Published : 15 Dec 2025, 08:41 AM
পঞ্চাশ বছর আগে সান্তোস ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ফুটবলে যোগ দিয়েছিলেন একজন কিংবদন্তি; অনেকের চোখে যিনি সর্বকালের সেরা, ফুটবলের রাজা পেলে। তার অর্ধ শতাব্দী পর লাতিন আমেরিকার আরেক মহানায়ক লিওনেল মেসির হাত ধরে যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ফুটবল ছুটছে নতুন উচ্চতা ছোঁয়ার পথে।
১৯৭৫ সালে সেই সময়ের নর্থ আমেরিকান সকার লিগের (এনএসএল) দল নিউ ইয়র্ক কসমসে যোগ দেন পেলে। বিশৃঙ্খল এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন খেলোয়াড় হিসেবে তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় ক্লাবটি। তাদের মুখপাত্র জন ও’রেইলি পরবর্তীতে একসময় বলেছিলেন, “যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের অনেক সুপারস্টার ছিল, কিন্তু কেউই যেন পেলের সমপর্যায়ের নন। সবাই তাকে স্পর্শ করতে, তার সঙ্গে হাত মেলাতে ও ছবি তুলতে চাইত।”
যদিও তখন নিজের সেরা সময় অনেক আগেই পেরিয়ে এসেছিলেন পেলে, তবুও তার জাদুতে ফুটবলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মানুষদের আগ্রহ বেড়েছিল। বলা যায়, নিজেরা ‘সকার’ নাম দেওয়া খেলাটির প্রতি তারা নতুন করে আকর্ষিত হয়েছিল।

১৯৭৫ সালের ১৫ জুন ডালাস টর্নেডোর বিপক্ষে অভিষেক হয় একমাত্র ফুটবলার হিসেবে তিনটি বিশ্বকাপজয়ী পেলের; ২-২ ড্র ম্যাচে একটি গোল করেন তিনি।
পেলের দেখানো পথ ধরে পরের কয়েক বছরে ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ার, কার্লোস আলবের্তো, ইয়োহান ত্রুইফ, ববি মুর, জর্জ বেস্ট, গর্ডন বাঙ্কসের মতো তারকা খেলোয়াড়রা যোগ দেন এনএসএলে।
মার্কিন মুলুকেই ১৯৭৭ সালের ২৮ অগাস্ট শেষ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ খেলেন পেলে। সিয়াটল সাউন্ডার্সকে ২-১ গোলে হারিয়ে কসমসকে এনে দেন দ্বিতীয় সকার বৌল শিরোপা।
পরে ১ অক্টোবর কসমস ও সান্তোসের মধ্যে প্রদর্শনী ম্যাচ দিয়ে ক্যারিয়ারের ইতি টানেন পেলে। প্রথমার্ধে তিনি খেলেন কসমসের হয়ে, দ্বিতীয়ার্ধে সান্তোসের জার্সিতে। কসমসের হয়ে ৩০ গজ দূর থেকে ফ্রি কিকে একটি গোলও করেন তিনি। দ্বিতীয়ার্ধের খেলার সময় নেমেছিল বৃষ্টি। পেলের বিদায়ের সঙ্গে প্রকৃতির আচরণের সংযোগ টেনে ব্রাজিলের একটি পত্রিকা শিরোনাম করেছিল, “এমনকি আকাশও কাঁদছে।”

এর সাত বছর পর অবলুপ্তি ঘটে কসমসের। টুর্নামেন্টের সফলতম দলই শুধু নয়, বরং এনএসএলেরই সমাপ্তি ঘটে সে সময়। ১৯৮০ দশকের শুরুর দিকের অর্থনৈতিক মন্দা এবং ফুটবলারদের ইউনিয়নের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ১৯৮৪ মৌসুমের পর পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় এনএসএল।
এরপর যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে শীর্ষ লিগ বলতে কিছু ছিল না। ১৯৯৪ বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার সময় দেশটি একটি পেশাদার শীর্ষ লিগ চালুর প্রতিশ্রুতি দেয়। এর পথ ধরেই ১৯৯৬ সালে ১০ দল নিয়ে যাত্রা করে মেজর লিগ সকার (এমএলএস)। পরে ডেভিড বেকহ্যাম, কাকা, আন্দ্রেয়া পিরলো ওয়েইন রুনি, থিয়েরি অঁরি, দাভিদ ভিয়ার মতো খেলোয়াড়দের টেনে প্রতিযোগিতাটি মাঝেমধ্যে ফুটবল বিশ্বের দৃষ্টি কাড়লেও, পেলের মতো সেই আকর্ষণ জাগাতে পারেননি কেউ।
দীর্ঘ সেই শূন্যতার যেন যতি টানলেন মেসি। তাকে পেয়ে ফুটবল বিশ্বের এককোণে পড়ে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ক্লাব ফুটবল আবারও এলো দৃষ্টির সীমানায়।

সাত বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ক্লাব ইন্টার মায়ামি মেসিকে পেয়েই উঠে এলো শীর্ষ সারিতে। শুরুতে অবশ্য কেবলই খবরের শিরোনামে। তবে মেসির জাদুকরি ফুটবলে খুব দ্রুতই তারা শিরোপার দাবিদার হয়ে উঠল এবং যেন চোখের পলকে একে একে তারা পেয়ে গেল তিনটি শিরোপা, যার সবশেষটি সবচেয়ে বড়, এমএলএস কাপ।
কেবল নিজের ক্লাব মায়ামিকেই নয়, একের পর এক নজরকাড়া পারফরম্যান্সে তিনি পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে এলেন এমএলএসকেও। আড়ালে পড়ে থাকা এক লিগকে বিশ্বব্যাপী এনে দিলেন পরিচিতি।
মেসি বার্সেলোনা ছাড়বেন, এমন কিছু একসময় ছিল অভাবনীয়। কিন্তু নাজুক আর্থিক পরিস্থিতিতে নিজেদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতাকে ধরে রাখতে পারেনি কাতালান ক্লাবটি। পিএসজিতে দুঃসহ দুই বছর কাটিয়ে মেসি খুঁজে নেন নতুন চ্যালেঞ্জ।
মেসি অবশ্য বার্সেলোনায় ফিরে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সমাধান না মেলায় ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি জানান, যোগ দিচ্ছেন ইন্টার মায়ামিতে।

আল-হিলালের আকাশছোঁয়া পারিশ্রমিককে না বলে অখ্যাত এক ক্লাবে কেন যাচ্ছেন মহাতারকা?-মায়ামির সেই সময়ের অবস্থার দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয়, তার সিদ্ধান্তে তখন কেন অনেকের চোখ কপালে উঠেছিল। প্রতিষ্ঠার পর ততদিন পর্যন্ত কোনো শিরোপার স্বাদ পাওয়া তো বহু দূরের কথা, তাদের স্কোয়াডই তেমন মজবুত ছিল না।
মেসি যাওয়ার সময় ওই মৌসুমে লিগের পয়েন্ট টেবিলের তলানিতে ছিল মায়ামি; ১৬ ম্যাচের ১১টিতেই হেরেছিল তারা। আরও অবাক করা একটি তথ্য; দলটির তখন কোনো স্থায়ী কোচও ছিল না!
মেসির যোগ দেওয়ার খবরেই সবকিছু খুব দ্রুত পাল্টাতে শুরু করে। টিকেটের দাম বেড়ে যায় হাজার শতাংশের বেশি! মায়ামির ম্যাচের টিকেটের দাম ২৯ ডলার থেকে এক ধাক্কায় হয়ে যায় ৩২৯ ডলার। তার সম্ভাব্য অভিষেক ম্যাচের টিকেটের মূল্য যেন আকাশ ছুঁয়েছিল, সর্বোচ্চ ১ লাখ ১০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়েছিল!
