ইংলিশ ফুটবল
Published : 13 Mar 2026, 04:01 PM
ফিল ফোডেনের সঙ্গে আসলে হচ্ছেটা কী? এই প্রশ্নের মাঝে লুকিয়ে আছে তারকা মিডফিল্ডারের ক্যারিয়ারের বর্তমান চিত্র।
চলতি মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ম্যানচেস্টার সিটির ১২ ম্যাচের মাত্র চারটিতে শুরুর একাদশে জায়গা হয়েছে ফোডেনের। আর দলের সবশেষ ম্যাচে, গত বুধবার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে রেয়াল মাদ্রিদের মাঠে ৩-০ গোলে ভরাডুবির দিনে তো পুরোটা সময় বেঞ্চে বসেই কাটাতে হয়েছে তাকে।
ইউরোপ সেরার মঞ্চে শেষ ষোলোর প্রথম লেগের ম্যাচটিতে শুরু থেকেই ভুগতে দেখা যায় সিটিকে। তবুও কোচ গুয়ার্দিওলা আস্থা রাখতে পারেননি ফোডেনের ওপর, দুই মৌসুম আগে দলের টানা চতুর্থ লিগ শিরোপা জয়ের মূল নায়ক ছিলেন যিনি।
প্রিমিয়ার লিগে সিটির সবশেষ ছয় ম্যাচে মাত্র ১৮২ মিনিট খেলতে পেরেছেন ফোডেন। তাকে যেন হিসেবে বাইরে ফেলে দিয়েছেন কোচ। তিনি বরং ভরসা রাখছেন অ্যান্টোয়ান সেমেনিও, হায়ান শেহকি ও সাভিনিয়োর ওপর।
গত ১৪ ডিসেম্বরের পর আর জালের দেখা পাননি ফোডেন। তখন অবশ্য সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হলেও দারুণ ফর্মে ছিলেন তিনি; সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে পাঁচ ম্যাচে ছয়টি গোল করেছিলেন।
কিছু প্রশ্ন তাই অবধারিতভাবেই সামনে আসছে- ২৫ বছর বয়সী এই ইংলিশ প্লেমেকার কি পারবেন আগের পর্যায়ে ফিরতে? তাকে কি সেই সুযোগ দেওয়া হবে? এবং বিশ্বকাপ যখন দোড়গোড়ায়, তখন ক্লাবে এত কম সময় খেলে ইংল্যান্ড কোচ টমাস টুখেলের হিসেবের মধ্যে থাকতে পারবেন ফোডেন?

কেন খেলছেন না ফোডেন?
ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রেকর্ড গোলস্কোরার ওয়েইন রুনির মতে, নিজের কৌশল বদলে ফেলেছেন গুয়ার্দিওলা, আর এটাই ফোডেনের কম সময় খেলার কারণ।
রুনির দৃষ্টিতে সিটি এখন আর খুব বেশি সাইড-টু-সাইড, প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়দের মাঝে জায়গা বের করে এবং খুব বেশি সময় বল ধরে রেখে খেলছে না।
“সেমেনিও ও শেহকিকে নিয়ে দলটি এখনও (ম্যাচের মাঝেই) আরেকটু বেশি ধরণ বদলে খেলছে। (এই কৌশলে) ফোডেনের চেয়ে তারা বেশি ডায়নামিক।”
“কখনও মনে হয় এই কৌশল একটু বেশি শারীরিক শক্তি নির্ভর, বল পেলে আরও দ্রুত আক্রমণে উঠে যায়, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারের মধ্য দিয়ে। হয়তো অন্যদের বেলায় এই কৌশল যতটা মানিয়ে যায়, ফোডেনের ক্ষেত্রে ততটা না।”
জানুয়ারিতে বোর্নমাউথ থেকে ছয় কোটি ৪০ লাখ পাউন্ড খরচ করে সেমেনিওকে চুক্তিভুক্ত করেছে সিটি এবং দলটিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে প্রিমিয়ার লিগে মাত্র তিন মিনিট বাদে পুরোটা সময় খেলেছেন ঘানার এই উইঙ্গার।
ফোডেনের সবশেষ গোলের পর, সেমেনিও, গত গ্রীষ্মে লিওঁ থেকে আসা ফরাসি অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার শেহকি এবং মিডফিল্ডার ও লেফট-ব্যাকে খেলতে পারদর্শী তরুণ নিকো ও’রাইলি মিলে ১৭টি গোল করেছেন।
