২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপ
Published : 04 May 2026, 08:33 AM
‘বিশ্বের মধুরতম জায়গা’ থেকে উঠে আসা ২৭ বছর বয়সী ক্রিস্টিয়ান পুলিসিকের দিকে তাকিয়ে বিশ্বকাপে মধুর কিছুরই স্বপ্ন দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। ভালোবেসে তাকে ‘ক্যাপ্টেন আমেরিকা’ ডাকেন ভক্তরা। ঘরের মাঠে তার কাছ থেকে সুপারহিরোর মতোই পারফরম্যান্স দেখতে চান তারা।
২০২৬ বিশ্বকাপে নিজ দেশের স্বপ্নের সারথীদের নিয়ে ফিফার আয়োজন ২৬ সুপারস্টার। এই পর্বে আছেন যুক্তরাষ্ট্রের উইঙ্গার ক্রিস্টিয়ান পুলিসিক।
প্রতিপক্ষের অ্যাঙ্কেল মচকে দেওয়ার মতো ‘হুট করে থেমে যাওয়া এবং চট করে পূর্ণ গতিতে ছোটা’ এবং মাথা ঘুরিয়ে দেওয়ার মতো ড্রিবলিংয়ের সামর্থ্য উইংয়ে পুলিসিককে কার্যকর করে তুলেছে। প্রতিপক্ষের রক্ষণ ভেদ করতে প্রায়ই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেন তিনি।

ফুটবলের আঙিনায় পুলিসিকের অর্জন
ক্লাব ফুটবলে পুলিসিকের মতো সাফল্য পাননি যুক্তরাষ্ট্রের আর কেউ। ২০২১ সালে নিজ দেশের প্রথম ফুটবলার হিসেবে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে খেলেন তিনি, চেলসির হয়ে জেতেন ইউরোপের ক্লাব শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা।
বরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হয়ে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু করেন পুলিসিক। এখন ইতালিতে খেলছেন এসি মিলানের হয়ে। ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি ডর্টমুন্ডের হয়ে অভিষেকের পর এখন পর্যন্ত তিনি জিতেছেন পাঁচটি ট্রফি।
২০১৮ বিশ্বকাপে খেলতে না পারার আক্ষেপ আছে পুলিসিকের। সেবার চূড়ান্ত পর্বে জায়গা পায়নি যুক্তরাষ্ট্র।
জাতীয় দলের হয়ে প্রাপ্তির খাতা অবশ্য শূন্য নয় তার। আছে কনকাকাফ নেশন্স লিগে প্রথম তিন আসরের শিরোপা জয়ের উচ্ছ্বাস। ২০২১ সালে প্রথম আসরের ফাইনালে টাইব্রেকারে মেক্সিকোকে ৩-২ গোলে হারায় যুক্তরাষ্ট্রে। দর্শকে পূর্ণ গ্যালারিতে টানটান উত্তেজনার পেনাল্টি শুটআউটে মেক্সিকো গ্রেট গিয়ের্মো ওচোয়ার বিপক্ষে গোল তার সেরা মুহূর্তের একটি।

কোচ, সতীর্থ ও গ্রেটদের দৃষ্টিতে পুলিসিক
“সে ক্যাপ্টেন আমেরিকা নামে পরিচিত, যদিও ক্যাপ্টেন আমেরিকা ডাকা সে পছন্দ করে না। সে নিজেকে সুপারহিরো হিসেবে দেখে না; সে সাধারণ থাকতে পছন্দ করে এবং তার পা থাকে মাটিতে, তবে বাস্তবে তো বিষয়টি এমন নয়। তুমি ক্যাপ্টেন আমেরিকা। তুমি কী বলছো, সেটাকে আমি গুরুত্বই দিচ্ছি না। তুমি সেটাই। যদি এটা তোমায় বাড়তি চাপে রাখে, সেটাকেও গুরুত্ব দিচ্ছি না। এটা তো তারই দোষ। যদি তুমি এতটা ভালো না হতে, তাহলে তো তোমার কাছে আমরা কিছু চাইতাম না।”
- জ্লাতান ইব্রাহিমোভিচ
“ক্রিস্টিয়ান অসাধারণ একজন খেলোয়াড়। আমরা বলতে পারি, তার জাতীয় দলের জন্য সে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। মিলানে প্রতি সপ্তাহেই তাকে প্রতিযোগিতায় নামতে হয়। সে যখন গোল করে বা গোলে অবদান রাখে, আমাদের খুব ভালো লাগে।”
- মাউরিসিও পচেত্তিনো
“পুলিসিক হলো সমস্যা সমাধানকারী, পজেশন তার দলের নিয়ন্ত্রণে থাকুক বা না থাকুক, সবসময়ই। গতানুগতিক একটা ধারণা হলো, তার মাপের আক্রমণভাগের খেলোয়াড়রা একটু স্বার্থপর হয়, বল পায়ে না থাকলে তারা ততটা কঠোর পরিশ্রম করে না…পুলিসিক এমন নয়। সে এর বিপরীত, সে দল অন্তঃপ্রাণ এবং সে যেমন পরিশ্রম করে, অবিশ্বাস্য।”
- তিয়াগো লেয়াল
“আমি বলছি না যে, সে মেসি। তবে আমি বলছি, আমরা যেভাবে ধরে নিই, মেসির যেমন সেগুলো করারই কথা, একইভাবে ক্রিস্টিয়ানের ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে আমরা ধরে নিই সেগুলো তার করারই কথা।”

