Published : 02 Jul 2026, 02:20 PM
আধুনিক প্রযুক্তির যুগে প্রায় প্রতিটি দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে বিদ্যুৎ পরিবহনের লাইন ও ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন ট্রান্সফরমার। চীনের ক্ষেত্রেও তা সত্যি।
২০২৫ সালের শেষদিকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী স্মার্ট ডাইরেক্ট কারেন্ট বা ডিসি ট্রান্সফরমার চালুর ঘোষণা দিয়েছে চীন। ডিসি মূলত ‘অল্টারনেটিং কারেন্ট’ বা এসি থেকে ভিন্নভাবে কাজ করে এবং দীর্ঘ দূরত্বে অনেক পরিমাণ বিদ্যুৎ পাঠানোর জন্য বেশি কার্যকর বলে প্রতিবেদনে লিখেছে প্রযুক্তি সংবাদের সাইট স্ল্যাশগিয়ার।
নতুন ট্রান্সফরমারটির নির্মাতা কোম্পানি ‘চ্যাংঝু সিডিয়ান ট্রান্সফরমার’ বলেছে, এর সক্ষমতা ৭৫০ মিলিয়ন ভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার।
স্মার্ট ট্রান্সফরমার এমন এক যন্ত্র, যা তাৎক্ষণিক বিদ্যুৎ প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সুবিধা দেয়। ফলে অপারেটররা প্রয়োজন অনুযায়ী বিদ্যুৎ প্রবাহ, তাপমাত্রা ও ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। চীনের এ নতুন ইউনিটটিকে বিশেষভাবে ‘স্মার্ট’ বলা হচ্ছে কারণ তা উচ্চ-ভোল্টেজের ডিসি সিস্টেমে ডিজিটাল নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে।
চীনের দাবি, দীর্ঘ দূরত্বে বিদ্যুৎ পাঠানোর ক্ষেত্রে স্থায়িত্ব ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই এই প্রযুক্তি তৈরি করেছে তারা। এ ছাড়া পরিবেশবান্ধব জ্বালানি, যেমন সৌর বা বায়ু শক্তি থেকে আসা বিদ্যুতের ওঠানামা সামাল দিতেও এই ট্রান্সফরমার সাহায্য করবে।
নতুন এ ‘৭৫০ এমভিএ’ নামের স্মার্ট ইউনিটটি চীনের বর্তমান ‘এইচভিডিসি’ ট্রান্সফরমারগুলোর তুলনায় অনেক উন্নত। কারণ, আগের বিভিন্ন ট্রান্সফরমারের সক্ষমতা ছিল প্রতিটিতে ৫৮৭.১ এমভিএ, যা চীনের এ নতুন ইউনিটের সক্ষমতার ধারেকাছেও নেই।
তবে আগের এসব ট্রান্সফরমার বসানোর সময় সক্ষমতার দিক থেকে সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল এবং ওই সময়ে সেগুলোই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী এইচভিডিসি ট্রান্সফরমার।
২০২৪ সালের শরতে চীনের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলের পাওয়ার গ্রিড আকস্মিক এক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। এ ঘটনার মূল কারণ ছিল ‘লো-ফ্রিকোয়েন্সি পাওয়ার অসিলেশন’ বা নিম্ন-কম্পাঙ্কের বিদ্যুৎ দোলন। বিদ্যুতের সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে সাময়িক তারতম্যের কারণে পুরো সিস্টেমের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত বিদ্যুৎপ্রবাহে অস্থিরতা বা কাঁপনি তৈরি হয়েছিল।
বিদ্যুতের এই আকস্মিক ওঠানামা কেবল জিনজিয়াং অঞ্চলের স্থিতিশীলতাকেই হুমকিতে ফেলেনি, বরং পুরো দেশের সামগ্রিক গ্রিড ব্যবস্থাকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছিল।
বিদ্যুতের এ ধরনের ওঠানামা জিনজিয়াংয়ের মতো অঞ্চলের জন্য বিশেষ বিপজ্জনক। কারণ সেখানে বিশ্বের বড় বায়ু ও সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো অবস্থিত। আর, বায়ু ও সৌরশক্তি থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়।
মেঘলা বা বৃষ্টির দিনে বিভিন্ন সৌরপ্যানেল খুব বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে না, আবার বায়ুচালিত বিভিন্ন টারবাইন কেবল তখনই পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ তৈরি করে যখন বাতাসের গতি একটি নির্দিষ্ট সীমায় থাকে। ফলে বিদ্যুৎ রূপান্তর কেন্দ্রগুলোর জন্য চাহিদাও সরবরাহের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা অনেক কঠিন হয়ে পড়ে।
বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের পরিধি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চীনের পাওয়ার গ্রিডও ক্রমাগত নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ২০২৫ সালে দেশটির কিছু অঞ্চলে এতটাই বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদিত হয়েছিল যে, এর সবটুকু ব্যবহার করা সম্ভব হয়নি। এ পরিস্থিতির কারণে সরকারি কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ উৎপাদন সীমিত করতে বাধ্য হন।
পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎস তৈরিতে সফল হচ্ছে চীন। তবে উৎপাদিত সেই বিদ্যুৎ আসলে পাওয়ার গ্রিডে সঠিকভাবে পৌঁছানো ও তা কাজে লাগানোই এখন দেশটির কাছে প্রধান অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে।