Published : 10 Jun 2026, 05:09 PM
কয়েক মাস আগেই ফিফার শীর্ষ কর্মকর্তারা বুঝতে পেরেছিলেন যে, ২০২৬ বিশ্বকাপ নিয়ে পরিকল্পনা ‘আশা অনুযায়ী’ এগোচ্ছে না। সেই উপলব্ধি ছিল গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। কারণ, ২০১৮ সালে যখন যুক্তরাষ্ট, কানাডা ও মেক্সিকোয় যৌথভাবে বিশ্বকাপ আয়োজনের ব্যাপারটি নিশ্চিত হয়েছিল, তখন ফুটবল মহলে ব্যাপকভাবে এই ধারণাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে, এটি হতে যাচ্ছে ‘চেনা’ ধারাতেই প্রত্যাবর্তন!
বিশ্বকাপ শুরুর আগের দিন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর একটি প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এবারের আসরের ত্রুটির নানা দিক।
তিন স্বাগতিক দেশের মধ্যে দুটি আগে বিশ্বকাপ আয়োজন করেছে। ১৯৭০ ও ১৯৮৬ বিশ্বকাপের স্বাগতিক ছিল মেক্সিকো, ১৯৯৪ বিশ্বকাপ হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। সর্বকালের সবচেয়ে সফল তিনটি বিশ্বকাপের মধ্যে ধরা হয় এই তিন আসরকে। এবারও বিডিংয়ের সময় প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল যে এটি হবে ‘কম ঝুঁকিপূর্ণ এবং পরিচালনগতভাবে নিশ্চিত।’ রেকর্ড ১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার রাজস্ব আয়ের পূর্বাভাসও অবশ্যই এখানে বড় সহায়ক ছিল।
জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সভাপতি হওয়ার প্রথম পূর্ণাঙ্গ টুর্নামেন্টটি ছিল রাশিয়া ও কাতার বিশ্বকাপের সমস্যাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ, যেগুলো তিনি একরকম উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিলেন এবং যে দুটি বিশ্বকাপে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি রাজনীতির থাবা ছিল বলে মনে করা হয়।
অন্যভাবে বললে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটিতে আবার নজর দেওয়া যেত এই বিশ্বকাপে, সেটি হলো ফুটবল খেলাটি এবং এখান থেকে যত অর্থ অর্জিত হতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা পুরো ভিন্ন। বলা যেতে পারে, এই টুর্নামেন্ট নানাভাবে আরও বেশি রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে। গতানুগতিক বা প্রত্যাশা অনুযায়ী কিছু না ঘটার পরিবর্তে, ২০২৬ বিশ্বকাপ এমন সব অভূতপূর্ব সমস্যা তৈরি করেছে, যা এই প্রতিযোগিতার ৯২ বছরের ইতিহাসে আর কখনও দেখা যায়নি।
এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো, বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ হয়েও অংশগ্রহণকারী অন্য একটি দেশের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা, যেটি গত ফেব্রুয়ারির শেষে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটেনি।
এটি যদি অন্য কোনো দেশ হতো, তাহলে টুর্নামেন্ট সেখান থেকে সরিয়ে নেওয়া বা বর্জন করা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যেত।
তবে, এই যুদ্ধের আগেও, টুর্নামেন্টের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা এমন অনেক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছিলেন, যা সামলানোর উপায় তাদের জানা ছিল না।
কাতারের ‘দাসশ্রম’ ব্যবহারের মতো নৈতিক প্রহসন যদি আসরে নাও থাকে, এবং রাশিয়ার মতো একটি ‘উদার গণতন্ত্রে’ এটি অনুষ্ঠিত হয়, তবুও মার্কিন রাষ্ট্রের অনন্য ধরন এবং সহ-আয়োজকদের সঙ্গে এর সম্পর্ক আরও নানা ধরনের সমস্যা তৈরি করেছে। এমনকি বিশ্বকাপ ঘিরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ‘জরুরি মানবাধিকার অবস্থার সম্মুখীন’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে অ্যামনেস্টির একটি প্রতিবেদনে, বিশেষ করে সেখানে তুলে ধরা হয়েছে মার্কিন অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা কর্তৃক ভক্ত এবং এমনকি ফুটবলারদের জন্য সৃষ্ট ‘শীতল হুমকির’ বিষয়টি।
