রোনালদোর রঙ ছড়ানোর শুরু?

সাম্প্রতিক সময়ে নানা বিতর্কে একেবারে জেরবার অবস্থা পর্তুগালের এই তারকা ফরোয়ার্ডের।

মোহাম্মদ জুবায়েরমোহাম্মদ জুবায়েরদোহা থেকেবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 24 Nov 2022, 12:29 PM
Updated : 24 Nov 2022, 12:29 PM

কেমন আছেন ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো? যদিও তিনি বলেছেন ‘ভালো অনুভব করছি’, কিন্তু নানা টানাপোড়েনে যে তার জেরবার অবস্থা। প্রিয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সঙ্গে সম্পর্কের সুতোটা ছিড়ে গেছে। পর্তুগিজ তারকা ‘প্রতারিত হয়েছি’, ‘প্রাপ্য সম্মান পাইনি’-এমন সব বিস্ফোরক অভিযোগ তোলার পর এরই মধ্যে তার সঙ্গে চুক্তি বাতিলও করে দিয়েছে ইউনাইটেড কর্তৃপক্ষ। এত সব কাণ্ড পেছনে ফেলে এখন বিশ্বকাপে স্মরণীয় হয়ে থাকার মিশন শুরুর অপেক্ষায় ফুটবলের এই মহাতারকা। 

দোহার স্টেডিয়াম ৯৭৪-এ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় ঘানার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে কাতার বিশ্বকাপ শুরু করবে পর্তুগাল। বিশ্বকাপের আঙিনায় খুব সম্ভবত শেষবারের মতো পথচলা শুরু হবে রোনালদোর। দিনে দিনে যে বয়স হয়ে গেছে ৩৭ বছর। রজার মিলার মতো ৪২ বছর বয়সে বিশ্বকাপ খেলতে আসার মতো অবিশ্বাস্য কিছু না ঘটলে চার বছর পরের আসরে তাকে দেখার আশা বলতে গেলে নেই।

পর্তুগালের হয়ে বুটজোড়া তুলে রাখার নিশ্চিত কোনো বার্তা অবশ্য এখনও দেননি রোনালদো। তিনি বিভোর হয়ে আছেন কাতারের মরুদ্যানে সৌরভ ছড়াতে। তার এখন একটাই চাওয়া- ইউনাইটেডের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাওয়ার খবর, সাম্প্রতিক সময়ের পিছুটান, সব বিতর্ককে এক ঝটকায় পেছনে ফেলার। নিজেও তো জানেন, ‘চল্লিশে চালশে’ হয়ে যাওয়ার দ্বোরগোড়ায় তিনি।

এবারের বিশ্বকাপে অবশ্য পর্তুগালকে নিয়ে কারো মধ্যে তেমন কোনো উন্মাদনা নেই। তাদেরকে কেউ ফেভারিটের তালিকাতেও রাখছে না। দোহার রাস্তার পাশের শপিং মল, মেট্রো স্টেশনের দেয়ালে রোনালদোর কিছু ছবি সেঁটে থাকার দেখা মিলেছে। তবে পর্তুগিজ সমর্থকদের দেখা মিলেছে কালে ভদ্রে। তাও দল বেঁধে নয়, বিছিন্নভাবে এসেছেন কেউ কেউ। দল ও খেলোয়াড়দের নিয়ে উন্মাদনা যতটুকু, তা কর্নেশিয়ার ফ্যান জোনে, কিংবা ফ্ল্যাগ চত্বরে। সেখানেও নেই পর্তুগিজ সমর্থকদের ভিড়; বরং দোহায় যারা রোনালদোপ্রেমী, তাদের মধ্যে বাংলাদেশীই বেশি! 

স্টেডিয়াম ৯৭৪-এ পর্তুগিজ সমর্থকদের ভিড় কেমন হবে কে জানে, কিন্তু বিশ্বের নানা প্রান্তে ঠিকই টেলিভিশনের পর্দায় চোখ থাকবে রোনালদোপ্রেমীদের। তৃষ্ণার্ত, উৎসুক চোখে তারা তাকিয়ে থাকবেন প্রিয় তারকার দিকে। পর্তুগিজদের প্রত্যাশা থাকবে বৈশ্বিক ফুটবলের সর্বোচ্চ মঞ্চে সেরা সাফল্য পাওয়ার। সেই ১৯৬৬ সালে ইউসেবিও নামের এক শিল্পীর হাত ধরে তৃতীয় হওয়া যে তাদের এখন পর্যন্ত সেরা অর্জন। 

ঘানার বিপক্ষে রোনালদোও নামবেন দলীয়, ব্যক্তিগত অনেক চাওয়া নিয়ে। লিওনেল মেসির মতো তিনিও খেলতে এসেছেন পঞ্চম বিশ্বকাপ। সৌদি আরবের বিপক্ষে হেরে যাওয়া ম্যাচে পেনাল্টি থেকে লক্ষ্যভেদ করা মেসির বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা এখন রোনালদোর সমান সাতটি। এই পাতার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে পেছনে ফেলার দূর্নিবার লক্ষ্য থাকবে পাঁচবারের বর্ষসেরার। 

