Published : 22 Apr 2026, 02:32 PM
দীর্ঘ ১৫ বছর অ্যাপলে নেতুত্ব দেওয়ার পর অবসর নিচ্ছেন টিম কুক। তার নেতৃত্বে অ্যাপল কেবল টিকে থাকেনি, বরং চার ট্রিলিয়ন ডলারের সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছে।
কুকের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন অ্যাপলকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সোমবার এক ঘোষণায় কোম্পানিটি বলেছে, দীর্ঘ ১৫ বছর শীর্ষ পদে থাকার পর কুক ২০২৬ সালের ১ সেপ্টেম্বর অ্যাপলের সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন।
তার স্থলাভিষিক্ত হবেন বর্তমানে অ্যাপলের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান ও কোম্পানির সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জন টার্নাস। কুক কোম্পানি ছেড়ে চলে যাচ্ছেন না। তিনি নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে নতুন দায়িত্ব পালন করবেন।
তবে এ পরিবর্তনের মাধ্যমে অ্যাপলে ঐতিহাসিক এক অধ্যায়েরই সমাপ্তি ঘটছে।
প্রযুক্তি সংবাদের সাইট নাইনওয়ানমোবাইলস প্রতিবেদনে লিখেছে, স্টিভ জবস পরবর্তী সময়ে অ্যাপল যে কেবল টিকেই থাকবে না, বরং চার ট্রিলিয়ন ডলারের ব্যবসায় পরিণত হবে এবং বার্ষিক আয় প্রায় চার গুণ বাড়বে, যা এক সময় অনেকের কাছে অসম্ভব মনে হয়েছিল সেটিই করে দেখিয়েছেন কুক।
কুক নিজে অবশ্য বিনয়ের সঙ্গে বলেছেন, অ্যাপলের সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করা তার জীবনের “সেরা সম্মানের বিষয়।”
“আমি আমার সর্বস্ব দিয়ে অ্যাপলকে ভালোবাসি। এমন এক প্রতিভাবান, উদ্ভাবনী, সৃজনশীল ও আন্তরিক দলের সঙ্গে কাজের সুযোগ পেয়ে আমি কৃতজ্ঞ, যারা আমাদের গ্রাহকদের জীবনকে সমৃদ্ধ করতে সবসময় অবিচল থেকেছে।”
১৫ বছরে কুক অ্যাপলের পণ্যের তালিকায় এমন অনেক কিছু যোগ করেছেন, যা স্টিভ জবসের রেখে যাওয়া আইফোন ও ম্যাকের গণ্ডি ছাড়িয়েছে। এখানে দেখা যাক কুকের আমলের সেরা ছয়টি অ্যাপল পণ্য—

অ্যাপল ওয়াচ
২০১৫ সালে প্রথম বাজারে আসে অ্যাপল ওয়াচ। ওই সময় এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছিল। এর আগেও অ্যাপলে স্মার্টওয়াচ তৈরির চেষ্টা হয়েছিল তবে তা খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি।
তবে কুকের নেতৃত্বে থেমে থাকেনি অ্যাপল। কোম্পানিটি ক্রমাগত এর উন্নয়ন করে গেছে। ধীরে ধীরে অ্যাপল ওয়াচ কেবল ফ্যাশন অনুষঙ্গ বা ফোনের সঙ্গী হিসেবে নয়, বরং গুরুত্বপূর্ণ স্বাস্থ্যবিষয়ক ডিভাইস হিসেবে নিজের পরিচয় তৈরি করে নিয়েছে।
মালিকের পড়ে যাওয়া শনাক্ত করা, ইসিজি, রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা মাপা ও গাড়ি দুর্ঘটনা শনাক্তের মতো ফিচারের মাধ্যমে অ্যাপল ওয়াচ কোটি কোটি মানুষের কাছে সত্যিকার অর্থেই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
গবেষণা কোম্পানি ‘কাউন্টারপয়েন্ট’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, গেল বছর বিশ্বজুড়ে মোট স্মার্টওয়াচ বিক্রির প্রায় ২৫ শতাংশ ছিল অ্যাপলের দখলে। অ্যাপলে পরিধানযোগ্য প্রযুক্তির এই বিশাল বাজার তৈরির কৃতিত্ব কুককেই দেওয়া হয়, যার সবচেয়ে বড় প্রমাণ এই অ্যাপল ওয়াচ।
