা, যেমন আবহাওয়া, লাইভ ম্যাপ ও রিভিউ ব্যবহার করতে পারবে।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘এআই প্রো’ ও ‘আল্ট্রা’ গ্রাহকরা এই গ্রীষ্মেই প্রথম এ সুবিধাটি পাবেন। বিষয়টি অনেকটা অ্যান্ড্রয়েডে কাস্টম উইজেট তৈরি করার সুবিধার মতোই, যা গুগল গেল সপ্তাহেই ঘোষণা করেছিল।

‘জেমিনাই ৩.৫’
আবারও জেমিনাই ৩.৫ প্রসঙ্গে ফিরে আসা যাক। এ সিরিজের প্রথম মডেল হিসেবে গুগল চালু করেছে ‘ফ্ল্যাশ’। বুধবার থেকেই তা সবার জন্য গুগলের ‘এআই মোড’ ও ‘জেমিনাই অ্যাপ’-এ চালু হচ্ছে। পাশাপাশি ডেভেলপার ও কর্পোরেট কোম্পানিগুলোর জন্য বিভিন্ন টুলেও এটি যোগ হচ্ছে। জুনেই আসবে এর চেয়ে শক্তিশালী ‘জেমিনাই ৩.৫ প্রো’ মডেল।
গুগল বলেছে, জেমিনাই ৩.৫ ফ্ল্যাশ হচ্ছে তাদের এ যাবৎকালের সবচেয়ে শক্তিশালী ‘এজেন্টিক ও কোডিং মডেল’, যা ডেভেলপারদের যে কোনো কাজ ‘অন্যান্য শীর্ষ মডেলের তুলনায় অর্ধেক খরচে ও সময়ের একটা সামান্য ভগ্নাংশেই’ কাজ সম্পন্ন করতে সাহায্য করবে।
কোম্পানিটির দাবি, ডেটা সায়েন্টিস্টদের মতো তাদের বিভিন্ন পার্টনার এরইমধ্যে জটিল সব ডেটা থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বা ইনসাইট বের করতে মডেলটি ব্যবহার করছেন।
গুগল আরও বলেছে, জেমিনাই ৩.৫ ক্ষতিকর তথ্য বা কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে অনেক বেশি সতর্ক থাকবে। পাশাপাশি, কোনো বৈধ বা সঠিক প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে ভুলবশত ‘না’ করে দেওয়ার প্রবণতাও এতে অনেক কম থাকবে।
কোম্পানিটির দাবি, ব্যবহারকারীর প্রম্পটের উত্তর দেওয়ার আগে এআইয়ের নিজস্ব যুক্তি বা চিন্তাভাবনা পরীক্ষা করার মতো আরও উন্নত ও আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখানে ব্যবহার হচ্ছে।
‘জেমিনাই ওমনি’
গুগল নিজেদের আলোচনার ঝুলিতে এআই মডেলের আরও নতুন এক সিরিজ যোগ করেছে। কোম্পানিটি বলেছে, তাদের নতুন ‘জেমিনাই ওমনি’ যে কোনো ইনপুট বা তথ্য থেকেই যে কোনো কিছু তৈরি করতে পারে।
যার শুরুটা হচ্ছে টেক্সট, ইমেজ, অডিও ও অন্য কোনো ভিডিওর ওপর ভিত্তি করে সম্পূর্ণ নতুন ভিডিও তৈরি করার সুবিধার মাধ্যমে। এর ইমেজ ও অডিও আউটপুট বা ফলাফল পাওয়ার সুবিধাও শিগগিরই আসছে।
ভিডিও এডিটিংয়ের কাজকে আরও সহজ ও আলাপের মতো করে তুলতে এ প্রযুক্তিটি এনেছে গুগল। তার দাবি, ব্যবহারকারী নিজের ধারণ করা ভিডিও এখানে আপলোড করে ওমনি’কে সেটির আশপাশের পরিবেশ, স্টাইল, ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল বা অন্যান্য খুঁটিনাটি পরিবর্তনের নির্দেশ দিতে পারবেন।
