০১ নভেম্বর ২০২৬, ১৭ কার্তিক ১৪৩৩

ব্রাজিলের ব্যতিক্রমী এক ‘প্রফেসর’ তিতে

চোটের থাবায় দল জেরবার হলেও ব্রাজিল সমর্থকরা চাইলে শান্ত থাকতে পারেন কোচের দিকে তাকিয়ে।

মোহাম্মদ জুবায়ের মোহাম্মদ জুবায়ের

দোহা থেকে

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 27 Nov 2022, 10:44 PM

Updated : 27 Nov 2022, 10:53 PM

তিনি কখনও চিন্তিত, কখনও বিস্মিত। এই স্মিত হাসির লুকোচুরি খেলা তার চোখে-মুখে, পরক্ষণেই বেশ গম্ভীর। সবাই কেন তাকে ‘প্রফেসর’ নামে ডাকে, সেটা ব্রাজিল কোচ তিতে সুইজারল্যান্ড ম্যাচের সংবাদ সম্মেলনেও বুঝিয়ে দিলেন! 

সম্ভাব্য সেরা একদশ নিয়ে প্রশ্নের স্রোত বয়ে গেল। দানিলোর চোটে দানি আলভেস শুরুতে কিনা, নেইমারের শূন্যতা পূরণ করবে কে-এমন হাজারো প্রশ্নের বান তিনি আটকে দিলেন পাহাড়ের দৃঢ়তায়। শুধু বললেন-ঠিক করে রেখেছি, কিন্তু বলব না। 

এই কোচের প্রস্তুতির ‘ক্লাস’ও অন্যরকম। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমন শিক্ষক ক্লাসে প্রবেশের আগে ছাত্র-ছাত্রীরা উপস্থিত হয়, ব্রাজিলের প্রস্তুতিতে ঠিক তার উল্টো দৃশ্য। দোহার মূল শহরের ভেতরে আল আরাবি স্পোর্টস ক্লাবে প্রস্তুতি নিতে তিতে আসেন সবার আগে।

যে আঙিনায় পাঠদান করবেন শিষ্যদের, ছক কষবেন প্রতিপক্ষ বধের, তার চারধার পায়চারি করেন, ঘুরে ঘুরে দেখেন সবকিছু। কখনও হাঁটু গেড়ে বসে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখেন মাঠের অবস্থা। সবকিছু ঠিকঠাক আছে-যেন কোচের কাছ থেকে এমন সবুজ সংকেত পাওয়ার পর এক এক করে শুরু হয় ছাত্রদের ক্লাসে আসা। সুইজারল্যান্ড ম্যাচের আগেও সেই একই দৃশ্য। 

গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য বরাদ্দ করা ১৫ মিনিটের দেখায় তিতেকে কখনও নেইমার-মার্কিনিয়োসদের সঙ্গে হাসি-ঠাট্টায় মেতে উঠতে দেখা গেল না। বরাবর তিনি রাশভারী, গম্ভীর টাইপের মানুষ। আর্জেন্টিনা কোচ লিওনেল স্কালোনির সঙ্গে লিওনেল মেসি কিংবা ফের্নান্দো সান্তোসের সঙ্গে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদোদের যেমন বুদ্ধি-পরামর্শ করতে দেখা যায়, তিতের ধারে কাছে নেইমার-আলভেস-সিলভাদের দেখা গেল না।

ওই পনের মিনিটের খণ্ড খন্ড দৃশ্যগুলো জোড়া দিলে পূর্ণাঙ্গ ছবিটা এমন দাঁড়ায় যে, তিতে নিজের মতো করে চিন্তায় মগ্ন। শিষ্যরা ছোটাছুটি, হৈ-হুল্লোড় করছে তাদের মতো করে। কিন্তু এরই ফাঁকে কখনও নিজে, কখনও সহকারীদের সহযোগিতা নিয়ে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার কাজটি তিনি করে চলেছেন সূচারুভাবে। তা না হলে, বিশ্বকাপ বাছাইয়ের সেরা এবং টানা ১৫ ম্যাচ জয়ের আত্মবিশ্বাস নিয়ে ব্রাজিল কাতারে নোঙর ফেলে কী করে? কিংবা সার্বিয়াকে হারিয়ে, ক্লিনশিট ধরে রেখে ‘হেক্সা’ পূরণের মিশন শুরু হয় সেলেসাওদের?