ফিফার এত বেশি অর্থের ‘লোভ’ মূলত একটি উপাদান মাত্র, যা ফুটবলের প্রকৃত বৈশ্বিক সমর্থনের আওতার বাইরে চলে গেছে এবং এমনকি টুর্নামেন্টটিকে এমন ‘অশালীন’ আকারে প্রসারিত করছে যে, এটি হয়তো প্রতিযোগিতাটির মূল উদ্দেশ্যকেই ম্লান করে দিতে পারে।
ইন্ডিপেন্ডেন্ট-এর সেই প্রতিবেদনে বিশ্বকাপের কিছু সমস্যার কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ছোট এই সমস্যাগুলিই বলে দেয় ২০২৬ বিশ্বকাপ সম্পর্কে অনেক কিছু…
ইরান যুদ্ধ এবং বিশ্বকাপে জায়গা করে নেওয়া দেশে স্বাগতিক দেশের আক্রমণ
মার্কিন হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার খবর যখন আসতে শুরু করল, ফিফা নেতৃত্ব তখন ওয়েলসের হেনসোল ক্যাসলে আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ডের ১৪০তম বার্ষিক সাধারণ সভায় একজন অপেরা শিল্পীর গান শুনছিলেন এবং মরিয়া হয়ে তাদের ফোন স্ক্রল করছিলেন খবর জানতে।
তারা বুঝে গিয়েছিলেন যে, বিশ্বকাপকে ঘিরে এটিই সবচেয়ে গুরুতর ব্যাপার এবং ফিফার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হতে চলেছে। মিনাবের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১১০ জন শিশুসহ ১৬৮ জন নিহত হওয়ার খবরটি যখন সামনে আসে, তখন এই ধরনের উদ্বেগ, এমনকি ইরানের অংশগ্রহণও, সম্পূর্ণ তুচ্ছ বলে মনে হচ্ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘাঁটি এবং অনেক কর্মীর ভিসা—উভয়ই প্রত্যাখ্যান হওয়ার পর, সোমবার মেক্সিকোতে অবতরণের সময় ইরানি দলটি এই নৃশংসতার কথা তুলে ধরে ল্যাপেল পিন পরেছিল।
আবারও, এই যুদ্ধ নিয়ে মতামত যা-ই হোক না কেন, এটি টুর্নামেন্টের জন্য একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। এর আগে এমন কিছু কখনও ঘটেনি এবং যদি এটি অন্য কোনো দেশ হতো, তাহলে নিঃসন্দেহে টুর্নামেন্টটি বাতিল করার আলোচনা উঠত।
অথচ এবার আলোচনার বেশিরভাগ অংশই ছিল এই বিষয়ে যে, ইরানি জাতীয় দল, নিজ রাষ্ট্রের সঙ্গেই যাদের সম্পর্ক বেশ জটিল, তারা এমন একটি প্রতিযোগিতায় আদৌ খেলতে পারবে কি না, যেটিতে তারা ন্যায্যভাবেই যোগ্যতা অর্জন করেছে। এই সংঘাত এখন ১০২তম দিনে পড়েছে এবং এটি পুরো বিশ্বকাপের ওপর প্রভাব ফেলবে বলে মনে হচ্ছে, যার মধ্যে ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি সম্ভাব্য নক-আউট ম্যাচও রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি এবং রাশিয়ার সমান্তরাল
ভূ-রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ফিফা শান্তি পুরস্কার স্রেফ একটি বিতর্কের বিষয় থেকে অত্যন্ত কুরুচিপূর্ণ রসিকতার নিছক উপজীব্যে পরিণত হয়েছে। ইনফান্তিনো ‘তোষামুদেভাবে’ ডনাল্ড ট্রাম্পের হাতে পুরস্কারটি তুলে দেওয়ার পর থেকে, ইরানসহ চারটি ভিন্ন দেশে সামরিক অভিযান চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ২০১৮ সালে এই বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে সেই সংখ্যাটি হলো ১২।
টুর্নামেন্টের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে বিবেচনা করলে এই সংখ্যা এর মধ্যেই অন্য যেকোনো আয়োজক দেশের চেয়ে অনেক বেশি। কিন্তু এর চেয়েও প্রাসঙ্গিক হলো ফেয়ারস্কয়ারের মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ভাষায় আগ্রাসনের কাজ, যা ‘উস্কানিহীন, অনাহূত এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত নয়।’
এর আওতায় ভেনেজুয়েলা ও ইরান পড়বে, এবং যুক্ত হবে আরও কিছু বিষয়, যেমন- একজন বিদেশী রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ; ক্যারিবিয়ানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিচারকদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনেস্কো থেকে নিজেদের প্রত্যাহার।
যদিও ঐতিহাসিকভাবে আয়োজক দেশগুলোর পররাষ্ট্রনীতিকে বিশ্বকাপ আয়োজনের সঙ্গে সাধারণত পৃথক হিসেবেই দেখা হতো, ইউক্রেন আক্রমণের জন্য রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ফলে এখন সেই পরিধি বদলে গেছে। একাধিক মানবাধিকার গোষ্ঠী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিলিস্তিনে সংঘটিত একটি ঘটনায় ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থনের কথা উল্লেখ করেছে, যেটিকে জাতিসংঘের একটি প্যানেল ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিয়েছে। এদিকে ফেয়ারস্কয়ার বর্ণনা করেছে যে, কীভাবে ট্রাম্পের ‘আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনকে ভেঙে ফেলার বিষয়টি ফিফার অনুমোদন পেয়েছে।’

ভিসা সংক্রান্ত সমস্যা এবং বিশ্বকাপের নীতি লঙ্ঘন
টুর্নামেন্ট শুরুর প্রাক্কালে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় বিতর্ক এবং এটি অন্যান্য অনেক বিষয়কেও স্পষ্ট করে তোলে। বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র দুই দিন আগে, বিখ্যাত সোমালি রেফারি ওমার আর্তান এবং অসংখ্য ইরানি কর্মীকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। শিকাগোতে পৌঁছানোর পর ইরাকি স্ট্রাইকার আয়মেন হুসেনকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। অন্যদিকে সেনেগাল এবং উজবেকিস্তান দলকে দেশে কঠোর নিরাপত্তা তল্লাশির সম্মুখীন হতে হয়েছে।
আবারও, এটি লক্ষণীয় যে, কোনো আধুনিক বিশ্বকাপে আগে কখনও এগুলো সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়নি। টুর্নামেন্ট আয়োজনের একটি মৌলিক চুক্তিগত শর্ত হলো অংশগ্রহণকারীদের অবাধ যাতায়ত। ২০১৭ সালে ইনফান্তিনো নিজেই যেমন বলেছিলেন, “ফিফা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে এটা পরিষ্কার যে, বিশ্বকাপের খেলার যোগ্যতা অর্জনকারী যেকোনো দল, সেই দলের সমর্থক ও কর্মকর্তাসহ, তাদের দেশে প্রবেশের সুযোগ প্রয়োজন, নইলে কোনো বিশ্বকাপই হয় না।”
২০২৬ সালের জন্য সম্ভাব্য সমস্যাগুলোর বিষয়ে বারবার সতর্ক করা সত্ত্বেও, ইনফান্তিনো গত বছরই বলেছিলেন, “এ নিয়ে অনেক ভুল ধারণা রয়েছে। আগামী বছর ফিফা বিশ্বকাপের জন্য কানাডা, মেক্সিকো এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সবাইকে স্বাগত জানানো হবে।” কিন্তু বাস্তবে তেমনটা ঘটেনি।
যদিও এখন ফিফা জোর দিয়ে বলছে যে, তারা ‘আয়োজক দেশের অভিবাসন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত নয়’, কিন্তু সেখানেও প্রশ্ন আছে। ২০২৩ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপের জন্য ইসরায়েলি দলকে ইন্দোনেশিয়ার প্রবেশে অস্বীকৃতি জানানোর সময়ে ফিফার অবস্থান ছিল ভিন্ন। তাদের কাছ থেকে আয়োজক হওয়ার অধিকার দ্রুতই কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং ফিফা অস্পষ্টভাবে ‘বর্তমান পরিস্থিতি’-র কথা বলেছিল।
এই বিতর্কটি ফিফার জন্য আরও খারাপ দেখাচ্ছে, কারণ কিছু নির্দিষ্ট দেশ – বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর প্রতি – ট্রাম্প প্রশাসনের মনোভাব দীর্ঘদিন ধরেই আলোচিত ছিল এবং তাদের সম্পর্কের একটি যুক্তি ছিল এই মনোভাবকে সহজতর করা। কিছু নির্দিষ্ট দলের প্রতি অসম আচরণের কারণে এমনিতেই টুর্নামেন্টের গতিপথই প্রভাবিত হতে পারে। রাশিয়া এবং কাতারকে যে অনেক বেশি অতিথিপরায়ণ হিসেবে দেখা হয়েছিল, তাতেই অনেক কিছু বোঝা যায়।
