Published : 07 Jun 2026, 06:08 PM
ইউরোপের পর এশিয়া- ক্লাব ফুটবলে রাজত্ব করছেন রিয়াদ মাহরেজ। জাতীয় দলের হয়ে তার দাপট দেখা গেছে আফ্রিকায়। অভিজ্ঞ প্লেমেকারের সামনে এবার বিশ্ব মঞ্চে ছাপ ফেলার হাতছানি। উত্তর আমেরিকায় অনুষ্ঠেয় বিশ্বকাপে আলজেরিয়ার অগ্রগতি নির্ভর করছে তার ওপরই।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন আলজেরিয়ার মিডফিল্ডার রিয়াদ মাহরেজ।
ফুটবলের আঙিনায় মাহরেজের অর্জন
পেশাদার ফুটবলে মাহরেজের যাত্রা ২০১১ সালে, ফ্রান্সের ক্লাব লু আভহা ক্লাবে। চতুর্থ স্তর থেকে দলটির দ্বিতীয় স্তরে উঠে আসায় ভূমিকা রাখেন মাহরেজ। ২০১৪ সালের জানুয়ারি যোগ দেন ইংলিশ চ্যাম্পিয়নশিপ ক্লাব লেস্টার সিটিতে।
লেস্টারের চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন মাহরেজ। প্লেমেকার হিসেবে তার দুর্দান্ত দক্ষতা এবং অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা নজর কাড়ে আলজেরিয়া কোচ ভাহিদ হালিলহদজিচেরও। ২০১৪ সালের মে মাসে দেশের হয়ে অভিষেক হয় মাহরেজের। নজরকাড়া ফুটবলে জায়গা করে নেন ২০১৪ বিশ্বকাপ দলে।
২০১৬ সালে ফুটবল বিশ্বকে চমকে দেয় লেস্টার, জিতে নেয় ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ। দলটির সেই অভিযানে বড় ভূমিকা রাখেন মাহরেজ। ৩৭ ম্যাচে ১৭ গোল করেন তিনি, অবদান রাখেন আরও ১০টিতে। এর দুই বছর পর ম্যানচেস্টার সিটিতে যোগ দেন তিনি।
ইতিহাদ স্টেডিয়ামে পাঁচটি দুর্দান্ত মৌসুম কাটে মাহরেজের। সেখানে চারবার জেতেন শিরোপা, তিনবার লিগ কাপ, দুইবার এফ কাপ। চ্যাম্পিয়ন্স লিগে সিটির একমাত্র শিরোপা জয়েও ভূমিকা রাখেন তিনি। এর পাশাপাশি জেতেন বর্তমানে ফিফা ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ নামে পরিচিত টুর্নামেন্টের শিরোপা।
২০১৯ সালে আফ্রিকা কাপ অব নেশন্স জয়ে আলজেরিয়াকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মাহরেজ। ২০১৮ ও ২০২২ বিশ্বকাপে বাছাইপর্বে আটকে যাওয়ার পর, এবার আবার দলকে ফিরিয়েছেন চূড়ান্ত মঞ্চে।
এখন আল আহলিতে খেলছেন মাহরেজ। সৌদি প্রো লিগের তারকাদের একজন তিনি। এখানেও জিতেছেন মহাদেশীয় শিরোপা, ২০২৪/২৫ মৌসুমের এএফসি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এলিট।
কোচ ও কিংবদন্তিদের চোখে মাহরেজ
“গোল করার মানসিকতা নিয়ে বড় মঞ্চে সে অসাধারণ এক খেলোয়াড়। আমি রিয়াদকে নিয়ে সন্তুষ্ট। কারণ, সে ফুটবল খেলেত ভালোবাসে। এই বছরগুলোতে সে অনেক কিছু দিয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও অনেক কিছু দেবে।”
- পেপ গুয়ার্দিওলা
“আমি সারা রাত মাহরেজের খেলা দেখতে পারব… তার খেলা অবিশ্বাস্য রকমের পরিশীলিত। সে যেন বলকে অনুভব করে এবং এটা জানা অসম্ভব যে, সে কোন দিকে যাবে। ডিফেন্ডারদের জন্য সত্যিকারের দুঃস্বপ্ন।”
- গ্যারি লিনেকার