২০০৬ সালে পশ্চিম জার্মানির আসর দিয়ে বিশ্বকাপের আঙিনায় রোনালদোর পা রাখা। ওই আসরে মাত্র একবার পেয়েছিলেন জালের দেখা। এরপর ২০১০ সালে আফ্রিকায় ও ২০১৪ সালে ব্রাজিলেও পারেননি এক গোলের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে।

২০১৮ সালে রাশিয়ার আসর দেখে রোনালদোর ঝলক, কিন্তু তাও শেষ পর্যন্ত পায়নি পূর্ণতা। গ্রুপ পর্বে তিনি করেন চার গোল; এর মধ্যে স্পেনকে ৩-৩ ড্রয়ে রুখে দেওয়া ম্যাচে উপহার দেন হ্যাটট্রিক; মরক্কোর বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জেতা ম্যাচে করেন নির্ণায়ক গোলটি। কিন্তু শেষ ষোলোয় বিবর্ণ রোনালদো, পর্তুগালের বিদায় ঘণ্টা বাজে উরুগুয়ের কাছে হেরে। 

এবার পর্তুগালের দৌড় কতদূর কিংবা রোনালদো দলের মহাভার কতটা বইতে পারবেন, তার পথরেখা ফুটে উঠতে পারে ঘানার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। রেকর্ডের হাতছানিতে ‘সিআর-৭’ কতটুকু সাড়া দিতে পারবেন, তা দেখার শুরু। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা পাঁচ বা মোট পাঁচ আসরে গোলের ঈর্ষণীয় রেকর্ডটি গড়ার সুযোগ তার সামনে। এই রেকর্ড গড়লেই আরও অনেক পাতায় আঁকিবুকি চলবে, উচুঁ থেকে আরও উচুঁতে উঠবেন রোনালদো।

ইরানের আলি দাইকে (১০৯টি) পেছনে ফেলে আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনে অনেক আগেই বসেছেন রোনালদো, জাতীয় দলের হয়ে তার মোট গোল ১১৭টি। তারও অনেক আগে থেকে তিনি পর্তুগালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। বিশ্বকাপে পর্তুগালের হয়ে সবচেয়ে বেশি গোল করার কীর্তি ইউসেবিওর, এই কিংবদন্তি ৯টি গোলই করেছিলেন ’৬৬ বিশ্বকাপে। দুই গোলে তাকে স্পর্শ করা, তিনটিতে তাকে ছাপিয়ে যাওয়ার সুযোগ কড়া নাড়ছে রোনালদোর দুয়ারে। 

‘এইচ’ গ্রুপে পর্তুগাল ও ঘানার সঙ্গে আছে উত্তর কোরিয়া ও উরুগুয়ে। গ্রুপ পর্বের পথচলা তাই ফের্নান্দো সান্তোসের দলের জন্য খুব মসৃণ নয়। এদিকে সময়টা ভালো যাচ্ছে না রোনালদোরও। ইউনাইটেডের সেরা একাদশে ছিলেন না নিয়মিত। কোচ এরিক টেন হাগের সঙ্গে বাহাস, টানাপোড়েনের কারণে শিরোনামে এসেছেন বারবার। চারদিকে চাউর হয়ে গেছে ইউনাইটেডের সঙ্গে সম্পর্ক চুকেবুকে যাওয়ার। 

ঘানার ম্যাচের আগে ইউনাইটেডের সতীর্থ ব্রুনো ফের্নান্দেস অবশ্য ওল্ড ট্র্যাফোর্ডের তুলকালাম কাণ্ড নিয়ে ওঠা আলোচনায় গা ভাসাননি। যার কাঁধে সওয়ার হয়ে পর্তুগালের ২০১৬ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ, ২০১৮-১৯ মৌসুমের নেশন্স কাপ জয়ের গল্প লেখা, সেই রোনালদোতেই আস্থা রাখার কথা বলেছেন ঘুরেফিরে। আর ইউনাইটেড-রোনালদো ইস্যুতে বলেছেন, “কোনো সম্পর্কই চিরস্থায়ী হয় না।” 

এই চিরায়ত সত্য অজানা নয় রোনালদোরও, কিন্তু সর্বজয়ী হয়ে মানুষের মনের মণিকোঠায়, পক্ষ-প্রতিপক্ষদের স্মৃতিতে স্মরণীয় হয়ে থাকার দূর্নিবার আকাঙ্খা তিনি আড়াল করেননি কখনও। এক সাংক্ষাৎকারে বলেছিলেন… 

“একজন রোল মডেল, শতভাগ নিংড়ে দেওয়া একজন ফুটবলার, দারুণ ফুটবল খেলা একজন-এবং সর্বজয়ী হিসেবে আমি স্মরণীয় থাকতে চাই।” 

সর্বজয়ী হতে রোনালদোর শুধু বিশ্বকাপ জেতাটাই বাকি।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক