মেসিকে নিয়ে কেন এত লুকোচুরি?

নানা ধোঁয়াশার পর একাকী অনুশীলন করেছেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক।

মোহাম্মদ জুবায়েরমোহাম্মদ জুবায়েরদোহা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 20 Nov 2022, 04:52 AM
Updated : 20 Nov 2022, 04:52 AM

এ এক কোটি টাকার প্রশ্ন। লিওনেল মেসি কী আদৌও অনুশীলন করবেন, নাকি করবে না? বিষয়টি যেন নিশ্চিত করার তেমন কেউ নেই! কেউ কেউ ফিসফিস করে বললেন, মেসিকে বল পায়ে একটু-আধটু কারিকুরিতে মেতে থাকতে দেখেছেন, সেটাও সতীর্থদের সঙ্গে নয়, একাকী। এক ফটোগ্রাফার একটু গর্বের সুরেই জানালেন, তিনি কয়েকটা ছবি তুলেছেন মেসির, কিন্তু তাতে ধোঁয়াশা কাটেনি, বরং বেড়েছে আরও! 

শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ে তাবু ফেলেছে আর্জেন্টিনা। অনুশীলনের ভেন্যু, জিমনেশিয়াম থেকে শুরু করে সব ধরনের অত্যাধুনিক সুবিধা আছে সেখানে। রাজধানী দোহাতে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের তিন নম্বর মাঠে রোববার দলবল নিয়ে দ্বিতীয় দিনের অনুশীলন সেরেছেন আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনি। কিন্তু এই অনুশীলনে যাকে নিয়ে গণমাধ্যমের তুমুল আগ্রহ, ক্যামেরার চোখ যাকে এক পলক দেখার আশায় চাতক পাখির তৃষ্ণতায় তাকিয়ে, সেই মেসির দেখা মেলেনি। 

সেই বিকাল পাঁচটা থেকে তার জন্য গণমাধ্যম কর্মীদের অপেক্ষা। কেবল আর্জেন্টিনা দল নয়, দেশটির অধিকাংশ সংবাদকর্মীও বলতে গেলে তাবু গেড়েছেন এখানে। ট্রেনিং গ্রাউন্ডে প্রবেশ পথের পাশে আলাদাভাবে করা হয়েছে মিডিয়া সেন্টার। সেখানে দিনভর কাজ করার সব সুযোগ সুবিধা আছে। নেই কেবল মেসির সাক্ষাৎ পাওয়ার সুযোগ! 

আর্জেন্টিনার অনুশীলন শুরু সন্ধ্যা ছয়টায় (বাংলাদেশ সময় রাত নয়টায়)। মূল অনুশীলন শুরুর আগে সংবাদকর্মী, ফটোগ্রাফারদের জন্য সময় বরাদ্দ মাত্র ১৫ মিনিট। এই সময়টুকুর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহারে বিকাল থেকে ট্রেনিং গ্রাউন্ডে সংবাদকর্মীদের ভিড়। কেউ ক্যামেরা তাক করে বসে আছেন, এক ক্লিকে মেসির জাদু ফ্রেমবন্দী করতে। কেউ ঠাঁই বসে আছেন টিভি ক্যামেরায় চোখ রেখে। কেউ মোবাইলে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে লাইভ দিতে ব্যস্ত। এভাবে ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, সময় গড়ায়, ফুরায় অপেক্ষার প্রহর; অনুশীলনে নামে আর্জেন্টিনা। 

একে একে এমিলিয়ানো মার্তিনেস, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেস, লেয়ান্দ্রো পারেদেসরা নামলেন সবুজ মাঠে। স্কালোনি সহকর্মীদের নিয়ে প্রস্তুতির রসদগুলো জায়গা মতো বসিয়ে পায়চারি করতে লাগলেন বিক্ষিপ্তভাবে। একটু পর মাঠে এলেন আনহেল দি মারিয়া। প্রথম দিনের অনুশীলনে মেসির মতো তিনিও ছিলেন অনুপস্থিত। 

দি মারিয়া নামাতে আশার পালে নতুন হাওয়া লাগার শুরু। এই বুঝি অনুশীলনে নামবেন মেসি। জাদুকরী বাঁ পায়ের কারিকুরি দেখাবেন, যেমনটা তিনি ক্লান্তিহীন দেখিয়ে চলেছেন সেই ছেলেবেলায় বড়দের ম্যাচের বিরতির সময় থেকে শুরু করে আজ অবধি, কিন্তু তার দেখা যে নাই। চারদিকে নতুন করে শুরু হয় ফিসফাস-তাহলে কি আজও মিলবে না তার দেখা? 

এদিকে সময় গড়াতে থাকে স্রোতস্বিনী নদীর মতো। মিনিটের কাঁটাগুলো দৌড়াতে থাকে যেন পাগলা ঘোড়ার বেগে। যতক্ষণ না ১৫ মিনিট শেষের বাঁশি বাজছে, ততক্ষণ তো আশা আছে মেসিকে দেখার। সেই আশাটুকু বুকে নিয়ে সবার উদ্বিগ্ন চোখ যেন বারবার উঁকি দিতে থাকে মাঠের প্রবেশদারের দিকে। আড়াল ভেঙে কখন তিনি আসবেন?   