ইনফান্তিনো-ট্রাম্প সম্পর্ক
ভিসার বিষয়টি এই টুর্নামেন্টের আরও একটি নজিরবিহীন দিক আরও স্পষ্টভাবে ফুটিতে তুলবে। তা হলো ফিফা সভাপতি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা। এতটা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আগে কখনও দেখা যায়নি, এমনকি জোয়াও হাভেলাঞ্জ ও জেনারেল হোর্হে রাফায়েল ভিদেলা কিংবা ইনফান্তিনোর সঙ্গে ভ্লাদিমির পুতিনের সম্পর্কও নয়।
ফিফার অভ্যন্তরীণ ব্যক্তিরা দীর্ঘদিন ধরে যুক্তি দিয়ে আসছিলেন যে, ট্রাম্পের খামখেয়ালি স্বভাব টুর্নামেন্টে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে বলে তাকে ক্রমাগত তুষ্ট রাখা প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেসব তো হচ্ছেই! এই ঘনিষ্ঠতার একটি কারণ হিসেবে ভিসা সহজ করার মতো বিষয়গুলোকেই ধরা হয়েছিল।
বিশ্বকাপ-সম্পর্কিত অনেক বিষয়ে সাহায্যের সম্পূর্ণ অভাব বরং এই প্রশ্ন তোলে যে, ইনফান্তিনো কেন এতে জড়িয়েছিলেন, যেখানে এই সম্পর্কটি ফিফার বিধিমালার পরিপন্থী ছিল। বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির রাজনৈতিকভাবে নিরপেক্ষ থাকার কথা, বিশেষ করে যাতে তারা জটিল ভূ-রাজনীতি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারে। তা সত্ত্বেও, ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানসহ বহু রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিত ছিলেন ইনফান্তিনো।
এটি আরও বেশি লক্ষণীয় যে, পূর্ববর্তী ডেমোক্র্যাট প্রশাসনের আমলে এমনটা ঘটেনি। ইনফান্তিনোর আমলের একটি বৈশিষ্ট্য হলো কর্তৃত্ববাদী মনোভাবাপন্ন প্রধানমন্ত্রী এবং এমনকি স্বৈরাচারী নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। কিন্তু ট্রাম্পের সঙ্গে তার সম্পর্কের গভীরতা অন্য সবকিছুর চেয়েও ভিন্ন স্তরের। বিশ্বকাপকে এখানে কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করে এটি।
‘MAGA বিশ্বকাপ’ এবং ‘স্পোর্টসওয়াশিং’
বিশ্বকাপের বেশিরভাগ অভ্যন্তরীণ সমস্যা ডেমোক্র্যাট-শাসিত শহরগুলো থেকে আসায় এবং ইউএস সকারের মতো ডেমোক্র্যাট-সমর্থক সংস্থাগুলোকে মূলত বাদ দেওয়ায়, এই বিশ্বকাপ এর মধ্যেই একটি তীব্র ‘লাল’ আভা রয়েছে।
২০২৫ সালের মার্চ মাসেই দা ইন্ডিপেন্ডেন্ট খবর প্রকাশ করেছিল যে, ‘MAGA (Make America Great Again) বিশ্বকাপ’ আয়োজনে ফুটবলের একাধিক ব্যক্তিত্ব ফিফার সহায়তা করার বিষয়ে কথা বলছিলেন। একজন ঊর্ধ্বতন সূত্রের মতে, “ট্রাম্প তার রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচারের জন্য এটিকে ব্যবহার করতে যাচ্ছেন।” অন্য কথায়, এটি ছিল ‘স্পোর্টসওয়াশিং।’
অ্যামনেস্টির মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো ততদিনে উদ্বিগ্ন ছিল যে, বিশ্বকাপকে বিদ্বেষপূর্ণ বক্তব্য, প্রতিবাদ দমন এবং ইউনিয়নগুলোর চুক্তি ক্ষুণ্ণ করার একটি মঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করা হবে, যা শেষ পর্যন্ত বিশ্ব রাজনীতিতে চলমান স্বৈরাচারী প্রবণতাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যাবে।
আইসিই-এর ‘শীতল হুমকি’
এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে গুরুতর সমস্যাগুলোর মধ্যে একটি হলো, যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা বা কোনো খেলা দেখতে আসা কোনো ব্যক্তির হঠাৎ করে আইসিই (ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস ইনফোর্সমেন্ট) কর্মকর্তাদের হাতে আটক হওয়ার শঙ্কা। বিশ্বকাপ যেখানে বিশ্বব্যাপী উৎসবের প্রতীক হওয়ার কথা, সেই বাস্তবতা এখানে উধাও। অথচ ৪৮টি দল নিয়ে এটিই এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিশ্বকাপ!
