২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 11 Jun 2026, 11:47 AM
রবের্ত রিভেলিনো এখন নিভৃতচারী। থাকেন সাও পাওলোর গ্রামের বাড়িতে। পাখির কলকাকলি মুখর পরিবেশে। কিন্তু কথা যখন ওঠে ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ ঘিরে, তখন স্রেফ চোখ বুঝলেই তার মানসপটে ভেসে ওঠে হাজারো স্মৃতি। নীরবতা ভেঙে এস্তাদিও আসতেকার গ্যালারির লাখো দর্শকের গর্জন বেজে ওঠে কানে। দিব্যচোখে তিনি দেখতে পান সতীর্থ পেলে-তোসতাও-জায়ারজিনিয়োদের শৈল্পিক ফুটবল। সাম্বা নৃত্য। প্রাপ্তির পূর্ণতায় ভেসে যাওয়া সেই উচ্ছ্বাস, উন্মাদনায় ভরা ফাইনালের প্রতিটি মুহূর্ত আজও রোমাঞ্চের আলোড়ন তোলে রিভেলিনোর অনুভবে।
দিনটি ছিল ২১ জুন, ১৯৭০। শিরোপা লড়াইয়ে মুখোমুখি ইতালি ও ব্রাজিল। ততদিনে দুই দলের শোকেসে তোলা হয়েছে দুটি করে বিশ্বকাপ। তৃতীয়টি জয়ের লড়াই অবশ্য জমল না। বরং বলা ভালো, জমতে দিলেন না পেলে, গেরসন, রিভেলিনোরা।
অষ্টাদশ মিনিটে গ্যালারিতে আনন্দের জোয়ার বইয়ে দিয়ে ব্রাজিলকে এগিয়ে নিলেন পেলে। ৩৭তম মিনিটে রবের্ত বোনিনসেগনা সমতা ফেরালেন। ইতালির পক্ষ থেকে প্রতিরোধ বলতে স্রেফ এতটুকুই। দ্বিতীয়ার্ধে তাদের স্রেফ উড়িয়ে দিল ব্রাজিল।
৬৬তম মিনিটে উচ্ছ্বাস ফেরালেন গেরসন। একটু পর ব্যবধান আরও বাড়ানোর কাজটুকু করে দিলেন জায়ারজিনিয়ো। ব্রাজিল পেতে থাকল শিরোপার ঘ্রাণ। কাগজে-কলমে যা একটু অনিশ্চয়তা ছিল, ৮৬তম মিনিটে সেটুকুরও ইতি টেনে দিলেন কার্লোস আলবের্তো। সে ফাইনাল তো বটেই, ওই টুর্নামেন্টের নানা ঘটনা আজও অমলিন রিভেলিনোর স্মৃতিতে। ৮০ বছর বয়সী চোখ দুটোর পাতা বন্ধ করলে আজও তা তিনি অবিকল দেখতে পান সেদিনের মতোই।
প্রতিপক্ষ হিসেবে কেমন ছিল সেদিনের ইতালি? রিভেলিনোর উত্তর বিস্ময়কর ঠেকতে পারে। তিনি বললেন, ‘সহজ প্রতিপক্ষ।’ সত্যিই তাই। ওই আসরে জার্ড মুলার করেছিলেন ১০ গোল, জার্মানিও ছুটছিল দারুণ গতিতে। অতিরিক্ত সময়ের গড়ানোর লড়াইয়ে তাদেরকে ৪-৩ গোলে ছিটকে দিয়ে ফাইনালে উঠে আসে ইতালি। ব্রাজিল ওঠে একপেশে সেমি-ফাইনালে উরুগুয়েকে ৩-১ গোলে হারিয়ে। স্মৃতি আওড়ে রিভেলিনো বললেন, ইতালির বিপক্ষে ফাইনালে ব্রাজিলের জন্য কিছু কাজ সহজ করে দিয়েছিল মেক্সিকোর দর্শকেরা!