গত ৪ মার্চ প্রিমিয়ার লিগে নটিংহ্যাম ফরেস্টের বিপক্ষে শুরুর একাদশে ছিলেন ফোডেন। সেদিন দুইবার এগিয়ে গিয়েও জিততে পারেনি সিটি, ম্যাচটি ২-২ ড্র হয়।। নটিংহ্যামের দ্বিতীয় সমতাসূচক গোলে আক্রমণের শুরুতে গোলদাতা এলিয়ট অ্যান্ডারসনকে ট্র্যাক করতে ব্যর্থ হন ফোডেন।
ওই ঘটনার ৬৫ সেকেন্ড পরই তাকে তুলে নেন গুয়ার্দিওলা।
দি ওয়েইন রুনি শোয়ে সিটির সাবেক মিডফিল্ডার মাইকেল ব্রাউন অবশ্য ফোডেনের সবশেষ ম্যাচে না খেলার কারণ খোঁজার চেষ্টা করলেন।
“আমরা সবসময় সবকিছু নাও জানতে পারি। হয়তো তার ছোটখাটো কোনো আঘাত লেগেছে অথবা কোনো চোটও থাকতে পারে, যে কারণে তাকে (বড় চোট পাওয়া থেকে) রক্ষা করতে হবে এবং সে অনুশীলনে পুরোপুরি দিতে পারছে না।”
“নয়তো কিচুদিন আগে যে প্রতিটা মিনিট খেলতো, সেখান থেকে হঠাৎ কেন একেবারেই খেলার সময় পাচ্ছে না? এমনটা কীভাবে হলো? কোনো কারণ অবশ্যই আছে।”
গত দুই মৌসুমে প্রতি ৯০ মিনিটে গোল ও অ্যাসিস্টের গড় সময়ের সঙ্গে কেবলই হ্রাস পেয়েছে।
২০২২-২৩ মৌসুমে তার দারুণ ফর্ম সিটিকে ট্রেবল জিততে সাহায্য করেছিল। সেবারের প্রিমিয়ার লিগে প্রতি ৯০ মিনিটে ০.৮টি করে গোল করেছিলেন ফোডেন।
পরের মৌসুমে লিগে ৩৫টি ম্যাচ খেলেন ফোডেন, এর ৩৩টিতেই ছিলেন শুরুর একাদশে। ওই আসরে প্রতি ৯০ মিনিটে ০.৯টি করে গোল করেন তিনি; লিগে মোট ১৯টি গোল ও আটটি অ্যাসিস্ট করেন তিনি, যা সিটির টানা চতুর্থ লিগ শিরোপা জয়ে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
অসাধারণ ওই পারফরম্যান্সে ২০২৩-২৪ মৌসুমে প্রফেশনাল ফুটবলার্স অ্যাসোসিয়েশনের বর্ষসেরা পুরুষ খেলোয়াড়ের পুরস্কার জয় করেন তিনি।
সিটির হয়ে আটটি পূর্ণ মৌসুমে এখন পর্যন্ত ছয়টি প্রিমিয়ার লিগ ও একটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগসহ মোট ১৭টি শিরোপা জিতেছেন ফোডেন। সেই তিনিই এখন যেন অচেনা হয়ে উঠেছেন, নিজেকে মেলে ধরতে ভুগছেন, দলে হয়ে পড়েছেন অনিয়মিত।
গত বড়দিনের আগে প্রিমিয়ার লিগে ১৫ দিনের মধ্যে টানা চার ম্যাচে জালের দেখা পান তিনি, ম্যাচগুলোই করেন ছয়টি গোল। সেই ছোট্ট কিন্তু দুর্দান্ত একটা পর্বের পর, সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে সবশেষ ১৮ ম্যাচে গোল করতে পারেননি ফোডেন।
এমন ছন্দপতনের কারণে টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড দলেও তার জায়গা শঙ্কার মুখে পড়েছে। চলতি মাসের শেষদিকে দুটি প্রীতি ম্যাচ খেলবে ইংল্যান্ড, এজন্য আগামী ১৪ মার্চ দল ঘোষণা করবেন টুখেল।

ফোডেনের কম মিনিট খেলার পেছনে কোচের ট্যাকটিকস পরিবর্তন
গত বছরের শেষ দিকে কৌশলে পরিবর্তন এনে ফোডেনকে সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার পজিশন থেকে আরেকটু সামনে এগিয়ে খেলান গুয়ার্দিওলা, অনেকটা দ্বিতীয় স্ট্রাইকারের মতো।
