সংস্কার নিয়ে রোডম্যাপ তৈরির জন্য সোমবার থেকে অংশীজনদের সঙ্গে বিএসইসির আলোচনার তিন দিনে সূচক কমল ২০৪ পয়েন্ট, বাজার মূলধন কমল ১৩ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা।
Published : 02 Oct 2024, 07:30 PM
টানা দরপতনের মধ্যে থাকা পুঁজিবাজারে সপ্তাহের চতুর্থ কর্মদিবসে মূল্য সূচক একশ পয়েন্টেরও বেশি কমার কারণে বাজার মূলধন কমেছে আট হাজার কোটি টাকারও বেশি।
বুধবার কেবল ৩৯টি কোম্পানির শেয়ারে দর বৃদ্ধির বিপরীতে ৩৪৭টির দরপতনে বিনিয়োগকারীরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে। ফেইসবুককেন্দ্রিক বিনিয়োগকারীদের বিভিন্ন গ্রুপে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন-বিএসইসি ঘেরাওয়ের জন্য আহ্বান করা হচ্ছে।
পুঁজিবাজারে যেসব কোম্পানির শেয়ারের দরপতন ঘটে, সেগুলোর হিসাব থাকে লাল রঙে, যেগুলোর দাম বাড়ে, সেগুলো থাকে সবুজ রঙে। ফলে বুধবার পুরো হিসাবে লাল রঙের সমাহার দেখা গেছে।
পুঁজিবাজারে সংস্কার নিয়ে রোডম্যাপ তৈরির জন্য সোমবার থেকে অংশীজনদের সঙ্গে বিএসইসির আলোচনার তিন দিনে সূচক কমল ২০৪ পয়েন্ট, বাজার মূলধন কমল ১৩ হাজার ৫৫১ কোটি টাকা।
গত ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৮টি কোম্পানিকে জেড শ্রেণিতে নিয়ে যাওয়ার পর ৬ কর্মদিবসেই বাজার মূলধন কমল ১৭ হাজার কোটি টাকার বেশি, সূচক কমল ২৮২ পয়েন্ট।
বুধবার ১৩২ পয়েন্ট দরপতনে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ-ডিএসইর সার্বিক সূচক ডিএসইএক্স নেমে এসেছে ৫ হাজার ৪৫৩ পয়েন্টে, যা গত ৭ অগাস্টের পর সর্বনিম্ন।
বড় দরপতনের এই দিনে বাজারে লেনদেন হয়েছে ৪৪০ কোটি ৮৩ লাখ ১২ হাজার টাকা। গত ৮ অগাস্ট অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর এটি দ্বিতীয় সর্বনিম্ন লেনদেন। আগেরদিন হাতবদল হয় ৩৮৯ কোটি ৪৭ লাখ ৮৩ হাজার টাকার শেয়ার।
গত ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগের দিন সূচক এর চেয়ে কিছুটা কম থাকলেও বিনিয়োগকারীর লোকসান ছিল এখনকার তুলনায় কম।
৪ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ কর্মদিবসে ডিএসইএক্সের অবস্থান ছিল ৫ হাজার ২২৯ পয়েন্ট। সরকার পতনের পর চার কর্মদিবসে সূচক বাড়ে প্রায় আটশ পয়েন্ট।
সে সময় এক দিনে লেনদেন দুই হাজার কোটি টাকা ছুঁয়ে ফেলে। সে সময় যারা বিনিয়োগ করেছেন, তাদের সেই সিদ্ধান্ত এখন গলার কাঁটা হয়ে গেছে।
প্রাথমিক সেই উচ্ছ্বাস থেমে যাওয়ার পর ১২ অগাস্ট থেকে সূচক কমেছে ৫৬১ পয়েন্ট, বাজার মূলধন কমেছে ৩৭ হাজার ৭২০ কোটি টাকা।
তবে দুই মাসেরও কম সময়ে ইসলামী ব্যাংক, গ্রামীণ ফোন ও বিএটি বাংলাদেশের মত অল্প কিছু কোম্পানির শেয়ারদরেই কেবল উত্থান হয়েছে, যে কারণে সূচক বেড়েছে। এই তিনটি কোম্পানির বাজার মূলধন বেড়েছে ২০ হাজার কোটি টাকারও বেশি। কেবল তিনটি কোম্পানিতে এই উত্থান না হলে বাজার মূলধন আরও কমত।
বিনিয়োগকারীরা এমনিতেই আস্থার অভাবে ভুগছেন, এমন সময়ে এক দিনে ২৮টি কোম্পানিকে জেড শ্রেণিতে নিয়ে যাওয়া হয় গত ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে। যেটি দরপতনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে বলে মনে করেন বিনিয়োগকারীরা।
প্রধান সূচক ডিএসইএক্সের পাশাপাশি শরিয়াভিত্তিক কোম্পানিগুলোকে নিয়ে গঠিত শরিয়া সূচক ৩২ পয়েন্ট এবং ‘ব্লু’ চিপ খ্যাত ডিএস৩০ সূচক কমেছে ৫১ পয়েন্ট।
এভাবে দরপতন কেন?
পুঁজিবাজারে এভাবে দরপতনের বিষয়ে জানতে চাইলে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ, ডিবিএ সভাপতি সাইফুল ইসলাম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, ‘‘বিনিয়োগকারীরা টাকা হারাতে হারাতে তাদের আর জায়গা নেই। শুধু নীতি করলেই চলবে না, তাদেরও তো একটি আস্থার বার্তা দিতে হবে। এজন্য নীতি নির্ধারক পর্যায় থেকে একটি আশার বাণী আসা দরকার।’’
মার্জিন কল, অর্থাৎ যারা ঋণ নিয়ে শেয়ার কিনেছিলেন, শেয়ার বিক্রি করে সেই টাকা আদায় করা হচ্ছে কিনা, তা দেখা দরকার বলেও মনে করেন তিনি।
পুঁজিবাজারে বেক্সিমকো গ্রুপের শেয়ার কেনায় কারসাজিতে জড়িত অভিযোগে ৯ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে ৪২৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা জরিমানা করার প্রভাবও পুঁজিবাজারে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিনের আলোচিত সরকারি কর্মকর্তা আবুল খায়ের হিরু ও তার পরিবারের ব্যাংক হিসাবের তথ্য জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থা বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট, বিএফআইইউ।
অর্ধশত কোটি টাকার পোর্টফোলিও নিয়ন্ত্রণকারী আবুল খায়ের হিরু একাধিকবার জরিমানার শিকার হয়েছেন। সবশেষ ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানকে কারসাজির দায়ে ৫০ লাখ টাকা ও হিরুকে ফের ২৫ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বিএসইসি।
লেনদেন চলাকালে তাদের শেয়ার হস্তান্তরের নিষেধাজ্ঞা ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য তলবের বিষয়টি বাজারে ছড়িয়ে পড়লে বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হন বলেও মনে করছেন বিনিয়োগকারী আজমল হোসেন।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, ‘‘বাজারে তো সিন্ডিকেট বেশি। এহন ধরা খাইতাছে এক এক কইরা। তাগোও সাপোর্টার আছে, তারা লেনদেনে নাই এহন। সূচক তো পড়বই। মনে হয় সময় লাগব বাজার ঠিক হইতে।’’
আগ্রহের শীর্ষে কারা
সিংহভাগ শেয়ারের দর হারালেও চার ভাগের এক ভাগ লেনদেন হয়েছে ব্যাংক খাতে। এই খাতে ১০৮ কোটি ১৫ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা করেছেন বিনিয়োগকারীরা।
এই খাতের ৩৬টি কোম্পানির মধ্যে চারটির দর বৃদ্ধির বিপরীতে কমেছে ২৬টির দর, ৬টি আগের দিনের দরে হাতবদল হয়েছে।
দ্বিতীয় অবস্থানে ১৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ অবদান রাখে ওষুধ ও রসায়ন খাতের প্রতিষ্ঠান, হাতবদল হয়েছে ৬২ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।
এই খাতের একটি কোম্পানির দর বৃদ্ধির বিপরীতে কমেছে ৩১টি কোম্পানির দর, দুটি আগের দিনের দরে হাতবদল হয়েছে।
প্রায় প্রতিটি খাতেই একই হারে দরপতন ঘটেছে।
একক কোম্পানি হিসেবে শেয়ার দর বৃদ্ধিতে শীর্ষে উঠে দেশ গার্মেন্টস। ৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ বেড়ে লেনদেন শেষ করেছে কোম্পানিটি।
দর বৃদ্ধির শীর্ষে ছিল ফেডারেল ইন্স্যুরেন্স, মার্কেন্টাইল ইন্স্যুরেন্স, বিআইএফসি, আফতাব অটো, আর এন স্পিনিং মিলস, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ, এসআইবিএল, লিবরা ইনফিউশন ও মেঘনা সিমেন্ট।
এগুলোর দর ৪.৪০ শতাংশ থেকে বেড়েছে ৭.৮৫ শতাংশ পর্যন্ত।
অন্যদিকে শেয়ার দর হারানোর শীর্ষে থাকা ১০টি কোম্পানিই সার্কিট ব্রেকার ছুঁয়ে কমেছে। এগুলো হল: ফুওয়াং ফুডস, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড, গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স, ওরিয়ন ফার্মা, অ্যাসোসিয়েট অক্সিজেন লিমিটেড, এশিয়া প্যাসিফিক ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, ডমিনেজ স্টিল, সিএসপি ফাইন্যান্স ও শাইনপুকুর সিরামিকস।
লেনদেনের শীর্ষে ছিল গ্রামীণফোন, লিনডে বিডি, ব্র্যাক ব্যাংক, সোনালী আঁশ ও ইসলামী ব্যাংক।