‘মানবতার জয় আবশ্যক: ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে অধিকার রক্ষা ও দমনপীড়ন মোকাবেলা’ শীর্ষক অ্যামনেস্টির একটি প্রতিবেদনে ইতোমধ্যেই একটি সম্ভাব্য “মানবাধিকার জরুরি অবস্থার’ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যার বৈশিষ্ট্য হলো “বৈষম্যমূলক অভিবাসন নীতি, গণ-আটক এবং আইসিই, ইউএস কাস্টমস অ্যান্ড বর্ডার প্রোটেকশন (CBP) ও অন্যান্য সংস্থার মুখোশধারী, সশস্ত্র এজেন্টদের হাতে নির্বিচার গ্রেপ্তারের ‘শীতল হুমকি।’। প্রতিবেদনটিতে একইভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ডালাস, হিউস্টন এবং মায়ামি, সকলেই ‘স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর আইসিই-এর সঙ্গে সহযোগিতা করার জন্য চুক্তি’ স্বাক্ষর করেছে।
অ্যামনেস্টি আরও যোগ করেছে যে, কিছু ভক্ত ‘অনুপ্রবেশমূলক নজরদারির’ সম্মুখীন হচ্ছেন, যেখানে দর্শনার্থীদের তাদের সামাজিক মাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলো ‘আমেরিকাবিরোধী’ মনোভাব যাচাই ও স্ক্রিনিংয়ের জন্য ‘অ্যাভেইলঅ্যাবল’ করতে বাধ্য করার প্রস্তাব রয়েছে।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার বিভাগের প্রধান স্টিভ ককবার্ন বলেছেন, “বিস্ময়কর সংখ্যক গ্রেপ্তার ও নির্বাসন সত্ত্বেও, ফিফা বা মার্কিন কর্তৃপক্ষ কেউই এই নিশ্চয়তা দেয়নি যে, ভক্ত এবং স্থানীয় সম্প্রদায় জাতিগত ও বর্ণগত প্রোফাইলিং, নির্বিচার অভিযান, বা বেআইনি আটক ও নির্বাসন থেকে নিরাপদ থাকবে।”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মার্কিন সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে দেশটি থেকে পাঁচ লাখেরও বেশি মানুষকে নির্বাসিত করেছে – “যা মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনাল দেখতে আসা সম্ভাব্য দর্শকের সংখ্যার চেয়ে ছয় গুণেরও বেশি।”
‘হাত গুটিয়ে বসে থাকার’ জন্য ফিফার তীব্র সমালোচনা করেছে ফেয়ারস্কয়ার। টুর্নামেন্টকে ঘিরে আইসিই তাদের নীতি সম্পর্কে স্পষ্ট কিছু জানায়নি, অন্যদিকে উদ্বোধনী ম্যাচের প্রাক্কালে নির্বাসন আরও বাড়ানোর জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থায়নের বিষয়ে কংগ্রেসে বিতর্ক চলছে।
আগ্নেয়াস্ত্র সহিংসতা
গত শনিবার ক্যানসাস সিটিতে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ঘাঁটির কাছে গোলাগুলির ঘটনায় ৯ জন আহত হওয়ার খবরটি এই টুর্নামেন্টের দর্শকদের জন্য আরেকটি বড় নিরাপত্তা সঙ্কট তৈরি করেছে। সেটি হলো আগ্নেয়াস্ত্র হামলার সম্ভাবনা, বিশেষ করে যখন ‘গান ভায়োলেন্স আর্কাইভ’ গত বছর চারশর বেশি গণ-গোলাগুলির ঘটনা নথিভুক্ত করেছে।
২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপেও একই ধরনের একটি বিষয় ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছিল, কিন্তু এই বিশ্বকাপকে ঘিরে অন্যান্য অনেক বিতর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তুমুল আলোচিত বিভেদ সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক বিষয়টির প্রায় উল্লেখই করা হয়নি।
মাদক সহিংসতা
বিশ্বকাপের বেশিরভাগ অংশ যেহেতু যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে মূলত সেই দেশই। কিন্তু সহ-আয়োজক মেক্সিকোতে গত ফেব্রুয়ারিতে আরও একটি অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে।
টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র কয়েক মাস আগে একটি আয়োজক শহরে মাদক-সংক্রান্ত সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। গুয়াদালাহারায় নিরাপত্তা অভিযানে তাদের নেতা ‘এল মেনচো’ নিহত হওয়ার পর জালিস্কো কার্টেল রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে এবং গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর থেকে মেক্সিকো কতটা নিরাপদ হতে পারে, তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে।
এই বিষয়টি সহ-আয়োজকদের মধ্যে উত্তেজনার অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে একটিকে স্পর্শ করেছিল। ট্রাম্প আগে বলেছিলেন যে, মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাম ‘কার্টেলদের নিয়ে খুব ভীত’ এবং ‘মেক্সিকোর ব্যাপারে কিছু একটা করতে হবে।’ এর আগে মেক্সিকো ও কানাডার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য যুদ্ধের হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আপাতত, গুয়াদালাহারার শহর কেন্দ্রে বিশ্বকাপের আমেজ তেমন নেই।
তিন দেশেই বিক্ষোভ দমন
উচ্চ মাত্রার সহিংসতার জবাবে মেক্সিকো এক লাখ নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করেছে। এর প্রেক্ষিতে অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে বিক্ষোভকারীদের ঝুঁকির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। সংস্থাটি বিশেষভাবে সেই নারী আন্দোলনকর্মীদের কথা উল্লেখ করেছে, যারা আসতেকা স্টেডিয়ামে উদ্বোধনী ম্যাচের জন্য একটি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের পরিকল্পনা করছেন এবং প্রিয়জনদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় সত্য, ন্যায়বিচার ও প্রতিকার চাইছেন।
বিশ্বকাপ যেহেতু প্রায়শই বিক্ষোভের একটি মঞ্চ তৈরি করে দেয় – বিশেষ করে, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাত এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন নিয়ে সৃষ্ট ব্যাপক অস্থিরতার মধ্যে – অ্যামনেস্টি বলছে, বিক্ষোভ দমনের ঝুঁকি রয়েছে, কারণ তিনটি আয়োজক দেশেই ‘মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকারের ওপর বিধিনিষেধ’ আরোপ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ট্রাম্প প্রশাসন গাজায় ইসরায়েলি কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদকারী বিদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে, অন্যদিকে ‘আগ্রাসী অভিবাসন আইন প্রয়োগের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও পর্যবেক্ষণকারী মার্কিন নাগরিকদের ফেডারেল এজেন্টরা হত্যা করেছে।’
কানাডায় গাজা সম্পর্কিত বিক্ষোভ ‘অন্যায়ভাবে ছত্রভঙ্গ বা সরিয়ে দিয়েছে পুলিশ।’
মেক্সিকোতেও বিশ্বকাপ-সম্পর্কিত একাধিক বিক্ষোভ হয়েছে, যেখানে আয়োজক শহরগুলোতে পানি সরবরাহ ও জমির প্রাপ্যতায় ব্যাঘাত, ক্রমবর্ধমান খরচ এবং অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে সৃষ্ট অভিজাতকরণের ঘটনায় ক্ষুব্ধ বাসিন্দারা বিক্ষোভ করেছেন। অ্যামনেস্টির আশঙ্কা “টুর্নামেন্টের জন্য মেক্সিকোর নিরাপত্তা বাহিনীর সামরিকীকৃত তৎপরতা আরও বিক্ষোভ দমনের ঝুঁকি তৈরি করছে।”
গৃহহীনদের প্রান্তিকীকরণ
কানাডার ভ্যাঙ্কুভারে ২০১০ শীতকালীন অলিম্পিকের প্রভাব এবং ক্রমবর্ধমান আবাসন সংকট অ্যামনেস্টির মধ্যে এই আশঙ্কা তৈরি করেছে যে, গৃহহীন মানুষেরা আবারও বাস্তুচ্যুত হবেন এবং সমাজের আরও প্রান্তিক অবস্থানে চলে যাবেন।
গত ১৫ই মার্চ, টরন্টোর কর্তৃপক্ষ গৃহহীনদের আশ্রয় প্রদানকারী একটি শীতকালীন উষ্ণায়ন কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়, কারণ স্থানটি ফিফার ব্যবহারের জন্য আগে থেকেই বুক করা ছিল।
