Published : 06 Feb 2026, 09:03 PM
বছরখানেক আগে, ফুটবলের শীর্ষ পর্যায়ে কাসেমিরোর ভালো পারফরম্যান্স ছিল হাতেগোনা। এমনকি, একটা পর্যায়ে তো মাঠে নামার সুযোগই পাচ্ছিলেন না তিনি; ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডে টানা পাঁচটি প্রিমিয়ার লিগ ম্যাচে পুরোটা সময় ছিলেন বেঞ্চে বসে। জাতীয় দলেও বাতিলের খাতায় পড়ে গিয়েছিলেন এই তারকা মিডফিল্ডার।
হ্যাঁ, ক্যারিয়ারের ওই পর্যন্তই মাঠে কাসেমিরো যা করেছেন, বল পায়ে যত দুর্দান্ত মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, যে ক্লাবেই গেছেন সেই দলের মাঝমাঠকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন, তাতে তিনি আগেই গ্রেটদের কাতারে উঠে বসেছেন। কিন্তু ৩৩ বছর বয়সী ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার যেন বলতে চাইলেন, এখনও ফুরিয়ে যাননি তিনি, তার দেওয়ার আছে আরও।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও হার না মানা মনোভাবে আবার দলের কেন্দ্রে চলে এসেছেন কাসিমিরো। আর তা শুধু ক্লাবেই নয়, একই সঙ্গে জাতীয় দলেও।
চলতি মৌসুমে ইউনাইটেডের জার্সিতে টানা বিশ্বমানের পারফরম্যান্স উপহার দিয়েছেন তিনি। পেছনের ব্যর্থতা মুছে, কার্লো আনচেলত্তির কোচিংয়ে আবার বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্নে গুছিয়ে ওঠা ব্রাজিল দলেও এখন তিনি নিয়মিত ও গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।
গত মৌসুমের মাঝপথ থেকে অনেকে তার ক্যারিয়ারের শেষও ধরে নেন। সেই তিনিই কোণঠাসা অবস্থান থেকে কীভাবে আবার নিজেকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এসেছেন, ম্যাচের পর ম্যাচ হয়ে উঠছেন জয়ের নায়ক, তার কিছু চিত্র তুলে ধরা হলো বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের পাঠকদেন জন্য।
কাসেমিরোর কাঁধে সওয়ার ইউনাইটেডে
প্রিমিয়ার লিগে গত রোববার, ফুলহ্যামের বিপক্ষে হোঁচট খাওয়ার শঙ্কা থেকে শেষ মুহূর্তের গোলে জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে ইউনাইটেড।
সেদিন যোগ করা সময়ের চতুর্থ মিনিটে বল জালে পাঠিয়ে মূল্যবান তিনটি পয়েন্ট এনে বেনিয়ামিন শেশকো। তবে, ওল্ড ট্র্যাফোর্ডে তখন হাজারো সমর্থকদের মুখে একটাই নাম, কাসেমিরো। আরেকটি নজরকাড়া পারফরম্যান্সের পর সবাই ব্রাজিলিয়ান তারকার স্তুতিতে মশগুল। সতীর্থদের জয় উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দুও ছিলেন তিনি।
ম্যাচ শেষের প্রতিক্রিয়ায় স্লোভেনিয়ার ফরোয়ার্ড শেশকোর কণ্ঠেও ধরা দিল, বর্তমান ইউনাইটেড শিবিরে কাসেমিরো কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
“তিনি অবিশ্বাস্য এক খেলোয়াড়, একজন কিংবদন্তি। তার সঙ্গে খেলতে পারা দারুণ ব্যাপার এবং তার উপদেশ পাওয়াও দারুণ। মাঠে তিনি যেভাবে পরিশ্রম করেন, অবিশ্বাস এবং তিনি তার সব দলকে অনুপ্রাণিত করেন।”
শেশকোর ওই জয়সূচক গোলের আগে সেদিন কাসেমিরোর হেডেই এগিয়ে গিয়েছিল ইউনাইটেড। পরে স্বদেশি মাথেউস কুইয়ার গোলে অসাধারণ নো-লুক পাসে অ্যাসিস্টও করেন তিনি। প্রত্যাশিতভাবেই জিতে নেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার; তিন ম্যাচের মধ্যে দ্বিতীয়বার, দুই সপ্তাহ আগে ম্যানচেস্টার ডার্বিতেও তিনি ছিলেন মাঠের সেরা খেলোয়াড়।