রাতারাতি যেন বিখ্যাত হয়ে যায় ইন্টার মায়ামি। সামাজিক মাধ্যমে হুহু করে বাড়তে থাকে তাদের ফলোয়ার। মেসির অভিষেকের আগেই ইনস্টাগ্রামে তাদের ফলোয়ার ১০ লাখ থেকে বেড়ে ৮০ লাখ হয়।
মাঠের বাইরে তীব্র আলোড়ন ফেলে দেওয়া মেসি অভিষেক রাঙান দুর্দান্ত গোলে মায়ামিকে জিতিয়ে। তার প্রথম অ্যাওয়ে ম্যাচের টিকেট শেষ হয়ে যায় স্রেফ ১০ মিনিটেই।
মেসির দেখানো পথে ধীরে ধীরে অন্য তারকারাও যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলে পাড়ি জমান। মায়ামিতেই যোগ দেন তার বার্সেলোনা সতীর্থ সের্হিও বুসকেতস, জর্দি আলবা ও লুইস সুয়ারেস। তাদের সঙ্গে নাম লেখান বিশ্বকাপজয়ী আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার রদ্রিগো দে পল। ইউরোপের পাঠ চুকিয়ে এমএলএসকে আরও বেছে নেন বায়ার্ন মিউনিখ তারকা টমাস মুলার, টটেনহ্যাম হটস্পারের সাবেক অধিনায়ক সন হিউং মিন।
এক মেসির উপস্থিতিতেই পাল্টে যায় মায়ামি। ওই বছরই লিগস কাপে তারা আবির্ভূত হয় অন্য চেহারায়। গোল করে ও করিয়ে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেন মেসি। ১০ গোল করে হন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা, ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সে জেতেন সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার। ফাইনালে ন্যাশভিলকে হারিয়ে মায়ামি নিজেদের ইতিহাসে জেতে প্রথম শিরোপা।
তবে জাদুকরের জন্যও তো সবসময় সবকিছু সম্ভব হয় না। সেবার দলকে এমএলএস কাপের লড়াইয়ে প্লে-অফে নিতে পারেননি মেসি। পরের বছর সেই দুঃখ ভুলতেই যেন দলকে চূড়ায় রেখে নিয়ে গেলেন প্লে-অফে! সঙ্গে গড়লেন পয়েন্টের রেকর্ড। ২০২১ সালে নিউ ইংল্যান্ড রেভ্যুলেশনের গড়া ৭৩ পয়েন্ট ছাড়িয়ে মায়ামি অর্জন করে ৭৪ পয়েন্ট। সঙ্গে জেতে সাপোর্টার্স শিল্ড, নিশ্চিত করে ক্লাব বিশ্বকাপে খেলা।
তবে, প্লে-অফের প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নেয় মায়ামি। এমএলএস কাপ জয়ের স্বপ্ন ভাঙে মেসির। তারপরও, তাকে নিয়ে পাগলামী বাড়তেই থাকে। ম্যাচ শেষ হতেই প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়রা ছুটে যেত তার কাছে, সবারই চাওয়া তার জার্সি!
এমনকি রেফারিও তার জার্সি চেয়েছেন, এমন খবরও আসে। ম্যাচ শেষে মেসির অটোগ্রাফ চেয়ে রেফারির শাস্তি পাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে!
স্টেডিয়ামে দর্শকের সংখ্যা হু হু করে বাড়তে থাকে, পুরো টুর্নামেন্টের দর্শক সংখ্যায় গড়ে নতুন রেকর্ড। এখানে লুকিয়ে আরেক মেসিময় অবিশ্বাস্য ঘটনার এবং ধারাবাহিকভাবে তাও চলতে থাকে।
অনেক ম্যাচে দেখা গেছে প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকরাও গ্যালারিতে মেসি-মেসি জয়োধ্বনি তুলেছে। প্রতিপক্ষ শিবিরে মেসি বা তার মতো কেউ অনুপস্থিত থাকলে, খুশিই হওয়ার কথা অন্য দলের সমর্থকদের; কিন্তু মায়ামির বেলায় দেখা গেছে ভিন্ন। তাদের প্রতিপক্ষ দলের সমর্থকরাও যেন অপেক্ষায় থাকত মেসির জাদুর সাক্ষী হওয়ার।
