Published : 02 Jul 2026, 08:28 PM
বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সঙ্গে মিলে অর্থনৈতিক করিডোর করার বিষয়ে চীনের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে দেশটির রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, ভারতসহ অন্যদেরও এখানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ আছে।
ভারতকে সঙ্গে নিয়ে চার দেশের এমন করিডোরের প্রসঙ্গ টেনে করা প্রশ্নে তিনি বলেন, “আমি বলতে চাই, এখানেই শেষ নয়। আমরা উন্মুক্ত। আমরা অন্যান্য দেশকেও স্বাগত জানাই, যদি তারা প্রস্তুত থাকে, তাহলে আমরা উন্মুক্ত আছি।
“কিন্তু এটা তাদের বিষয়, তারা অংশীদার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেবে, নাকি অপেক্ষা করে দেখবে। বাংলাদেশ-মিয়ানমারের সঙ্গে মিলে এই অর্থনৈতিক করিডোর করার বিষয়ে চীন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।”
বৃহস্পতিবার ঢাকায় দূতবাসে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এ কথা বলেন।
যোগাযোগ ও অর্থনীতির ‘ব্যাপ্তি বাড়াতে’ বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চীন পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর করার প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরে নতুন করে সামনে এনেছে বেইজিং।
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোরের ধারণা নতুন কিছু নয়। এটি চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ এর অধীন একটি প্রস্তাবিত আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ রুট। এই করিডোরের মূল লক্ষ্য হল চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি বাণিজ্যিক ও কাঠামোগত সংযোগ স্থাপন।
গত শতকের নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোরের প্রস্তাব করা হয়েছিল, যা বিসিআইএম নামে পরিচিতি পায়। ২০১৩ সালের দিকে সেই উদ্যোগ আন্তঃসরকার স্বীকৃতিও পায়।
কিন্তু চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ উদ্যোগ নিয়ে ভারতের ভূ-রাজনৈতিক আপত্তি ও অনীহার কারণে পরবর্তীতে বিসিআইএম প্রকল্প স্থবির হয়ে পড়ে।
এরপর ভারতকে বাদ দিয়ে চীন তাদের বিদ্যমান চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর সম্প্রসারিত করে সরাসরি বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেয়। মূলত এটিই এখন সম্ভাব্য ‘চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ ইকোনমিক করিডোর’ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে।
এই করিডোর চীনের ইউনান প্রদেশের রাজধানী কুনমিং থেকে শুরু হয়ে মিয়ানমারের মান্দালয় পৌঁছাবে। সেখান থেকে একটি অংশ মিয়ানমারের ইয়াঙ্গন এবং অন্য একটি অংশ রাখাইন রাজ্যের কিয়াউকপিউ গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
এই সংযোগটি পরে সড়ক ও রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও কক্সবাজার অঞ্চলের সাথে যুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে চীনের।
বলা হচ্ছে, এ করিডোর হলে বাংলাদেশের সড়ক, রেলওয়ে, বন্দর এবং বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতে বিপুল পরিমাণ চীনা বিনিয়োগ আসার সুযোগ তৈরি হবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং চীনের বিশাল বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের প্রবেশ সহজ হবে।
পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে সময় ও খরচ উভয়ই উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসবে, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে। পাশাপাশি যোগাযোগ ও লজিস্টিক হাব গড়ে ওঠার ফলে দেশে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
এই করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মিয়ানমারের অস্থিতিশীল রাখাইন রাজ্যের ওপর দিয়ে যাবে। চীনের ভাষ্য, রাখাইনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত হলে সেখানকার জাতিগত ও রাজনৈতিক অস্থিরতা কমে আসবে।
এই উদ্যোগ যে নতুন নয়, সেই প্রসঙ্গ টেনে রাষ্ট্রদূত ইয়াও বলেন, “আপনি যেভাবে বলেছেন, আমরা ১৫ বছর আগে বিসিআইএম প্রস্তাব করেছিলাম। আমরা কিছু অগ্রগতিও অর্জন করেছিলাম, কিন্তু কিছু কারণে চীন যেভাবে পরিকল্পনা সাজিয়েছিল, সেটা আমরা অর্জন করতে পারিনি।

“যেহেতু এখন বাংলাদেশে বেশি পরিমাণে আঞ্চলিক যোগাযোগ চায়, চীনও চায় বেশি পরিমাণে আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং আমার বিশ্বাস মিয়ানমারও একই ধরনের সহযোগিতা চায়। তাহলে এখন যে অবস্থায় আছে, সেখান থেকে আমাদের দুই দেশ কেন শুরু করবে না। সুতরাং কানেক্টিভিটি নিয়ে আলোচনা হবে।”
কানেক্টিভিটির ধরণ কেমন হবে, সেই প্রশ্নে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, “আমার বিশ্বাস, আমরা কানেক্টিভিটি দিয়ে শুরু করব। সত্যিকারের কোনো অর্থনৈতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এটা পূর্বশর্ত।
“এর মধ্যে আমরা কানেক্টিভিটির বাইরের বিষয় এবং মেরিটাইম সহযোগিতার বিষয়েও আলোচনা করতে চাই। সুতরাং এটা খুবই প্রাথমিক পর্যায়, আমরা বিস্তারিত পরিসরে যাইনি।”
তিনি বলেন, অর্থনৈতিক করিডোরের বিষয়ে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঐকমত্যের পর এখন কর্মকর্তারা সেটা বাস্তবায়নে রোডম্যাপ তৈরির কাজ করবে।
রাখাইন রাজ্যে সংকটের প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের প্রস্তাবে মিয়ানমারে মানবিক করিডোর দেওয়ার আলাপ তুলেছিল মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সরকার ও সরকারের বাইরের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বিরোধিতার মুখে সেই উদ্যোগ থেকে পিছিয়ে আসে তারা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ওই উদ্যোগের অগ্রভাগে ছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ইউনূসের তৎকালীন রোহিঙ্গা সমস্যা ও অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত বিষয় সংক্রান্ত হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমান।
ওই ব্যর্থ প্রচেষ্টা পেরিয়ে তিনি যখন নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী, তখন মিয়ানমারের সঙ্গে মিলে অর্থনৈতিক করিডোরে নিয়ে প্রস্তাব এল।
নতুন অর্থনৈতিক করিডোর থেকে মানবিক করিডোরে রূপান্তরিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা আছে কি-না, এমন প্রশ্নে রাষ্ট্রদূত ইয়াও বলেন, “আমাদের উদ্যোগ শুধু যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক উন্নতি। আপনি যেটা বললেন, সেটা আমাদের ভাবনাতে নেই, এটা কোনো আলোচনার বিষয় নয়।
“সুতরাং আপনি জানেন, চীন কখনও কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করবে না।”