“টেকনিক্যালি সে খুব প্রতিভাবান। প্রায় কখনোই বল হারায় না। সে ড্রিবল করতে পারে, প্রতিপক্ষের দুই বা তিন জনের চাপের মুখেও সে বল ধরে রাখতে পারে, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের বাধা এড়িয়ে এগিয়ে যেতে পারে এবং গোলে অবদান রাখতে পারে।”
- ভাহিদ হালিলহদজিচ
“সে প্রতিভাবান একজন খেলোয়াড় যে ভিন্ন কিছু যোগ করে। সে টেকনিক্যালি দৃঢ়, খুব আক্রমণাত্মক এবং সবসময়ই রক্ষণের জন্য হুমকি। সে বল পায়েও খুব গতিময়।”
- জিনেদিন জিদান
পরিসংখ্যানের আলোয় মাহরেজ
• আলজেরিয়ার হয়ে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১২ ম্যাচ খেলেছেন মাহরেজ। ১১৬ ম্যাচ খেলা আইস্সা মান্দিকে হয়তো বিশ্বকাপেই ছাড়িয়ে যেতে পারেন তিনি।
• আলজেরিয়ার হয়ে এখন পর্যন্ত ৩৮ গোল করেছেন মাহরেজ। দেশের হয়ে সর্বোচ্চ গোল করা ইসলাম স্লিমানির চেয়ে আট গোল পেছনে তিনি।
• জাতীয় দলের হয়ে ৪৪টি অ্যাসিস্ট করেছেন মাহরেজ। দারুণ সব পাসের জন্য পরিচিত এই মিডফিল্ডার সৌদি প্রো লিগে নিজের প্রথম মৌসুমে ১৩টি অ্যাসিস্ট করেন। আর ২০২৪-২৫ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এলিটে সতীর্থদের আটটি গোলে অবদান রাখেন তিনি।
বিশ্বকাপ মঞ্চে মাহরেজ
২০১৪ বিশ্বকাপের ঠিক আগে জাতীয় দলে অভিষেক হলেও, সহজেই ব্রাজিলগামী বিমানে জায়গা নিশ্চিত করেন মাহরেজ। বেলজিয়ামের বিপক্ষে শুরুর একাদশেও জায়গা করে নেন তিনি। বাম প্রান্তে ম্যাচ জুড়ে ভীতি ছড়িয়ে যান। তবে দলের ২-১ ব্যবধানের হার এড়াতে পারেননি তিনি।
বিশ্বকাপে সেটিই হয়ে আছে মাহরাজের সবশেষ ম্যাচ। গ্রুপ পর্বের পরের দুই ম্যাচে তিনি ছিলেন অব্যবহৃত বদলি খেলোয়াড়। শেষ ষোলোয় অতিরিক্ত সময়ে জার্মানির বিপক্ষে ২-১ ব্যবধানে হেরে যাওয়া ম্যাচেও খেলার সুযোগ হয়নি তার। পরের দুই আসরে আলজেরিয়া চূড়ান্ত পর্বে জায়গা না পেলেও, এই সময়ে উন্নতির পথ ধরে অনেক দূর এগিয়ে গেছেন মাহরেজ।
২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে মাহরেজ ও আলজেরিয়ার প্রত্যাশা
আফ্রিকান অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইয়ে দাপট দেখিয়েছে আলজেরিয়া। গ্রুপ পর্বে ১০ ম্যাচের আটটিতে জিতেছে তারা, ড্র করেছে একটিতে। ২০২৫ আফ্রিকান কাপ অব নেশন্সে তারা খেলেছে কোয়ার্টার-ফাইনালে।
গত মার্চে গুয়াতেমালার বিপক্ষে ৭-০ গোলের বড় জয় পায় আলজেরিয়া। পরে মার্সেলো বিয়েলসার উরুগুয়ের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে তারা।
বিশ্বকাপে মাহরেজের লক্ষ্য থাকবে ‘জে’ গ্রুপ থেকে আলজেরিয়াকে নকআউট পর্বে নিয়ে যাওয়া। এর জন্য তাদের লড়তে হবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের বিপক্ষে।
২০২২ আসরে কাতারে নজরকাড়া ফুটবল উপহার দিয়ে আফ্রিকার প্রথম দল হিসেবে সেমি-ফাইনালে খেলেছিল মরক্কো। সেখান থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে উত্তর আমেরিকা আসরে ছুটতে চায় মাহরেজের আলজেরিয়া।