Published : 11 Mar 2026, 12:11 PM
পরিশ্রমের বেলাতে মৌমাছির উদাহরণ পুরোনো বিষয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণের বেলাতেও যে তারা রীতিমতো স্মার্ট সেটাই উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
আমেরিকান বিজ্ঞানভিত্তিক ম্যাগাজিন নটিল ডটআস প্রতিবেদনে লিখেছে, মানুষ যেমন কেনাকাটার সময় ফলের রং বা ঘ্রাণ দেখে সেরাটি বেছে নেয়, মৌমাছিরাও ঠিক একইভাবে পরিস্থিতি বুঝে সহজ বা জটিল সংকেত ব্যবহার করে দ্রুত সঠিক ফুলটি নির্বাচন করে। তাদের এই ‘স্মার্ট’ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কৌশল বিজ্ঞানীদের রীতিমতো অবাক করেছে।
মৌমাছি সম্পর্কে যত বেশি জানা যাচ্ছে ততই এদের এমন সব মানসিক দক্ষতার পরিচয় মিলছে, যা অনেকটা মানুষের মতোই। এক শতাব্দী আগে আচরণবিজ্ঞানী কার্ল ফন ফ্রিশ আবিষ্কার করেছিলেন, মৌমাছিরা নাচের মাধ্যমে একে অপরকে ফুলের মধুর সন্ধান দেয়। ওই সময় থেকেই এদের অসাধারণ বুদ্ধিমত্তার বিষয়টি সামনে আসতে শুরু করে।
২০২৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, মৌমাছিরা চোখের দেখা কোনো জিনিসকে আলাদা করতে, বিমূর্ত নিয়ম শিখতে এবং প্রাথমিক গণিতও বুঝতে পারে। এখন নতুন গবেষণায় এ তালিকায় যোগ হয়েছে মৌমাছির মানুষের মতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা।
গবেষণাটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ সাময়িকীতে।
‘বাম্বলবি’ কীভাবে পরিস্থিতি অনুসারে তাদের শেখার ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া পরিবর্তন করে তা নিয়ে গবেষণা চালিয়েছেন জার্মানির গবেষকরা। একটি বাম্বলবি প্রতিদিন শত শত ফুল পরিদর্শন করে। ফলে একে অসংখ্যবার সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে কোন ফুলটি তাকে মধু দেওয়ার বেলায় অপেক্ষাকৃত ভালো।
জার্মানির ‘ইউনিভার্সিটি অফ কনস্ট্যান্স’-এর নিউরোইথোলজিস্ট ও এ গবেষণার লেখক আনা স্টোকল বলেছেন, “বাম্বলবিরা খুব অল্প সময়ের মধ্যে অনেকগুলো সিদ্ধান্ত নেয়, ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণার জন্য এ পতঙ্গ বিশেষভাবে উপযোগী।”
গবেষকরা প্রথমে মৌমাছিদের এক বিশেষ রঙের সঙ্গে নির্দিষ্ট নকশা বা আকৃতির সমন্বয় চিনতে প্রশিক্ষণ দেন, যার মাধ্যমে এরা বুঝতে পারে কোন ফুলটিতে মধু আছে আর কোনটিতে কেবল পানি।
যেমন, একটি নীল রঙের তারা আকৃতির ফুলে হয়ত চিনির দ্রবণ বা মধু রাখা হয়েছিল। আর একটি হলুদ রঙের গোল আকৃতির ফুলে ছিল কেবল পানি। এরপর গবেষকরা বিভিন্ন ফুলের রং, আকৃতি বা নকশা অদলবদল করে দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন, খাবার সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় মৌমাছিরা আসলে কোন সংকেতটির ওপর বেশি নির্ভর করে।
এসব সংকেত (রং ও আকৃতি) ওলটপালট করে দেওয়ার পর দেখা গেল মৌমাছিরা আকৃতি বা নকশার চেয়ে রঙের ওপর ভিত্তি করেই ফুল নির্বাচন করছে। যেমন, একটি হলুদ তারা-আকৃতির ফুলের চেয়ে এরা নীল রঙের গোল ফুলটিকে বেশি পছন্দ করেছে।
তবে যখন মৌমাছিদের এমন ফুল দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হল, যেগুলোর রঙের পার্থক্য খুবই সামান্য (যেমন কমলা-লাল রঙের বিভিন্ন আভা) তখন এরা রং ছেড়ে ফুলের আকৃতি ও নকশার দিকে মনোযোগ দিল। পরীক্ষার সময় এরা সেসব আকৃতির ফুলের দিকেই বেশি আকৃষ্ট হয়েছে যেগুলোতে আগে মধু ছিল।
গবেষণার লেখক স্টোকল বলেছেন, “এভাবে মৌমাছিরা ‘যতটুকু প্রয়োজন ঠিক ততটুকুই’ এই নীতি অনুসরণ করে ধারাবাহিকভাবে সেরা ফলাফল নির্বাচন করেছে।”
সহজভাবে বললে, যখনই সম্ভব হয়, মৌমাছিরা রঙের ওপর ভিত্তি করে চটজলদি সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ জটিল কোনো আকৃতি বা নকশা চেনার চেয়ে রং চেনা এদের জন্য সহজ। তবে যদি রঙের মাধ্যমে পার্থক্য করা না যায়, কেবল তখনই এরা বাড়তি সময় নিয়ে ফুলের আকৃতি বা নকশা চেনার চেষ্টা করে।
মানুষও ঠিক একইভাবে সবচেয়ে স্পষ্ট সংকেতগুলোর ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়। যেমন, মানুষ বাজার থেকে ফল কেনার সময় সবুজ ফলের চেয়ে গোলাপি কমলা রঙের ফলগুলোই আগে বেছে নেবেন। তবে সব ফলের রং একই রকম হলে একটু সময় নিয়ে সেগুলো শুঁকে বা হাত দিয়ে টিপে দেখে তারপর কেনেন। ফলটি কতটা পেকেছে তা নিশ্চিত হতে মানুষ ঘ্রাণ বা স্পর্শের মতো বাড়তি বিভিন্ন সংকেতও ব্যবহার করেন।
মৌমাছিদের ক্ষেত্রেও বিষয়টি ঠিক একই রকম, পার্থক্য কেবল এটুকুই, এদের আগ্রহের বিষয়টি হচ্ছে ফুল।