কাসেমিরোর স্বরূপে ফেরার চিত্র কেবল এই কয়েকটি ম্যাচেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং চলতি মৌসুম জুড়েই ইউনাইটেডের সেরা পারফর্মার তিনি।
প্রিমিয়ার লিগের ২০২৫-২৬ আসরে ইউনাইটেডের সবচেয়ে বেশি ট্যাকল (৫২) ও ব্লক (১২) করেছেন কাসেমিরো, এই সময়ে বল দখলের লড়াইয়ে তার জয়ের সংখ্যাটা দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (১০৭), প্রতিপক্ষের থেকে বল কেড়ে নিয়েছেন ১৬ বার।
আক্রমণেও সমানভাবে ভীতি ছড়াচ্ছেন তিনি, ম্যাচের পর ম্যাচ। এবারের প্রিমিয়ার লিগে এ পর্যন্ত পাঁচটি গোল করেছেন, সঙ্গে দুটি অ্যাসিস্ট।
ক্যারিয়ারে সেরা সময়টা কাসেমিরো নিশ্চিতভাবেই কাটিয়েছেন রেয়াল মাদ্রিদে। ইউরোপের সফলতম ক্লাবটিতে দীর্ঘসময় ছিলেন এক নম্বর ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। সাফল্যও পেয়েছেন অনেক; পাঁচটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও তিনটি লা লিগাসহ জিতেছেন অনেক ট্রফি।
তবে একটা জায়গায় ইংল্যান্ডে আরও বেশি কার্যকর কাসেমিরো। ইউনাইটেডের হয়ে এ পর্যন্ত ২২টি গোল করেছেন তিনি, প্রতি ৬.৭ ম্যাচে একটি করে। যেখানে রেয়াল মাদ্রিদের জার্সিতে তার গোল গড় ছিল প্রতি ১০.৮ ম্যাচে একটি করে।
তবে দলে কাসেমিরো কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা এইসব সংখ্যা দিয়ে বোঝানো মুশকিল। তার অভিজ্ঞতা, কৌশলগত পরীক্ষিত জ্ঞান ও নেতৃত্বগুণ যেকোনো দলকে আরও সমৃদ্ধ করে তোলে; ইউনাইটেডের খুব কঠিন ও টালমাটাল সময়েও যা ফুটে উঠেছে।
ধারাবাহিক ব্যর্থতার কারণে এই বছরের শুরুতে ইউনাইটেডে চাকরি হারাতে হয়েছে কোচ হুবেন অ্যামুরির। পর্তুগিজ এই কোচ ক্লাবটিতে শুরুর কয়েক মাসে কাসেমিরোকে খুব বেশি ম্যাচ খেলাননি; কিন্তু লড়াই করে ঠিকই দলে নিয়মিত হয়ে ওঠেন তিনি।
তার সামর্থ্য ও পেশাদারিত্বকে সম্মান জানিয়ে অ্যামুরি পরে বলেছিলেন, সবার জন্যই কাসেমিরো হতে পারে ‘দারুণ এক উদাহরণ।’
চলতি মৌসুমের বাকি সময়ের জন্য ইউনাইটেডের দায়িত্ব নেওয়া কোচ মাইকেল ক্যারিকের চোখেও কাসেমিরো অসাধারণ এক ফুটবলার, যার প্রতি তার ‘অনেক সম্মান আছে।’
সেলেসাও দলে ফেরা
২০২৪ সালের কোপা আমেরিকায় ব্রাজিল দলে কাসেমিরোর অনুপস্থিতি তার ক্যারিয়ারে একটা শূন্যতা হয়েই থাকবে। ওই সময়ের ব্রাজিল কোচ দরিভাল জুনিয়র একাধিকবার কাসেমিরোর প্রশংসাও করেন; তাই মহাদেশ সেরা প্রতিযোগিতায় তার ডাক না পাওয়া ছিল বিস্ময়কর।
ওই ঘটনায় ২০২৬ বিশ্বকাপে কাসেমিরোর খেলার সম্ভাবনায়ও বড় এক চোট লাগে। দরিভালের কোচিংয়ে পরে আর খেলার সুযোগই পাননি তিনি।
তবে আনচেলত্তি সেলেসাওদের দায়িত্ব নিতেই বদলে যায় দৃশ্যপট। রেয়াল মাদ্রিদে একসঙ্গে অনেক সাফল্য পেয়েছেন আনচেলত্তি ও কাসেমিরো, তাই এই ফুটবলারের সামর্থ্য অজানা নয় এই ইতালিয়ান কোচের কাছে।
গত বছর মে মাসে ব্রাজিলের কোচের আসনে বসেই কাসেমিরোকে নিয়ে স্কোয়াড ঘোষণা করেন আনচেলত্তি। সেই থেকে তার কোচিংয়ে ব্রাজিলের খেলা আট ম্যাচের সাতটিতেই শুরুর একাদশে ছিলেন কাসেমিরো। খেলতে পারেননি কেবল বলিভিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের ম্যাচে, সেটাও চোটের কারণে।