‘জেমিনাই ওমনি’ যে কোনো ধরনের ইনপুটের মিশ্রণ ঘটিয়ে ‘একক ও সুসংগত আউটপুট’ তৈরি করে দেবে। ফলে কেউ চাইলে এতে বিভিন্ন চরিত্রের ছবি, অন্য কোনো দৃশ্য বা স্কেচ ইনপুট হিসেবে দিতে পারবেন, যা ব্যবহার করে ওমনি ব্যবহারকারীর মনের মতো ভিডিও তৈরি করে দেবে।
কোম্পানিটি আরও বলেছে, এ প্রযুক্তির সাহায্যে নিজের কণ্ঠস্বরের সঙ্গে মিল রেখে একটি ডিজিটাল অবতার তৈরি করতে পারবেন এবং ‘এমন ভিডিও বানাতে পারবেন যা দেখতে ও শুনতে হুবহু আপনার মতোই লাগবে’।
তবে গুগল বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে, ওমনি দিয়ে তৈরি প্রতিটি ভিডিওতেই ‘সিন্থআইডি’ ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক থাকবে, যা স্পষ্ট করবে, ভিডিওটি গুগলের এআই মডেল ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে।
এ প্রযুক্তির প্রথম মডেল হিসেবে আসছে ‘জেমিনাই ওমনি ফ্ল্যাশ’। বুধবার থেকেই গুগলের ‘এআই প্লাস’, ‘প্রো’ ও ‘আল্ট্রা’ গ্রাহকদের জন্য জেমিনাই অ্যাপ এবং ‘গুগল ফ্লো’তে চালু হয়েছে। বাকি সবাই এ সপ্তাহে ‘ইউটিউব শর্টস’ ও ‘ইউটিউব ক্রিয়েট অ্যাপ’-এর মাধ্যমে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তা যাচাইয়ের সুযোগ পাবেন।

‘জেমিনাই স্পার্ক’
ব্যবহারকারীর হয়ে বিভিন্ন কাজ গুছিয়ে দেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট বা এজেন্ট হিসেবে ‘জেমিনাই স্পার্ক’ চালু করেছে গুগল, যা সরাসরি ক্লাউডে চলে, যার ফলে ব্যাকগ্রাউন্ডে কাজ করার সময় ল্যাপটপ বা ফোন চালু রাখার প্রয়োজন নেই।
‘জেমিনাই ৩.৫’ মডেলের ওপর ভিত্তি করে ‘জেমিনাই স্পার্ক’ তৈরি করেছে গুগল। ব্যবহারকারী অনুমতি দিলে মডেলটি তার জিমেইল ও ডকস-এর মতো ওয়ার্কস্পেস অ্যাপগুলোতেও প্রবেশ করতে পারবে।
গুগল বলেছে, স্পার্ক ব্যবহারকারীর জন্য নানা ধরনের কাজ করতে পারে। যেমন, কোনো নতুন বা লুকানো সাবস্ক্রিপশন চার্জ কাটা হচ্ছে কিনা তা দেখতে আপনার ক্রেডিট কার্ডের স্টেটমেন্টের ওপর নজর রাখা; সন্তানের স্কুল থেকে ইমেইলে পাঠানো আপডেটের খোঁজ রাখা বা কোনো প্রজেক্টের জন্য জিমেইল থেকে প্রয়োজনীয় নোট সংগ্রহ করে তা দিয়ে একটি সুন্দর ডক ফাইল তৈরি করে দেওয়া।
তবে কোনো ইমেইল পাঠানো, কেনাকাটা বা ব্যবহারকারীর ক্যালেন্ডারে নতুন কোনো ইভেন্ট যোগ করার মতো কাজ করার আগে স্পার্ক অবশ্যই তার অনুমতি নেবে। ক্যানভা, ওপেনটেবল ও ইনস্টাকার্ট-এর মতো গুগলের বিভিন্ন পার্টনার অ্যাপের সুবিধা নিয়েও মডেলটি তার হয়ে কাজ করে দিতে পারবে।
এ সপ্তাহেই বিশ্বস্ত কিছু পরীক্ষক স্পার্ক ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। আগামী সপ্তাহ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ‘গুগল এআই আল্ট্রা’ গ্রাহকরা ব্যবহার করতে পারবেন। গুগল ওয়ার্কস্পেসের ব্যবসায়িক গ্রাহকরাও খুব শিগগিরই জেমিনাই অ্যাপের মাধ্যমে যাচাই করতে পারবেন।
এ গ্রীষ্মেরই কোনো এক সময়ে জেমিনাই ডেস্কটপ অ্যাপেও স্পার্ক’কে যোগ করার পরিকল্পনা রয়েছে গুগলের, যাতে তা ব্যবহারকারীর কম্পিউটারের লোকাল ফাইল নিয়ে কাজ করতে ও ডেস্কটপের বিভিন্ন কাজের ধারাকে স্বয়ংক্রিয় করে তুলতে পারে।
জেমিনাই অ্যাপের আপডেট
জেমিনাই অ্যাপের ক্ষেত্রেও বেশ কিছু নতুন আপডেট নিয়ে এসেছে গুগল। ‘ওমনি’, ‘স্পার্ক’ ও ‘জেমিনাই ৩.৫’-এর মেলবন্ধনের পাশাপাশি অ্যাপটিতে ভিজুয়াল বা বাহ্যিক পরিবর্তন এনেছে কোম্পানিটি, যা তৈরি হয়েছে ‘নিউরোল এক্সপ্রেসিভ’ ডিজাইন ল্যাঙ্গুয়েজের ওপর ভিত্তি করে।
গুগলের ভাষায়, প্রাণবন্ত ও গতিশীল এ ডিজাইনে থাকবে ‘সহজ অ্যানিমেশন, উজ্জ্বল রং, নতুন টাইপোগ্রাফি ও হ্যাপটিক ফিডব্যাক বা স্পর্শানুভূতি’। আরও সাবলীল আলাপের অভিজ্ঞতা দিতে অ্যাপটিতে এখন যোগ হচ্ছে ‘জেমিনাই লাইভ’, যার মাইক্রোফোন ফিচারটিকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজানো হয়েছে।
কোম্পানিটির দাবি, এর ফলে ব্যবহারকারীরা ‘যে কোনো জটিল আইডিয়া বা ভাবনা নিজের গতিতে মনের মতো করে বলে যেতে পারবেন, মাঝপথে কথা কেটে যাওয়ার কোনো ভয় থাকবে না’।
এ ছাড়া, খুব শিগগিরই জেমিনাইয়ের জন্য নিজের অঞ্চলের উপভাষা বা কথ্যরূপ বেছে নেওয়ার সুযোগও মিলবে। এখন থেকে অ্যাপটি কেবল টেক্সট বা লেখার মাধ্যমে উত্তর দেবে না, বরং ছবি, ইন্টারঅ্যাক্টিভ টাইমলাইন ও ধারাভাষ্যসহ ভিডিওর মতো নানা মাধ্যমেও রেসপন্স করবে।
অ্যাপটিতে যোগ হওয়া ‘ডেইলি ব্রিফ’ নামের এক ফিচারের মাধ্যমে ব্যবহারকারী প্রতিদিন সকালে সারাদিনের কাজের সংক্ষিপ্ত বিবরণ বা ডাইজেস্ট পেয়ে যাবেন।
গুগল বলেছে, এ এআই এজেন্টটি ব্যবহারকারীর সারাদিনের ব্যস্ততার কথা মনে করিয়ে দিতে সব তথ্য এক জায়গায় এনে হাজির করবে। ‘ডেইলি ব্রিফ’ তাকে পরবর্তী করণীয় কাজগুলোর বিষয়েও পরামর্শ দেবে। বুধবার থেকে ‘গুগল এআই প্লাস’, ‘প্রো’ ও ‘আল্ট্রা’ গ্রাহকরা এ ফিচারটি ব্যবহারের সুবিধা পাচ্ছেন।

জিমেইল, ডকস ও কিপ-এর জন্য এআই ভয়েস ফিচার