কেমন করে, সে ব্যাখ্যাও দিয়েছেন রিভেলিনো। ব্রাজিল দলের সাথে মেক্সিকোর গুয়াদালাহারাবাসীর বন্ধন তৈরি হয়েছিল ফাইনালের অনেক আগে থেকে। টুর্নামেন্ট চলাকালীন কিছু ঘটনার প্রভাবও ছিল। জাদুকরী ফুটবলের মুগ্ধতা ছড়িয়ে ব্রাজিলের টানা ছয় ম্যাচ জিতে ফাইনালে ওঠা, বিশেষ করে কোয়ার্টার-ফাইনালে ইতালির বিপক্ষে হেরে স্বাগতিক মেক্সিকো বিদায় নেওয়ায় দেশটির মানুষ ব্রাজিলের দিকে ঝুকেঁছিল বলে ফিফাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করেন রিভেলিনো।
“১৯৭০ সালে মেক্সিকোতে আমাদের অসাধারণ এক অভিজ্ঞতা হয়েছিল। কেননা, ফাইনাল খেলতে যাওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা গুয়াদালাহারাতেই ছিলাম। আমরা জিততেই থাকলাম, তাই এই শহরটাতে টুর্নামেন্ট জুড়ে রয়ে গেলাম। এই থেকে যাওয়াটাই বিষয়টাকে বিশেষ করে তুলেছিল। এরপর আমরা দর্শকে ঠাসা আসতেকা স্টেডিয়ামে ফাইনাল খেলতে গেলাম-কী বিশাল এক স্টেডিয়াম!”
“যখন বিশ্বকাপ থেকে মেক্সিকো বাদ পড়ে গেল, দেশটির মানুষ তখন ব্রাজিল দলকে সাদরে বুকে টেনে নিল। এর কারণ ছিল, আমাদের খেলার ধরন, ফুটবল শৈলী এবং এই জাতীয় বিষয়গুলো। মেক্সিকোর ফুটবলপ্রেমীরা সত্যিই আমাদের মন থেকে গ্রহণ করে নিয়েছিল। আন্তরিকভাবে সমর্থন করেছিল এবং এ কারণেই, এটা এত বড় একটা প্রদর্শনীতে রূপ নিয়েছিল।”
সেসময়ের ব্রাজিল দলের মাঠে আধিপত্য কোনো দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল, ছন্দের চূড়ায় থাকা একটি দলের প্রতিদিন আরও উন্নতির ধারায় থাকার চিত্র। দলের মধ্যে বোঝাপড়া ও আত্মবিশ্বাসের যে সুর বাজছিল, তা প্রতিদিনই আরও শক্ত, দৃঢ় এবং জোরাল হতে থাকল। তাতে প্রতিপক্ষদের দুমড়ে-মুচড়ে দিয়ে ছুটতে থাকল ব্রাজিলও। রিভেলিনোর দৃষ্টিতে, তাদের থামানোর সাধ্য ছিল না কারো।
“একটি করে ম্যাচ যাচ্ছিল, ব্রাজিল আরও ভালো ফুটবল খেলছিল। আমার মনে হয়, এমনকি, ওই টুর্নামেন্টে যদি আরও দুই বা তিনটা ম্যাচও বেশি থাকত, আমি মনে করি না, কেউ আমাদের ওই দলটাকে হারাতে পারত। প্রতিটি ম্যাচের সাথে সাথে আমরা আরও উন্নতি করছিলাম, এবং এর সাথে আমাদের দলে ছিল কিং পেলে। এমন দলের খেলা কে না দেখতে চাইবে?”