একইভাবে ফেয়ারস্কোয়ার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে, দেখানোর উদ্দেশ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থান থেকে গৃহহীনদের সরিয়ে দেওয়া হতে পারে। অথবা, এটি হতে পারে স্পোর্টসওয়াশিং-এর আরেকটি রূপ।
পরিবেশগত ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট সমস্যা
প্যারিস-ভিত্তিক জলবায়ু প্রযুক্তি সংস্থা গ্রিনলি-র একটি সমীক্ষায় অনুমান করা হয়েছে যে, এই বিশ্বকাপের গ্রিনহাউস গ্যাস ফুটপ্রিন্ট হবে ৭৮ লাখ টন কার্বন ডাইঅক্সাইড। এটি কাতারের চেয়ে ২.১ গুণ বেশি হবে, যদিও ২০২২ সালের বিশাল অবকাঠামো নির্মাণকে এর মধ্যে ধরা হয়নি।
এই বিশাল পার্থক্যের মূল কারণ হলো টুর্নামেন্টটির ব্যাপক ভৌগোলিক পরিধি এবং এতে এখন ৪৮টি দল অংশগ্রহণ করছে। এই বিষয়টি অবশ্যই ফুটবলার ও সমর্থকদের তাপ থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে ফিফার গৃহীত পদক্ষেপ এবং একইসঙ্গে বিশ্বের প্রধান দূষণকারী সংস্থাগুলোকে উৎসাহিত করার উদ্বেগের সাথে জড়িত; এমনকি আরামকোর মতো জীবাশ্ম জ্বালানি জায়ান্টের সঙ্গে বাণিজ্যিক চুক্তি পর্যন্ত এর অন্তর্ভুক্ত।
ওয়ার্ল্ড ওয়েদার অ্যাট্রিবিউশনের একটি বিশ্লেষণে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, প্রায় এক-চতুর্থাংশ ম্যাচ ২৬ ডিগ্রি বা তার বেশি ‘ওয়েট বাল্ব গ্লোব টেম্পারেচার’-এ অনুষ্ঠিত হবে। এটি একটি তাপ সূচক, শরীর কতটা কার্যকরভাবে নিজেকে ঠান্ডা করতে পারে, তার মূল পরিমাপক হিসেবে এটিকে ব্যবহার করেন শরীরতত্ত্ববিদরা। ফিফার তাপ ঝুঁকি প্রশমনের পদক্ষেপকে শোচনীয়ভাবে অপর্যাপ্ত বলে বর্ণনা করেছে ফেয়ারস্কয়ার, বিশেষ করে এই বিষয়ে প্রকাশিত গবেষণার অভাবের কারণে।
উদাহরণস্বরূপ, ফিফপ্রো এবং অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দেন যে, থার্মোমিটারের পারদ ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে রেফারিদের হস্তক্ষেপ করা উচিত এবং ২৮ ডিগ্রিতে ম্যাচ বিলম্বিত বা স্থগিত করা উচিত। অথচ ফিফার হস্তক্ষেপ শুরু হয় ৩২ ডিগ্রিতে।
এই বিষয়ে বিজ্ঞানীদের একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই পদ্ধতিটি ‘যৌক্তিকভাবে সমর্থনযোগ্য নয়।’ কাতার থেকে শিক্ষা না নেওয়ার জন্যও ফিফা সমালোচিত হয়, যেখানে একই সমস্যাগুলো হাজার হাজার অভিবাসী শ্রমিকের রহস্যজনক মৃত্যুর একটি সম্ভাব্য কারণ ছিল।
মহাপ্রতারণা
সাম্প্রতিক টুর্নামেন্টগুলোর চেয়ে বেশিরভাগ টিকিটের দাম তিনগুণেরও বেশি হওয়ায়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ খরচের পাশাপাশি, এমন অনুমান করা হচ্ছে যে, টুর্নামেন্টজুড়ে কোনো দলকে সমর্থন করতে একজন সাধারণ সমর্থকের ১০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হবে।
আয়োজক শহরগুলোর সাথে ফিফার অসম চুক্তিগুলো খরচকে কেবল বাড়িয়েই দিয়েছে। এর পক্ষে যুক্তি দিতে নানা রকম অজুহাত দেখিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি, যেমন খেলার রাজস্ব পুনর্বণ্টন থেকে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিনোদন সংস্কৃতির’ সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া। দুটোই হাস্যকর, কারণ পুরোনো মূল্য মডেল অনুযায়ী রাজস্বের পূর্বাভাস ছিল রেকর্ড-ভাঙা এবং ফিফা এর আগে কখনও কোনো স্থানীয় টিকিট সংস্কৃতির সাথে খাপ খাইয়ে নেয়নি। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯৪ বিশ্বকাপেও এমন কিছু নয়। যদি তারা তা করত, তাহলে হয়তো ২০১০ বিশ্বকাপে আরও বেশি স্থানীয় দক্ষিণ আফ্রিকান দর্শক উপস্থিত থাকতে পারত।