গুগল তাদের জিমেইল, ডকস ও কিপ অ্যাপগুলোতে আরও কিছু নতুন এআই ফিচার যোগ করছে। কোম্পানিটি বলেছে, “এখন থেকে ‘জিমেইল লাইভ’ ফিচারের সাহায্যে আপনি আপনার সাধারণ কণ্ঠস্বর বা ভয়েস প্রম্পট ব্যবহার করেই ইনবক্সে যে কোনো কিছু খুঁজতে পারবেন।”
ব্যবহারকারী ফ্লাইটের গেইট নম্বর কত বা সন্তানের স্কুলে কী ঘটছে এমন যে কোনো বিষয়ে মুখে প্রশ্ন করলেই জিমেইল লাইভ ব্যবহারকারীর বিভিন্ন ইমেইল ঘেঁটে সঠিক উত্তরটি খুঁজে বের করবে।
অন্যদিকে, ‘ডকস লাইভ’ ব্যবহারকারীর মুখের অগোছালো কথা বা ভাবনাগুলোকে সুন্দরভাবে সাজিয়ে পরিচ্ছন্ন এক খসড়া বা ড্রাফট ডকুমেন্টে রূপান্তর করতে পারবে।
ব্যবহারকারীর অনুমতি পেলে টুলটি তার জিমেইল, ড্রাইভ, চ্যাট ও ওয়েব বা ইন্টারনেট থেকে প্রাসঙ্গিক তথ্য সংগ্রহ করে ডকুমেন্টে যোগ করতে পারবে।
গুগলের দাবি, ‘কিপ লাইভ’ ব্যবহারকারীর মুখের এলোমেলো কথাগুলোকে গুছিয়ে সুন্দর লিস্ট বা নোটে পরিণত করতে পারবে।
এরইমধ্যে এসব ফিচার চালু করতে শুরু করেছে কোম্পানিটি এবং ‘গুগল এআই প্রো’ ও ‘আল্ট্রা’ গ্রাহকরা সবার আগে এগুলো ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। গুগল ওয়ার্কস্পেসের ব্যবসায়িক গ্রাহকরা এ গ্রীষ্মেই এসব ফিচার ব্যবহার করতে পারবেন।
‘গুগল পিক্স’
গুগল সম্পূর্ণ নতুন একটি অ্যাপ নিয়ে এসেছে, যার নাম ‘গুগল পিক্স’। তবে এটিকে প্রচলিত ‘গুগল ফটোস’-এর সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা যাবে না। এ অ্যাপটি গুগলের একদম সাম্প্রতিক ‘ন্যানো ব্যানানা’ মডেলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে এবং এর মূল কাজ ‘ইমেজ জেনারেশন’ বা নতুন ছবি তৈরি করা ও ছবি এডিটিং।
গুগল বলেছে, ব্যবহারকারী অ্যাপটি ব্যবহার করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের চমৎকার ফ্লায়ার বা লিফলেট, সামাজিক মাধ্যমরে জন্য ছবি ডিজাইন ও সাধারণ ফটো এডিটিংয়ের কাজ করতে পারবেন।
কোম্পানিটি বলেছে, এ অ্যাপের মাধ্যমে ছবির বাকি অংশে কোনো প্রভাব না ফেলে ভেতরের নির্দিষ্ট কোনো জিনিসকে সরানো, সাইজ পরিবর্তন করা বা সেটি বদলে অন্য কিছু বসানো সহজ হবে। এতে ছবির ভেতরে থাকা টেক্সট বা লেখা এডিট ও অনুবাদও করা যাবে।
‘গুগল পিক্স’কে কোম্পানিটির ওয়ার্কস্পেস অ্যাপগুলোর সঙ্গে যোগ করেছে গুগল। ফলে ব্যবহারকারী সরাসরি ‘গুগল ড্রাইভ’ বা ‘স্লাইডস’-এর ভেতরে বসেই এ অ্যাপের বিভিন্ন ফিচার দিয়ে ছবি এডিট করে নিতে পারবেন।
বুধবার থেকে বিশ্বস্ত পরীক্ষকদের ছোট একটি দল প্রথম এ গুগল পিক্স ব্যবহারের সুযোগ পাচ্ছেন। গ্রীষ্ম থেকে ‘গুগল এআই প্রো’, ‘আল্ট্রা’ ও ‘গুগল ওয়ার্কস্পেস’-এর ব্যবসায়িক ব্যবহারকারীরা অ্যাপটি ব্যবহার করতে পারবেন।