বর্তমানে অ্যাপল ওয়াচের সর্বশেষ সিরিজ ১১, ‘ওয়াচ এসই ৩’ ও ‘ওয়াচ আল্ট্রা ৩’ এর মাধ্যমে কুক স্মার্টওয়াচের এমন এক পোর্টফোলিও তৈরি করেছেন, যার ক্রেতার গণ্ডী আইফোনের চেয়ে বিস্তৃত।
আরও কয়েক বছর পর্যন্ত এ খাতে অ্যাপলের আধিপত্য অব্যাহত থাকতে পারে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।
এয়ারপডস
২০১৬ সালে প্রথম বাজারে আসে এয়ারপডস। ওই সময় অনেকেই ডিভাইসটি নিয়ে বিদ্রূপ করেছিলেন। তারহীন এসব ইয়ারবাড দেখতে অনেকটা এমন ছিল যেন কেউ সাধারণ ইয়ারপডসের তার কেটে দিয়েছে। তবে সেই উপহাস ছাপিয়ে এয়ারপডস আজ বিশ্বের অন্যতম পরিচিত প্রযুক্তিতে পরিণত হয়েছে।
জন টার্নাসের হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং নেতৃত্ব ও কুকের আমলে এয়ারপডস কেবল সুবিধাজনক এক পণ্য থেকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া ‘ইন-ইয়ার’ হেডফোনে পরিণত হয়েছে।
ডিভাইসটিতে যোগ হয়েছে উন্নত ‘নয়েজ ক্যানসেলেশন’ এবং সম্প্রতি এতে যোগ হয়েছে ‘হিয়ারিং এইড’ বা শ্রবণ সহায়ক কার্যকারিতা। শেষ সংযোজনটি সম্ভবত সবচেয়ে অর্থবহ, যা ফ্যাশন অনুষঙ্গটিকে লাখো মানুষের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য টুলে পরিণত করেছে।
অ্যাপল ওয়াচের মতো ‘এয়ারপডস ৪’ ও ‘এয়ারপডস প্রো ৩’ বর্তমানে তাদের নিজ নিজ বিভাগে শীর্ষে রয়েছে এবং কোম্পানিটি অন্যতম জনপ্রিয় পণ্য হিসেবে টিকে আছে।

অ্যাপল সিলিকন
২০২০ সালে ‘এম১’ নামের চিপের মাধ্যমে ইনটেল থেকে অ্যাপলের নিজস্ব ডিজাইনের সিলিকনে রূপান্তর ছিল কোম্পানির ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন। এর ফলে অ্যাপল তাদের গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পায়।
এই চিপ অ্যাপলকে পারফরম্যান্স ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের ক্ষেত্রে এমন এক উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে, যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বীরা এখনও তা ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ পরিবর্তনের ফলেই অ্যাপলের ম্যাক বিভাগটি নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
বর্তমানে ম্যাকের ৪০ বছরের ইতিহাসে কম্পিউটারটি বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে শক্তিশালী ও জনপ্রিয় অবস্থানে রয়েছে, যার মূল ভিত্তি ‘অ্যাপল সিলিকন’। অ্যাপলের এই দীর্ঘ, জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ প্রক্রিয়াটি শেষ পর্যন্ত পুরোপুরি সফল হয়েছে বলা যায়।
বর্তমানে অ্যাপল সিলিকন কেবল ম্যাকবুক প্রো বা ম্যাকবুক এয়ারের মতো কম্পিউটারেই ব্যবহৃত হচ্ছে না, বরং আইপ্যাড এয়ার থেকে শুরু করে আইপ্যাড প্রো পর্যন্ত সব ডিভাইসে শক্তি জোগাচ্ছে।
আইফোন এয়ার
গত শরতে বাজারে আসা ‘আইফোন এয়ার’ অ্যাপলের বার্ষিক আইফোন সিরিজের সাধারণ ছোটখাটো বিভিন্ন আপডেটের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা কিছু ছিল। জন টার্নাসের নেতৃত্বে তৈরি এ ফোনটি বিস্ময়কর রকমের পাতলা এবং এতে নতুন ধরনের উপাদান ও উৎপাদন কৌশল ব্যবহার করেছে অ্যাপল।
আইফোন এয়ার থেকে ইঙ্গিত মেলে, টার্নাসের অধীনে অ্যাপলের হার্ডওয়্যার তৈরির লক্ষ্য এক নতুন দিকে মোড় নিচ্ছে। কারিগরি দিক থেকে আইফোন এয়ার বিস্ময়কর উদ্ভাবন এবং একে অ্যাপলের ফোল্ডএবল বা ভাঁজ করা ফোনের দিকে এক বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়।