এবার ব্রাজিল গ্রুপ পর্বে দ্বিতীয়বার পরীক্ষার টেবিলে বসবে। প্রতিপক্ষ সুইজারল্যান্ড। বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় দোহার স্টেডিয়াম-৯৭৪-এ সোমবার মাঠে গড়াবে ম্যাচটি। 

এই ম্যাচ জিতলে রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের নিশ্চিত হয়ে যাবে গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হওয়া। রাশিয়া বিশ্বকাপেও গ্রুপ পর্বে দেখা হয়েছিল দুই দলের, সেটি ব্রাজিলের ছিল প্রথম ম্যাচ। চার বছর আগের আসরের অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না ব্রাজিলের জন্য। গোলশূন্য ড্রয়ে তিতের দলকে রুখে দিয়েছিল সুইসরা। 

ফিফা র‌্যাঙ্কিংয়ে ১৫তম স্থানে থাকা সুইসরাও আছে আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে। ব্রাজিলের মতো তারা শুভসূচনা করেছে ক্যামেরুনকে হারিয়ে, ব্রিল এমবোলোর একমাত্র গোলে। নকআউট পর্ব নিশ্চিত করার হাতছানি আছে তাদের সামনেও। এমন ম্যাচের আগে তিতের ক্লাসে ব্রাজিলের সেরা ছাত্রটিই অনুপস্থিত!

সার্বিয়ার বিপক্ষে ২-০ গোলে জিতে কাতার বিশ্বকাপে শুভসূচনা করে ব্রাজিল। কিন্তু ওই ম্যাচে বড় ধাক্কাটাও খায় ২০০২ সালে সবশেষ বিশ্বকাপ জেতা দলটি। চোটে গ্রুপ পর্ব শেষ হয়ে গেছে আক্রমণভাগের প্রাণভোমরা নেইমারের। চোটের মিছিলে যোগ দিয়েছেন রক্ষণে ভরসা করার মতো আরেক ছাত্র দানিলোও। রিশার্লিসন, গাব্রিয়েল জেসুস, ভিনিসিউস জুনিয়রের মতো নির্ভরতা আছে আক্রমণভাগে। কিন্তু নেইমারকে হারানোর দুর্ভাবনাও কম নয় তিতের জন্য।

কিন্তু তিনি যে তিতে; সেরাটা নিংড়ে বের করে আনার কৌশলটা যে কারো চেয়ে তার ভালো করে জানা। সার্বিয়া ম্যাচে সেটা দারুণভাবে করে দেখিয়েছেন তিনি। জেসুস ও ফ্রেদের মতো অভিজ্ঞদের বেঞ্চে রেখে পরীক্ষার টেবিলে রিশার্লিসনকে বসিয়ে দেওয়া সাহস দেখিয়েছিলেন।

নাম্বার ‘৯’ পজিশনে ‘লেটার মার্কস’ পেয়ে কোচের প্রত্যাশার প্রতিদান দিয়েছেন ২৫ বছর বয়সী রিশার্লিসন। সুযোগ সন্ধানী শটে এবং এরপর অবিশ্বাস্য মুগ্ধতা ছড়ানোর ভলিতে গড়ে দিয়েছেন ম্যাচের ভাগ্য। কোচের সাহসী সিদ্ধান্তে কাতার বিশ্বকাপে উড়ন্ত শুরু পেয়েছে ব্রাজিলও।

কথায় আছে, প্রথম বিষয়ের (সাবজেক্টের) পরীক্ষায় উত্তর ঠিকঠাক দিতে পারলে পরেরগুলো যত বাঁধা-বিপত্তি আসুক, সেগুলোও ভালো হয়। আলভেস-সিলভার মতো অভিজ্ঞ, ভিনিসিউস-রিশার্লিসনদের মতো তরুণরা কতটা পারবেন, তা বোঝা যাবে সুইজারল্যান্ড ম্যাচের পরই। তবে ব্রাজিল সমর্থকরা উদ্বিগ্ন না হয়ে বরং শান্ত থাকতে পারেন-তাদের দলটির পেছনে আছেন ব্যতিক্রমী এক প্রফেসর; তিতে তার নাম।