Published : 28 Jun 2026, 01:22 PM
আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া ম্যাচের শেষ সময়ের তুমুল উত্তেজনার চিত্র তো মাঠে ও টিভি পর্দায় অনেকেই দেখেছেন। মেক্সিকোর টিহুয়ানায় ইরান দলের চিত্রটা তখন কেমন ছিল? তারা কি সবাই একসঙ্গে বসে খেলা দেখেছেন? ম্যাচজুড়ে নানা টানাপোড়েন, শেষের রোমাঞ্চে কেমন ছিল তাদের প্রতিক্রিয়া? যোগ করা সময়ে আলজেরিয়ার গোলে তারা কি উল্লাসে ফেটে পড়েছেন? অস্ট্রিয়ার গোলে আবার মিইয়ে গেছেন!
প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো জানা যাবে না। তবে অনুমান করে নেওয়াই যায়। ম্যাচের নানা ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গেই হয়তো আবেগ-উত্তেজনা-শঙ্কা-সম্ভাবনার দোলায় দুলেছে ইরান দল আর মুষড়ে পড়েছে শেষে এসে। আলজেরিয়ার-অস্ট্রিয়ার ম্যাচ ড্র হওয়ায় নিশ্চিত হয়ে গেছে গ্রুপ পর্ব থেকে তাদের বিদায়।
অথচ ইতিহাস গড়ার খুব কাছাকাছি ছিল তারা। গ্রুপের শেষ ম্যাচে মিশরকে হারাতে পারলেই প্রথমবার বিশ্বকাপের নকআউটে পৌঁছে যেত তারা এবং সেই সম্ভাবনাও জাগিয়েছিল প্রবলভাবেই। কিন্তু ধরা দিতেও দিতেও তা হারিয়ে গেছে।
মিশরের বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র ম্যাচে একটি পেনাল্টি কাজে লাগাতে পারেনি তারা। গোল করতে ব্যর্থ হন দলের সবচেয়ে বড় তারকা, দেশের ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলস্কোরার মেহদি তারেমি।
ওই ম্যাচের ৮৯তম মিনিটে তারেমির হেড ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ৯০ মিনিট শেষে যোগ করা সময়ে গোল করে বাঁধনহারা উল্লাসে মেতে উঠলেন শোজা খালিলজাদেহ। কিন্তু সেই উচ্ছ্বস থেমে গেল দ্রুতই। ভিএআর জানাল, অফসাইড ছিল সেটি!
তাদের আক্ষেপ বেড়ে যাওয়ার কথা অটোমেডেট রিপ্লে দেখার পর। খালিলজাদেহর হাত ও পায়ের এক পাশের সামান্য একটু অংশ ছিল অফসাইড। স্রেফ কয়েক মিলিমিটারের জন্য অফসাইড!
শেষ নয় সেখানেই। গোল বাতিলের পরপরই সাঈদ ইজাতোলাইয়ের হেড লাগল ক্রসবারে।
এই শেষ কয়েক মিনিটে সাফল্য আর ব্যর্থতার ব্যবধান আক্ষরিক অর্থেই ছিল সূক্ষ্ম।
এরপর তারা তাকিয়ে ছিল প্রাথমিক পর্বের শেষ দিনের দুটি ম্যাচে। শুরুতে ডিআর কঙ্গো ও উজবেকিস্তানের ম্যাচ ঘিরে ছিল তাদের আশা। মেক্সিকোর টিহুয়ানায় বেস ক্যাম্পে এ দিন অনুশীলন করার কথা ছিল ইরান দলের। কিন্তু অনুশীলনের সময় পিছিয়ে দিয়ে আটলান্টার ম্যাচে চোখ রাখে তারা।
ম্যাচের দশম মিনিটে উজবেকিস্তানের গোলে ইরানের আশাও জিইয়ে ওঠে। তবে ৬৭ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থাকা ডিআর কঙ্গো পরে ৩-১ গোলে জিতে নকআউটে পৌঁছে যায়। এই ম্যাচের সমীকরণ থেকে ছিটকে যায় ইরানও।
এরপর তাদের শেষ ভরসা আলজেরিয়া-অস্ট্রিয়া লড়াই। এই ম্যাচে তাতের প্রার্থনা ছিল ড্র ছাড়া অন্য যেকোনো ফল। অনুশীলন বাতিল করে দেয় তারা। ক্যানসাস সিটিতে অস্ট্রিয়ার গোল টিহুয়ানায় ইরানকে উচ্ছ্বসিত করে তোলে নিশ্চিতভাবেই। পরে ম্যাচে সমতা ফেরায় আবার শুরু হয় ইরানিদের শঙ্কার সঙ্গে বসবাস।
দ্বিতীয়ার্ধের প্রথম ১৫ মিনিটের দুই গোলেও নিশ্চয়ই ছিল তাদের অমন বিপরীতিমুখি অনুভূতি।
ম্যাচের শেষ সময় যখন এগিয়ে আসছিল, ইরানের ব্যাগ গোছানোর শঙ্কাও তীব্রতর হচ্ছিল। সেই আঁধারেই আলোর ঝলকানি হয়ে এলো ৯৩তম মিনিটে আলজেরিয়ার রিয়াহ মাহরেজের গোল। ইরানের ক্যাম্প নিশ্চয়ই তখন ঝলমল করছিল।
কিন্তু ম্যাচ শেষ হয়েও যেন হলো না। বরং তাদের আশাই গুঁড়িয়ে গেল একটু পর। ৯৫তম মিনিটে বদলি নামা সাশা কালাইজিচের হেড যেন বিদীর্ণ করে দিল ইরানিয়ানদের হৃদয়। ৩-৩ গোলের ড্রয়ে আলজেরিয়া ও অস্ট্রিয়া পৌঁছে গেল পরের ধাপে। ইরানের সঙ্গী দীর্ঘশ্বাস।
গ্রুপ পর্বের কোনো ম্যাচ না হেরেই বাদ পড়া একমাত্র দল তারা।
এই বিশ্বকাপে তাদেরকে তুমুল লড়তে হয়েছে মাঠের বাইরেও। শুরুতে ছিল ভিসা সমস্যা। এরপর ছিল যুক্তরাষ্ট্রে থাকা নিয়ে সমস্যা। তাদের তিন ম্যাচই যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও সেখানে গিয়ে তার থাকতে পারেনি। মেক্সিকোর টিহুয়ানায় ঘাঁটি গড়ে সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে খেলতে আসতে হয়েছে তাদের।
তাদেরকে ম্যাচের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে প্রবেশ এবং একই দিনে চলে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিল মার্কিন কর্তৃপক্ষ। যদিও সিয়াটলে তাদের শেষ ম্যাচের জন্য এই বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করা হয়েছিল, যেখানে তাদের খেলার দুই দিন আগে পৌঁছানোর অনুমতি দেওয়া হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প মার্চে বলেন যে, বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের জন্য ইরানকে স্বাগত জানানো হচ্ছে, কিন্তু তিনি মনে করেন না যে “তাদের নিজেদের জীবন ও নিরাপত্তার জন্য” যুক্তরাষ্ট্রে থাকাটা সমীচীন।
মিশরের সঙ্গে ড্র করার পর অধিনায়ক মেহদি তারেমি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে। তাদের লজিস্টিকসের কর্মকার্তারা দলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে পারেননি ভিসা না পাওয়ায়। এটিকে ‘ডিজাস্টার’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “কে আমাদের সাহায্য করতে চায়? তারা যদি চায় আমরা টুর্নামেন্ট থেকে বেরিয়ে যাই – ঠিক আছে, তাহলে বেরিয়ে যাই। কিন্তু এটা ন্যায্য নয়।”
প্রতিনিধিদলের প্রধান সদস্যরা যুক্তরাষ্ট্রে দলের সঙ্গে যোগ দিতে পারেননি। ইরানের কোচ আমির গালেহনুই বলেছেন যে, তার দল “নিপীড়নের” শিকার হচ্ছে।
বিশ্বকাপের মতো আসরে এসব অকল্পনীয়ই ছিল এতদিন। ইরানের এবার এই তিক্ত অভিজ্ঞতা হলো। মাঠের ফুটবলেও তাদের শেষটা হলো হতাশাময়।