গুগল প্লে
গুগল প্লে স্টোরের ক্ষেত্রে কোম্পানিটি ‘আস্ক প্লে’ নামে নতুন ফিচার নিয়ে আসছে, যা এআইভিত্তিক চ্যাটবট। এর সঙ্গে কথা বলে ব্যবহারকারী নিজের পছন্দ বা প্রয়োজন অনুসারে মানানসই অ্যাপের পরামর্শ খুঁজে নিতে পারবেন।
এ ছাড়া ‘আস্ক প্লে হাইলাইটস’ নামের একটি টুল জটিল সব সার্চ রেজাল্টকে সংক্ষেপে গুছিয়ে তুলে ধরবে। যাতে ব্যবহারকারী নিজের দরকারি অ্যাপ বা গেইমটি আরও দ্রুত খুঁজে পান।
পাশাপাশি, গেইম খেলার সময় স্ক্রিনের ওপর ভেসে থাকা গুগলের স্পেশাল ফিচার ‘প্লে গেইমস সাইডকিক’-এর পরিধি আরও বাড়ানো হচ্ছে এবং এতে সামাজিক যোগাযোগের সুবিধা যোগ হচ্ছে।
জুন থেকে এ ফিচারের মাধ্যমে গেইমের ভেতরে বসেই বন্ধুদের গেইমের বিভিন্ন প্রাপ্তি দেখতে পাবেন এবং নিজের পরিচিত কে কে এ মুহূর্তে একই গেইম খেলছে, তা-ও একনজরে দেখে নিতে পারবেন।
এআই প্ল্যানের নতুন মূল্য তালিকা
গুগলের এসব ফিচারের সুবিধা নিতে কেমন খরচ পড়বে তা জেনে রাখা দরকার। গুগল এখন তাদের ‘গুগল এআই আল্ট্রা প্ল্যান’-এর দ্বিতীয় ও কিছুটা কম দামের স্তর নিয়ে এসেছে, যার মাসিক খরচ পড়বে ১০০ ডলার।
২০ ডলারের ‘প্রো’ প্ল্যানের তুলনায় এ প্ল্যানে ‘গুগল অ্যান্টিগ্র্যাভিটি’ ও ‘জেমিনাই অ্যাপ’ পাঁচ গুণ বেশি ব্যবহারের সুযোগ থাকবে। সেইসঙ্গে এতে মিলবে ২০ টেরাবাইট ক্লাউড স্টোরেজ, ইউটিউব প্রিমিয়ামসহ আরও অনেক কিছু।
গুগল তাদের সবচেয়ে প্রিমিয়াম বা সর্বোচ্চ স্তরের এআই আল্ট্রা প্ল্যানের দাম ২৫০ ডলার থেকে কমিয়ে মাসে ২০০ ডলার নির্ধারণ করেছে। এর পাশাপাশি, আল্ট্রা প্ল্যানের ১০০ ডলারের একটি সাশ্রয়ী প্যাকেজের ঘোষণা করেছে গুগল, যাতে আগের সব সুবিধাই থাকবে। তবে প্রো প্ল্যানের চেয়ে ২০ গুণ বেশি এবং ১০০ ডলারের আল্ট্রা প্ল্যানের চেয়ে ৪ গুণ বেশি গুগল অ্যান্টিগ্র্যাভিটি ও জেমিনাই অ্যাপ ব্যবহারের সুবিধা মিলবে।

‘সায়েন্স ফর জেমিনাই’
গুগল আই/ও ২০২৬-এর মূল উদ্বোধনী ইভেন্টটি শেষ হয়েছে ‘জেমিনাই ফর সায়েন্স’ প্রোগ্রামের এক সারসংক্ষেপ দিয়ে, যেটিকে ‘বৈজ্ঞানিক গবেষণার পরিধি ও নিখুঁততা বাড়াতে তৈরি কিছু বিজ্ঞানভিত্তিক টুল ও এক্সপেরিমেন্টের সংগ্রহ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে গুগল।
এর মধ্যে রয়েছে ‘গুগল ল্যাবস’-এর কিছু পরীক্ষামূলক টুল ও ‘স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটি’, ‘ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন’ থেকে শুরু করে ‘ক্রিক ইনস্টিটিউট’সহ ১০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্ব।