কিং পেলের প্রশংসায় ভাসলেন রিভেলিনো। কিন্তু তিনিও তো কম ছিলেন না। বাম পায়ে এত জোরে শট তিনি নিতে পারতেন যে, তার নামই ছিল ‘পাতাদা আতোমিকা’, বাংলায় যার অনুবাদ হতে পারে ‘পারমানবিক কিক!’ ’৭০ বিশ্বকাপের স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে অবশ্য শান্ত সুরে রিভেলিনো বললেন, ফাইনালের ব্যবধান বাড়তে পারত আরও।
“বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, আমাদের সবচেয়ে শান্ত এবং ‘সহজ’ ম্যাচ ছিল ইতালির বিপক্ষে ফাইনালটি। এটা শুনলে আপনিও ভাবতে পারেন- এটা কী করে সম্ভব? আমার মনে হয়েছিল, আমরা পাঁচ গোল করতে পারতাম। একটা পর্যায়ে আমি তো গোল করার পথেই ছিলাম, কিন্তু একজন ডিফেন্ডার আমাকে ফেলে দিয়েছিল, ততক্ষণে অবশ্য স্কোরলাইন ৪-১ হয়ে গিয়েছিল, রেফারি ওই পেনাল্টিটা দেননি।”
তাতে অবশ্য বেশি কিছু যায় আসেনি ব্রাজিলের। শিরোপা জয়ের বাঁধনহারা উল্লাসে মেতেছিলেন রিভেলিনো-পেলেরা। কিন্তু বিপত্তি বেঁধেছিল ফাইনালের শেষের বাঁশি বাজার পর। স্থানীয় সমর্থকেরা ব্রাজিল দলের সাথে উদযাপনের জন্য নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে মাঠের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল, তাতে চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। রিভেলিনো সেই স্মৃতি আওড়াতে গিয়ে তোসতাওয়ের চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে পড়ার কাহিনীও শোনালেন।
“যদি আপনার ওই ফাইনালটির কথা মনে থাকে, ম্যাচ শেষের পর মেক্সিকান সমর্থকেরা মাঠে ঢুকে পড়েছিল। তারা পেলের মাথার একটি মেক্সিকান সোমব্রেরো (এক ধরণের টুপি) পরিয়ে দিয়েছিল। এটা ছিল পাগলাটে, স্রেফ পাগলাটে ব্যাপার!”
“এখন আর তেমনটা হয় না, কিন্তু তখন লোকজন মাঠে ঢুকে পড়ত। ওই ফাইনাল শেষে উদযাপনের সময় তোসতাওকে তো প্রায় অন্তর্বাস ছাড়া বিবস্ত্র করে ফেলা হয়েছিল। এটা ছিল অবিশ্বাস্য।”
কথাগুলো বলার সময় রিভেলিনোর মুখে ফুটে উঠছিল হাসির ঝিলিক। আসতেকার সেই বিশ্বকাপের পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পর আবারও মেক্সিকোয় বসতে যাচ্ছে বিশ্বকাপের আসর। মেক্সিকো সিটি স্টেডিয়ামে দক্ষিণ আফ্রিকা ও মেক্সিকোর মধ্যে বৃহস্পতিবার উদ্বোধনী ম্যাচ মাঠে বসে দেখবেন রিভেলিনো। নিশ্চিতভাবেই, পুরনো স্মৃতি নতুন করে দোলা দেবে তার মনে।
মাঝের সময়ে অবশ্য কয়েকবার মেক্সিকো গেছেন রিভেলিনো। সম্মাননা নিতে। কিন্তু যে আঙিনায় ব্রাজিল তৃতীয় বিশ্বকাপ জিতেছিল, রিভেলিনো জিতেছিলেন ব্যক্তিগত একমাত্র বিশ্বকাপটি, সেখানে কখনও পা রাখা হয়নি তার!
২০১৮ সালে উত্তরসূরি কাফুর সাথে রিভেলিনোকে পাচুকা ফুটবল হল অব ফেমে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭০ সালের বীরদের সম্মানে দেওয়া হয়েছিল মেক্সিকো সিটির ঢাউস এক প্রতীকী চাবি।
এতগুলো বছর পর সেই সবুজ আঙিনায় পা রাখার অপেক্ষায় রিভেলিনো। যে মাঠ তার প্রজন্মকে ফুটবলের ইতিহাসে এনে দিয়েছিল অমরত্ব। নিভৃতচারী রিভেলিনোরও তর সইছে না!
“এটা অসাধারণ একটা মুহূর্ত হতে যাচ্ছে। প্রায় ৫৬ বছর পর, সেখানে পা রাখার জন্য আর তর সইছে না। সত্যিই আমি আর অপেক্ষা করতে পারছি না।”