‘অ্যাপল সার্ভিসেস’ বা সেবা খাত
‘অ্যাপল সার্ভিসেস’ কেবল একটি একক পণ্য নয়, বরং অ্যাপলের ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধিতে কুকের সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কুকের সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় এ সেবা খাতটি ছিল অনেকটাই অবহেলিত।
এ খাতকে বছরে ১০ হাজার কোটি ডলারের বড় ব্যবসায় পরিণত করেছেন কুক, যার মধ্যে রয়েছে ‘আইক্লাউড’, ‘অ্যাপল পে’, ‘অ্যাপল টিভি প্লাস’, ‘অ্যাপল মিউজিক’ ও ‘অ্যাপ স্টোর’। এর মধ্যে শেষের দুটি অবশ্য স্টিভ জবসের আমল থেকেই রয়েছে।
এসব সেবা অ্যাপলের আর্থিক কাঠামোকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। ফলে কোম্পানিটি এখন নিয়মিত বা পুনরাবৃত্ত আয়ের স্থায়ী এক উৎস পেয়েছে, যা হার্ডওয়্যার বিক্রির হ্রাস-বৃদ্ধির ঝুঁকি থেকে অ্যাপলকে সুরক্ষিত রাখছে।
অনেক বিচারেই এ পরিষেবা অ্যাপলে কুকের রেখে যাওয়া সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ও শক্তিশালী উত্তরাধিকার।
এয়ারট্যাগ ও হোমপড
এয়ারট্যাগ মুদ্রার মতো গোলাকার ট্র্যাকিং ডিভাইস, যা হারিয়ে যাওয়া প্রয়োজনীয় জিনিস যেমন চাবি, মানিব্যাগ, লাগেজ খুঁজে পেতে সাহায্য করে। কুক এয়ারট্যাগকে সাধারণ ট্র্যাকিং ডিভাইসের চেয়েও বিশেষ কিছু হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।
এয়ারট্যাগকে সরাসরি আইফোন ও ‘ফাইন্ড মাই’ নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগ করে তিনি ব্যবহারকারীদের দৈনন্দিন জীবনের ছোট জিনিসগুলোকেও অ্যাপল ইকোসিস্টেমে নিয়ে এসেছেন।
অন্যদিকে, হোমপড ছিল অ্যাপলের স্মার্ট হোম বাজারে প্রবেশের সাহসী এক পদক্ষেপ। কুকের সিদ্ধান্ত অনুসারে, প্রতিযোগীদের সাশ্রয়ী স্পিকারের বদলে হোমপডকে উচ্চমানের এক মিউজিক ডিভাইস হিসেবে ব্র্যান্ডিং করা হয়েছে।
কুকের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ছিল সিরি’কে কেবল আইফোনে সীমিত না রেখে হোমপডের মাধ্যমে ঘরের সব জায়গায় পৌঁছে দেওয়া।
তিনি নিজেও তার দৈনন্দিন জীবনের রুটিনে হোমপড ও হোমকিট ব্যবহারের উদাহরণ দিয়ে ব্যবহারকারীদের ডিভাইসটি ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করেছেন।
যাত্রাপথের কিছু ব্যর্থতা
স্টিভ জবসের মতো কুকের আমলেও কিছু পণ্য আশানুরূপ সাফল্য পায়নি। ‘অ্যাপল ভিশন প্রো’ ছিল কম্পিউটিংয়ের নতুন এক প্ল্যাটফর্ম তৈরির ক্ষেত্রে কুকের বড় বাজি, যা সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে খুব একটা সাড়া ফেলতে পারেনি।
‘মিক্সড-রিয়ালিটি হেডসেট’-এর জন্য কয়েক হাজার ডলার খরচ করতে অধিকাংশ মানুষই রাজি নন। সবকিছু সমসময় পরিকল্পনা অনুসারে সফল হয় না। তবে কুকের সাফল্য এ কারণেই ব্যাপক যে, তার বড় অর্জনের তুলনায় ব্যর্থতার পরিমাণ খুবই সামান্য।
জন টার্নাস তার কর্মজীবনের প্রায় পুরোটা সময় অ্যাপলেই কাটিয়েছেন এবং ওপরের অনেকগুলো সফল পণ্যের নেপথ্যে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রেখেছেন। তিনি এখন শক্তিশালী অবস্থানে থাকা অ্যাপলের দায়িত্ব নিচ্ছেন।
১ সেপ্টেম্বর থেকে টার্নাস এ সাফল্যের ধারা কতটুকু ধরে রাখতে পারবেন সেটিই এখন দেখার বিষয়।