মার্কিন বাজারে ‘দালাল’ এখন কীভাবে বৈধ, সেই বিষয়টি স্বীকার করা হলেও, ফিফা পুরোপুরি এতে লিপ্ত না হয়ে একাধিক বিকল্প পথ ছিল। এর মূল ব্যাপা হলো দ্বি-স্তরীয় ফুটবলের সৃষ্টি, যা বিশ্বকাপকে একটি ব্যাপক দর্শকপ্রিয় বৈশ্বিক ফুটবল আয়োজন থেকে সীমিত দর্শকপ্রিয় একটি মেগা-ইভেন্টে রূপান্তরিত করছে।
বিষয়টি আরও বেশি উদ্বেগের কারণ হলো, ঘরোয়া ফুটবল সংস্কৃতিগুলো দীর্ঘদিন ধরেই ক্লাব মালিকদের পক্ষ থেকে ঠিক এই ধরনের চাপ প্রতিহত করতে হিমশিম খাচ্ছে, অথচ খেলাটির নামমাত্র সুরক্ষাব্যবস্থাগুলোই এই পুরো প্রক্রিয়াটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে একটি বর্জনমূলক বিশ্বকাপ, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী সমর্থকদের জন্য।
একটি বর্জনমূলক বিশ্বকাপ, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ভক্তদের জন্য
এই খরচ আরও একটি প্রতিকূল পরিণতির জন্ম দিয়েছে, যা ইনফান্তিনোর আরও কিছু দাবিকে অযৌক্তিক করে তুলেছে। ফিফা সভাপতি বলে আসছেন ইতিহাসের সবচেয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক বিশ্বকাপের কথা, কিন্তু টিকিটের দাম অনেক সমর্থকের নাগালের অনেক বাইরে। এই বিষয়টি শুধু মেজর লিগ সকারের সমর্থকদের মতো স্থানীয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
ফুটবল সাপোর্টার্স ইউরোপ (এফএসই) যুক্তি দেখিয়েছে যে, আধুনিক যুগে এটিই প্রথম আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আয়োজন যা কার্যকরভাবে প্রতিবন্ধী ভক্তদের বাদ দিয়েছে। ইউরোপ থেকে ভ্রমণকারী হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের বিষয়ে সংস্থাটির কাছে বর্তমানে কোনো তথ্য নেই। এর কারণ হিসেবে এএফই উল্লেখ করেছে যে, সবচেয়ে সস্তা ক্যাটেগরি ৪ বিকল্পগুলোর মধ্যে কোনো ‘অ্যাক্সেসিবিলিটি’ টিটেট নেই এবং সঙ্গীদের জন্য বিনামূল্যে প্রবেশের কোনো ব্যবস্থা নেই, যার ফলে একটি দলকে অনুসরণ করে ফাইনালে যেতে একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী ভক্তের ৭ হাজার ডলার পর্যন্ত খরচ হতে পারে।
এফএসই-এর রোনান এভেইন এই পুরো বিষয়টিকে এবং একই সঙ্গে পার্কিংয়ের অযৌক্তিক মূল্যকেও—'প্রতিবন্ধিতার উপর কর’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
আকার
রাজনৈতিক কারণে বিশ্বকাপকে ৪৮ দলে সম্প্রসারণ করাটা পরিহাসের বিষয় হলেও ফিফার জন্য কিছু মাথাব্যথার কারণ হয়েও দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে আরও ভূ-রাজনৈতিক সমস্যা এবং পরিবেশগত ক্ষতি। তবে এটি প্রতিযোগিতার আত্মিক মূল্যকেও ক্ষুণ্ণ করতে পারে। বেশি মানেই হয়তো কম!
অপ্রতিসম ব্যবস্থা, যেখানে ৪৮টি দলকে পরিষ্কারভাবে দুটি ভাগে বিভক্ত হয় না, তার মানে হলো তৃতীয় স্থান নির্ধারণী পর্বের প্রত্যাবর্তন। এটি আরও বেশি সুরক্ষা দেয় ও ঝুঁকি কমায়, কিন্তু একই সঙ্গে সম্ভাব্য অদ্ভুত জটিলতাও তৈরি করতে পারে।
এটি আরও দেখায় যে ফিফা, কিংবা নির্দিষ্টভাবে বললে ইনফান্তিনো, এটা বোঝেন না যে ২০২২ আসরে চার দলের গ্রুপ পর্ব কেন এত রোমাঞ্চকর করে তুলেছিল। অন্য কথায়, তারা বোঝেন না, তাদের আসল খেলাটি কীভাবে কাজ করে।
এমনকি বিপুল সংখ্যক ম্যাচ এবং দলও বিশ্বকাপের স্বয়ংসম্পূর্ণ ধরনে প্রভাবিত করতে শুরু করবে, কারণ এতকিছু একসঙ্গে গ্রহণ করাটা বড্ড বেশি হয়ে যায়। ঠিক তখনই এটির জাদু উবে যেতে শুরু করে। ‘খেলাটি নিজেই নিজেকে খেয়ে ফেলছে’– এর চেয়ে দৃষ্টান্তমূলক উদাহরণ আর নাও থাকতে পারে।
চরম মূল্য
প্রায় সবকিছুর ঊর্ধ্বে এবং সবকিছুর মধ্যে দিয়ে যে বিষয়টি প্রবাহিত হচ্ছে, তা হলো, এই সমস্যাগুলোর অনেকগুলোই কীভাবে এই বিশ্বকাপের মূল বিষয়কে তুলে ধরে এবং কীভাবে এটি খেলাটির চরম অবক্ষয়কে স্পষ্ট করে তোলে।