- লন্ডন ডনোভান
পরিসংখ্যানের আলোয় পুলিসিক
• ২০১৬ সালের ২৮ মে, বলিভিয়ার বিপক্ষে ৪-০ ব্যবধানে জয় পাওয়া প্রীতি ম্যাচে দারুণ এক কীর্তি গড়েন পুলিসিক, ১৭ বছর ২৫৩ দিন বয়সে জালের দেখা পেয়ে দেশের পুরুষ ফুটবলে সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতা হয়ে যান তিনি।
• যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বিশ্বকাপ বাছাইয়ে সবচেয়ে কম বয়সে গোলের কীর্তিও গড়েন পুলিসিক। ২০১৬ সালে সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড গ্রেনাডিয়ান্সের বিপক্ষে ৬-০ ব্যবধানে জয়ে ১৭ বছর ৩৪৯ দিন বয়সে গোল করেন তিনি।
• যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে তিনি সর্বকনিষ্ঠ অধিনায়ক। ২০ বছর ৬৩ দিন বয়সে অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরেন তিনি। ২০১৮ সালের নভেম্বরে ইতালির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে দলকে প্রথমবার নেতৃত্ব দেন পুলিসিক।
• যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলেন পুলিসিক। ২০২১ সালে ফাইনালে ম্যানচেস্টার সিটির বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয়ী চেলসি দলে ছিলেন তিনি।
• কাতার আসরে দুটি ম্যাচে সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জেতেন পুলিসিক। তার চেয়ে বেশি ম্যাচ সেরা হন কেবল কিলিয়ান এমবাপে ও লিওনেল মেসি।

বিশ্বকাপ মঞ্চে পুলিসিক
কেবল একটি আসরে খেললেও বিশ্বকাপে এরই মধ্যে নিজের ছাপ ফেলতে পেরেছেন পুলিসিক। কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের চার ম্যাচেই শুরুর একাদশে ছিলেন তিনি।
দেশের তিনটি গোলেই ভূমিকা আছে পুলিসিকের। টুর্নামেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচে ওয়েলসের সঙ্গে ১-১ ড্রয়ের পথে টিমোথি উইয়াহর গোলে অবদান রাখেন তিনি। ইরানের বিপক্ষে ১-০ ব্যবধানে জয়ে ব্যবধান গড়ে দেন পুলিসিক। ওই গোলই দলকে নিয়ে যায় নকআউট পর্বে।
ইরানের বিপক্ষে গোলের সময় কড়া আঘাত পান পুলিসিক। সময়মতো সেরে ওঠে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে শেষ ষোলোর ম্যাচে খেলেন তিনি। ৩-১ ব্যবধানের পরাজয়ে হাজি রাইটের গোলে অবদান রাখেন তিনি।

২০২৬ বিশ্বকাপ ঘিরে পুলিসিক ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা
গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কোচ মাউরিসিও পচেত্তিনোর সঙ্গে টানোপোড়েন শুরু হয় পুলিসিকের। কনক্যাকাফ গোল্ড কাপ পূর্ব প্রীতি ম্যাচগুলোতে তাকে ডাকেননি আর্জেন্টাইন কোচ। দৃশ্যত এখন তাদের মধ্যে সম্পর্ক ফের আগের মতো হয়েছে।
গত অক্টোবরে আনফিল্টার্ড সকার পডকাস্টে পুলিসকের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন পচেত্তিনো।
“আমি মনে করি, ক্রিস্টিয়ান গত বছর দারুণ মান দেখিয়েছে। সে ইউরোপে ভালো করছে, সে জাতীয় দলেও ভালো করছে। সে খুব প্রতিভাধর একজন খেলোয়াড়, যে আমাদের ম্যাচ জিততে সাহায্য করতে পারবে।”
মিলানে নিজের সেরা মৌসুম কাটাচ্ছেন পুলিসিক। সবকিছু ঠিক থাকলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বকাপে সামর্থ্যের চূড়ায় থেকে খেলতে নামবেন এই উইঙ্গার, ঠিক যেমনটা ক্যাপ্টেন আমেরিকার করার কথা।
আগামী ১৩ জুন প্যারাগুয়ের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে আসরে যাত্রা শুরু করবে যুক্তরাষ্ট্র। ‘ডি’ গ্রুপে তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া ও তুরস্ক।