খেলোয়াড় হিসেবে দুইবার এবং কোচ হিসেবে রেকর্ড পাঁচবার ইউরোপিয়ান কাপ বা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয়ী আনচেলত্তির মতে, কাসেমিরো দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার।
“বল পায়ে থাকা অবস্থায় দলে ভারসাম্য আনতে সে হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়। সে দারুণ বুদ্ধিমান, কৌশলী ও দলে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব যোগ করে।”
গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের বিপক্ষে দুটি ম্যাচে দলকে নেতৃত্বও দেন কাসেমিরো। আনচেলত্তি এখনও অবশ্য পাকাপাকিভাবে অধিনায়ক বেছে নেননি। সবশেষ দুই ম্যাচে ব্রাজিলকে নেতৃত্ব দেন মার্কিনিয়োস।
কাসেমিরোর নেতৃত্বের প্রশংসায় আনচেলত্তি বলেন, “সে জানে দলের চাহিদা কী। সে জানে কীভাবে কঠিন পরিস্থিতি সামলাতে হয় এবং সতীর্থদের কীভাবে উদ্বুদ্ধ করতে হয়। কাসেমিরো সবার জন্য আদর্শ, সবার কাছে প্রশংসনীয়।”
বিশ্বকাপে তৃতীয়বারে সফল হবেন?
আসছে জুন-জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে হবে এবারের বিশ্বকাপ। তৃতীয়বারের মতো ফুটবলের সর্বোচ্চ প্রতিযোগিতায় খেলার আশায় আছেন কাসেমিরো। আন্তর্জাতিক ফুটবলে ২০১১ সালে অভিষেক হলেও, ঘরের মাঠে ২০১৪ বিশ্বকাপের স্কোয়োডে ছিলেন না তিনি।
২০১৮ সালের বিশ্বকাপে অবশ্য সময়ের সেরা মিডফিল্ডারদের একজন হয়ে রাশিয়ায় পা রাখেন তিনি। কোচ তিতের দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনের একজন ছিলেন তিনি। আসরে ব্রাজিলের প্রথম চার ম্যাচে খেলেন শুরুর একাদশে; কিন্তু কার্ডের নিষেধাজ্ঞার কারণে খেলতে পারেননি বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার-ফাইনালে। তার দলও পারেনি সেই বাধা উতরাতে।
বেলজিয়ানদের বিপক্ষে পুরো ম্যাচেই ব্রাজিলের খেলায় কাসেমিরোর শূন্যতা অনুভূত হয়। শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলে হেরে বিদায় নেয় পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা।
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপেও দলের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিলেন কাসেমিরো। এই আসরেই বিশ্বকাপে প্রথম জালের দেখা পান তিনি; সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের শেষ দিকে দর্শনীয় গোলে গড়ে দেন ব্যবধান।
কিন্তু এরপর আবার, শেষ আটেই থেমে যায় তাদের যাত্রা। ত্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে টাইব্রেকারে হেরে ছিটকে পড়ে ব্রাজিল। তাদের হেক্সা জয়ের স্বপ্নও আরও একবার অপূর্ণ রয়ে যায়।
ক্লাব ফুটবলে সর্বজয়ী কোচের হাত ধরে আসছে বিশ্বকাপ ঘিরে আবার সেই স্বপ্ন দেখছে ব্রাজিলিয়ানরা। সেই অভিযানে হয়তো নেতৃত্বের ভূমিকাতেই দেখা যাবে কাসেমিরোকে।
জাতীয় দলের হয়ে ২০১৯ কোপা আমেরিকা জয়ী কাসেমিরোর বিশ্বকাপ অভিযান এখন পর্যন্ত হতাশা আর হৃদয়ভাঙা গল্পেই সীমাবদ্ধ। তবে যেভাবে আবার নতুন করে জেগে উঠেছেন তিনি, তাতে তাকে ঘিরে প্রায় দুই যুগের ব্যর্থতা ঘোচানোর স্বপ্ন দেখতেই পারে সেলেসাওরা।
দেশের ফুটবল-পাগল মানুষের পাশাপাশি নিজেকেও স্বপ্নের ট্রফি এনে দিতে কাসেমিরোও মরিয়া হয়ে আছেন।