গুগল একগুচ্ছ ‘সায়েন্স স্কিলস’ চালু করেছে, যা ‘গুগল অ্যান্টিগ্র্যাভিটি’র মতো বিভিন্ন এআই এজেন্ট প্ল্যাটফর্মে যোগ করা যাবে। ফলে ইউনিপ্রট, আলফাফোল্ড ডেটাবেইস, আলফাজিনোম এপিআই ও ইন্টারপ্রট-এর মতো বিজ্ঞানভিত্তিক ডেটাবেইস ও টুলগুলো থেকে তথ্য নিয়ে কাজ করা এবং সেগুলো বিশ্লেষণ করা সহজ যাবে।
আপাতত ‘জেমিনাই ফর সায়েন্স’-এর সবচেয়ে দ্রুত ব্যবহারোপযোগী অংশ হিসেবে ‘গুগল ল্যাবস’-এ তিনটি প্রাথমিক প্রোটোটাইপ বা মডেল রাখা হয়েছে। এগুলো গবেষকদের কোনো বৈজ্ঞানিক হাইপোথিসিস বা ধারণা তৈরি করা, কম্পিউটেশনাল আবিষ্কার ও বিজ্ঞান বিষয়ক লেখালেখি বা সাহিত্য থেকে তথ্য পাওয়ার কাজে সাহায্য করবে।
আগ্রহীদের জন্য এসব পরীক্ষামূলক টুলের ব্যবহার বুধবার থেকে ধীরে ধীরে চালু হবে এবং গুগলের ওয়েবসাইটে গিয়ে এসব ল্যাবস ফিচারের জন্য নিবন্ধন করা যাবে।
অ্যান্ড্রয়েড এক্সআর
এ পুরো আয়োজনের সারসংক্ষেপটি ‘অ্যান্ড্রয়েড এক্সআর’ আপডেটের মাধ্যমে শেষ করা যাক।
কিছুটা অবান্তর শোনালেও সত্যি যে, মাথার ভেতর জমে থাকা এতসব এআইয়ের জটিল হিজিবিজি দূর করে নিজেকে আবার একটু রক্ত-মাংসের মানুষ মনে করার জন্যই এই অংশে আসা! পুরো ‘গুগল আই/ও’ ইভেন্টের মধ্যে সম্ভবত এ একটি জায়গাতেই কিছুটা যান্ত্রিকতার বাইরে আসার সুযোগ মিলবে।
গুগল ও স্যামসাং যৌথভাবে দুই মডেলের স্মার্ট চশমার প্রথম ঝলক দেখিয়েছে, যা তারা ‘জেন্টল মনস্টার’ ও ‘ওয়ার্বি পার্কার’-এর সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে তৈরি করেছে। এসব চশমার বিশেষত্ব হচ্ছে, এতে ব্যবহারকারী সরাসরি নিজের কণ্ঠস্বর বা ভয়েস ব্যবহার করে জেমিনাইয়ের সঙ্গে চ্যাটিং করতে পারবেন।
রাস্তাঘাট চেনার জন্য বা ঝটপট কোনো স্ন্যাক্স বা পানীয় খাওয়ার জায়গার খোঁজ পেতে এ অ্যাসিস্ট্যান্টের সাহায্য নেওয়া যাবে।
এ ছাড়া এসব চশমা বক্তার নিজস্ব কণ্ঠস্বরের আদলে রিয়াল-টাইম অডিও অনুবাদ করে দিতে পারবে। ক্যামেরার সামনে থাকা যে কোনো লেখার ভাষাও তা চোখের পলকে বদলে দিতে পারে। এর মাধ্যমে ছবিও তোলা যাবে। তবে স্মার্ট চশমা ব্যবহারকারীদের মাধ্যমে ব্যক্তিগত প্রাইভেসির লঙ্ঘনের বিষয়ে যারা চিন্তিত তাদের উদ্বেগ কতটা দূর করতে পারবে তা বলা মুশকিল।
এসব মডেল এ বছরের শরতে নির্দিষ্ট কিছু বাজারে কিনতে পাওয়া যাবে। যার দাম ও অন্যান্য খুঁটিনাটি বিষয়গুলো পরে ঘোষণায় জানাবে গুগল।