ওই সময় নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি যুক্তি হিসেবে গুয়ার্দিওলা বলেন, “আমি জানি, যখন সে আর্লিংয়ে কাছাকাছি খেলে, যেমনটা আমাদের (টানা) চতুর্থ প্রিমিয়ার লিগ জয়ের বছর খেলেছিল, সেই বছর প্রিমিয়ার লিগের সেরা খেলোয়াড় হয়েছিল সে।”
কিছুদিন ওই কৌশল কাজেও দেয়। ওই যে ডিসেম্বরের প্রথম ভাগে লিগে চার ম্যাচে ছয় গোল করেন ফোডেন, সেই ম্যাচগুলোয় সাধারণত উইং ধরে আক্রমণে উঠে হলান্ডের পেছনে জায়গা খুঁজে নিতেন তিনি।
ক্যারিয়ারে অনেকবার দলে দায়িত্ব বদলেছে ফোডেনের এবং তার সাফল্যের পেছনে বড় একটা কারণও ছিল অনেক পজশনে খেলতে পারার গুণ।
দলে ভারসাম্য আনতে অনেকবার কোচ তার এই গুণকে কাজে লাগিয়েছেন। তাই কোনো না কোনো পজিশনে প্রায় সময়ই তিনি একাদশে নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন; কিন্তু হঠাৎ করেই সবকিছু যেন বদলে গেছে।
মাঠের দুই পাশের খেলোয়াড়দের চোট এবং বেশ কিছুদিন ধরে সোজাসুজি প্রতি-আক্রমণেও সাফল্য না আসায়, ফোডেনকে বাইরে রেখে গুয়ার্দিওলা অনেকটা সরু আক্রমণের ছক কষছেন, মূলত ৪-২-২-২ ও ৪-৩-১-২ ফরম্যাটে।
সিটির আগের মৌসুমগুলোয় এসব ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ফর্মহীনতা, চোট কিংবা কৌশলগত-যেকারণেই হোক, কোনো ফুটবলার যদি গুয়ার্দিওলার কৌশলে মানিয়ে নিতে না পারে, তাহলে প্রায় সময়ই ওই খেলোয়াড়ের নিজেকে খুঁজে পেতে প্রাক-মৌসুমের প্রয়োজন হয়।

ফোডেন কি পারবেন ফের গুয়ার্দিওলায় আস্থায় ফিরতে?
জ্যাক গ্রিলিশ, কাইল ওয়াকার, জো হার্ট, জোয়াও কান্সেলো-সিটির এমন অনেক খেলোয়াড় ছিল, যারা আচমকাই দলে ব্রাত্য হয়ে পড়েন এবং এরপর দ্রুত তাদের হয় বিক্রি করে দেওয়া হয় নয়তো ধারে পাঠানো হয়।
গত গ্রীষ্মে যেমন ডিফেন্ডার মানুয়েল আকাঞ্জি সিটি ছেড়ে ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টার মিলানে যোগ দেন, এর আগের মৌসুমেই প্রিমিয়ার লিগে ২৬ ম্যাচ খেলেন তিনি।
গত ফেব্রুয়ারিতে হতাশাভরা কণ্ঠে এই সুইস ডিফেন্ডার জানান, ধারে পাঠানোর অল্প কিছুদিন আগে তাকে জানানো হয় যে আপাতত তাকে প্রয়োজন নেই।
সম্ভবত তারকা ফুটবলারদের মধ্যে একমাত্র ইয়াইয়া তুরে একমাত্র উদাহরণ, যিনি গুয়ার্দিওলার আস্থা হারানোর পরও দলে জায়গা ফিরে পান।
ইংল্যান্ডে গুয়ার্দিওলার প্রথম মৌসুমে তুরেকে ঘিরে সিটি শিবিরে পরিস্থিতি বেশ ঘোলাটে হয়ে উঠেছিল। ওই ২০১৬-১৭ মৌসুমে কোত দি ভোয়ার এই সাবেক মিডফিল্ডারকে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের স্কোয়াড থেকে বাদ দেন স্প্যানিশ কোচ, তুরের এজেন্টের ভাষায় যা ছিল ‘অপমানজনক।’
এজন্য কয়েক সপ্তাহ তুরেকে আর মাঠেই নামাননি গুয়ার্দিওলা। কয়েক সপ্তাহ পর, খেলোয়াড়ের দিক থেকে ক্ষমা চাওয়া হলে মন গলে কোচের এবং প্রিমিয়ার লিগে সিটির প্রথম ১১টি ম্যাচ মিস করার পারার পরও বাকি ২৭ ম্যাচের ২২টিতে শুরুর একাদশে ছিলেন তুরে।
এখন প্রশ্ন হলো, ফিল ফোডেন কি পারবেন কোচের নতুন কৌশলের সঙ্গে চটজলদি নিজেকে মানিয়ে নিতে?