আর মায়ামির গ্যালারি?, দিনে দিনে যেন হয়ে উঠেছে তারকাদের মিলনমেলা। বিভিন্ন খেলার তারকা, মহাতারকাদের উপস্থিতি থাকে নিয়মিতই। আসেন চলচ্চিত্রের তারকারাও। মেসির উপস্থিতিতে সত্যিই যেন ফুটবল নিয়ে নবজাগরণ তৈরি হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। ঠিক যেমনটা ৫০ বছর আগে হয়েছিল পেলেকে ঘিরে।
এমন এক মহাতারকাকে পেয়ে স্বাভাবিকভাবেই এমএলএসের স্পন্সরশিপ থেকে বাড়ছে আয়ও। তাতে মায়ামির পাশাপাশি অন্য সব দলই সুবিধা পাচ্ছে।
মেসি খেললেই দশর্কের জোয়ারে টিকেট নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে যাচ্ছে। নিজেদের ছোট স্টেডিয়াম ছেড়ে পাশের কোনো বড় স্টেডিয়ামে ম্যাচ আয়োজনের ঘটনাও ঘটেছে। সেটাও কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে।
মেসিকে বিশ্রাম দিলে ক্ষেপে যাচ্ছেন প্রতিপক্ষের ভক্তরা! মেসির গোল উদযাপন করছে গোটা স্টেডিয়াম। বোঝার উপায় থাকছে স্বাগতিক দলের সমর্থক কারা। মায়ামি ভক্তদের সঙ্গে তারা যোগ দিচ্ছেন গোল উদযাপনে।
সবকিছু মিলিয়েই যেন যুক্তরাষ্ট্রের সকার নামের ফুটবল এখন মেসি-জ্বরে কাঁপছে। উঁকি দিচ্ছে নতুন নতুন স্বপ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলপ্রেমীদের নতুন স্বপ্ন দেখানোর মাঝে চলতি মৌসুমে মেসিরও একটা স্বপ্ন পূরণ হয়ে গেছে।
চলতি বছর এমএলএস কাপ জিতে আগেরবারের দুঃখ ভুলেছেন তিনি। প্লে-অফে একের পর এক জাদুকরি পারফরম্যান্সে নিজেই দলের শিরোপা জয়ে রেখেছেন সবচেয়ে বড় অবদান।
মেজর লিগ সকারের ইস্টার্ন কনফারেন্সের প্লে-অফ ফাইনালে নিউ ইয়র্ক সিটিকে ৫-১ গোলে বিধ্বস্ত করে কনফারেন্স ট্রফি জিতে নেয় মায়ামি। সেই সঙ্গে জায়গা করে নেয় তারা এমএলএস কাপের লড়াইয়ে। সেখানে ভ্যানকুভার হোয়াইটক্যাপসকে ৩-১ গোলে হারিয়ে প্রথমবার এমএলএস কাপ শিরোপা জয়ের অনির্বচনীয় আনন্দে মাখামাখি হয় মায়ামি।
মেসির অর্জনে টইটম্বুর ক্যারিয়ারে ৪৭তম ট্রফি এটি, সিনিয়র ফুটবলে ৪৪তম।
এমএলএসের ইতিহাসে প্রথম ফুটবলার হিসেবে টানা দুবার এমভিপি (মোস্ট ভ্যালুয়েবল প্লেয়ার) পুরস্কার জিতে নেন মেসি। এই সেরার লড়াইয়ে মেসি যে এবারও সেরা হবেন, তা নিশ্চিত হয়ে যায় বেশ আগেই।
মেজর লিগ সকারের নিয়মিত মৌসুমে এবার ২৮ ম্যাচে ২৯ গোল করে ‘গোল্ডেন বুট’ জেতেন তিনি। এছাড়া সহায়তা করেন ১৯ গোলে। গত মৌসুমে গোল ও অ্যাসিস্ট মিলিয়ে ৩৬ গোলে অবদান ছিল তার। এখানেও তিনি গড়েছেন অনন্য কীর্তি। একাধিক মৌসুমে অন্তত ৩৬ গোলে অবদান রাখা প্রথম ফুটবলার তিনি।
এমন আরও অনেক রেকর্ড গড়া মেসি ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাড়িয়েছেন চুক্তির মেয়াদ। যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলকে প্রতিষ্ঠিত করার যে চ্যালেঞ্জ নিয়েছিলেন পেলে, সবসময়ের সেরার ছোট্ট তালিকায় থাকা আরেকজন- মেসির হাত ধরে সেটা এবার হয়তো পূর্ণতা পাওয়ার পথে।