গোঁড়ালির চোট কাটিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে ম্যাচে ফেরেন মেসি। দলের ৫-০ ব্যবধানের জয়ে গোল করেন একটি। কাতারে এবার আর্জেন্টিনার মহাভার টেনে নেওয়ার দায়িত্ব এই মহাতারকার। আলবিসেলেস্তাদের জার্সিতে এ মুহূর্তে রয়েছে দুর্দান্ত ছন্দে। সবশেষ পাঁচ ম্যাচে তার গোল দ্বিগুণেরও বেশি, ১১টি। এর মধ্যে আছে এস্তোনিয়ার জালে পাঁচটি। 

মরুভূমিতেও কি তিনি গোলের ফুল ফোটাবেন? সৌরভ ছড়াবেন? ঘোঁচাবেন আজন্ম বয়ে বেড়ানো আক্ষেপও? এমন কত-শত প্রশ্নের উঁকিঝুঁকি গণমাধ্যম কর্মীদের মনে। নাকি রোসারিও ছেড়ে বার্সেলোনায় পাড়ি জমানোর সেই নিদারুণ শৈশব, লা মেসাইয়ায় বেড়ে ওঠা, প্রিয় বার্সেলোনার আঙিনা ছেড়ে কিছুদিন আগে পিএসজিতে কাঁদতে কাঁদতে চলে যাওয়া-কোন প্রশ্নটা নতুন আঙ্গিকে করা যায়? এমন সব ভাবনার ইদুর-দৌড় চলতে থাকে মাথায়। এদিকে ১৫ মিনিট সময়ও যে ফুরিয়ে আসার জোগাড়। 

ওদিকে মেসিরও সময় ফুরিয়ে আসছে। ৩৫টি বসন্ত কাটিয়েছেন ফেলেছেন। সেখানে ক্লাবের হয়ে ভুরিভুরি সাফল্যের গল্প খোদাই করা, কিন্তু আর্জেন্টিনার জার্সিতে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা শিরোপা জয় ছাড়া যে আর বড় কোনো সাফল্য নেই। হয়তো বিশ্বকাপের আঙিনায় এটাই তার শেষবারের মতো পা পড়া। এই শঙ্কা সত্যি হলে গণমাধ্যমকর্মীরাও এবারই শেষবারের মতো বিশ্বকাপে দেখবেন ফুটবলের এই শিল্পীকে, কিন্তু প্রতিক্ষার প্রহর দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। 

ততক্ষণে প্রস্তুতির ছক সাজিয়ে নিয়েছেন স্কালোনি। দি মারিয়া, পারেদেসরা গা-গরম করে নিয়েছেন। সন্ধে লেগে গেছে। হু-হু করে বইতে শুরু করেছে বাতাস। হঠাৎ কানে এলো লাতিন উচ্চারণে কয়েকজন বলতে শুরু করেছেন-‘ইওর তাইম ফিনিশদ’! ছোট্ট একটি কথা, কিন্তু ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে অপেক্ষার ক্ষণ গোণাদের কানে তা যে বেড়ে উঠল বাজখাই শব্দে। বাংলাদেশ থেকে আসা এক সহকর্মী হতাশভরা কণ্ঠে বলে উঠলেন, “আজ বড় আশা করে এসেছিলাম। আগের দিন এত আশা ছিল না, কিন্তু আজ সত্যিই আশা ছিল মেসিকে অনুশীলনে দেখব।” 

ভিনদেশিদের ভাষা বোঝা না গেল না বটে, কিন্তু সে ভাষার সুর বুঝতে বাকি থাকল না একটুও। তারাও হতাশ, কেউ কেউ কিছুটা ক্ষুব্ধ, উদ্বিগ্নও। কিন্তু মেসির কিছু হয়নি তো? তাকে নিয়ে কেন এত লুকোচুরি? তিনি কি চোটগ্রস্থ? ২২ নভেম্বর সৌদি আরবের বিপক্ষে খেলার মতো অবস্থায় আছেন? নাকি দলের প্রাণভোমরাকে নিরিবিলি, নির্ভার মনে প্রস্তুতি সারতে, বাইরের চাপ থেকে শত-মাইল দূরে রাখতে স্কালোনির এই কৌশল? 

এমন অনেক প্রশ্ন বিড়বিড় করতে করতে ট্রেনিং গ্রাউন্ড ছেড়ে বাইরে আসা। তখনই কেউ একজন বলে উঠলেন-মেসি নেমেছেন অনুশীলনে। একা একা একটু অনুশীলনও করেছেন। এরপর ছবি তোলার দাবিও করে বসলেন ওই ফটোগ্রাফার। সবার পা যেন ফের থমকে গেল। ট্রেনিং গ্রাউন্ডের বাইরে অনেকে ঠাঁই দাঁড়িয়ে পড়লেন, কেউ বসে পড়লেন ফুটপাতে, কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়লেন মেসির অনুশীলনের খবর জানাতে! 

মেসি নামের ভারই এমন। তিনি অনুশীলনে নামলেও খবর, না নামলেও খবর। দেখা দিলেও খবর, না দিলেও খবর। এমন হতে পারে কজন?

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক