ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লিমিটেড নামে ঢাকার একটি কোম্পানির মাধ্যমে হুমায়ুন ও রহমত রাশিয়া যান বলে পরিবার জানিয়েছে।
Published : 09 Feb 2025, 01:39 AM
ভাগ্যবদলের আশায় দালালের মাধ্যমে অবৈধ পথে রাশিয়ায় গিয়ে ‘প্রশিক্ষণ শেষে’ যুদ্ধক্ষেত্রে নাটোরের সিংড়ার এক যুবক নিহত হয়েছেন বলে খবর এসেছে পরিবারের কাছে।
একই পরিবারের আরেকজন যুদ্ধ থেকে বাঁচাতে পরিবার ও দালালদের কাছে আকুতি জানিয়েছেন।
নিহত যুবকের নাম মো. হুমায়ুন কবির (৩৩)। তিনি সিংড়া উপজেলার হুলহুলিয়া গ্রামের মৃত মহসিন প্রামাণিকের ছেলে। তার ভগ্নিপতি মো. রহমত আলী এখন রাশিয়ায় আটকা।
একইভাবে রাশিয়ায় গিয়ে বিপদে পড়েছেন যশোরের জাফর হোসেনও। সদর উপজেলার চাঁচড়ার সরদারপাড়ার খায়রুল সরদারের ছেলে জাফর হোসেনকেও রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে পরিবার।
সারাদেশে এরকম আরও কয়েকজনের কথা জানা যাচ্ছে, যারা এখন রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে রয়েছেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা এরই মধ্যে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে বিষয়টি শ্রম ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিতে এনেছেন। ঢাকা থেকে বিষয়টি রাশিয়ায় বাংলাদেশের শ্রম কল্যাণ উইংয়ে জানানো হয়েছে।
উইংয়ের প্রথম সচিব মাজেদুর রহমান সরকার বুধবার সন্ধ্যায় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব স্যারের মাধ্যমে বিষয়টি আমি জেনেছি। আমি রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি জানিয়েছি। তারা আবার তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলাপ করে ব্যবস্থা নেবে। এটা বেশ লম্বা একটা প্রসেস।”
এদিকে রাশিয়ায় মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানী থেকে এক নারীকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (এসএসপি) জসীম উদ্দিন খান বলেন, বুধবার রাতে নেপালে পালিয়ে যাওয়ার আগ মুহূর্তে ঢাকার বিমানবন্দর এলাকা থেকে ফাবিহা জেরিন তামান্না নামের ওই নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
সিআইডির দাবি, তামান্না ‘ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানির অংশীদার। তিনি একটি মানব পাচার চক্রেরও সদস্য। চক্রটি রাশিয়ায় মাসে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা বেতনে কাজের প্রলোভনে ১০ জনকে পাচার করেছে।
পরিবার জানায়, যশোরের হুমায়ুন কবির এবং তার দুলাভাই মো. রহমত আলী (৪৬) একসঙ্গে রাশিয়ায় যান।
রহমত নওগাঁর আত্রাই উপজেলার ইয়ার আলী মণ্ডলের ছেলে। তিনি শ্বশুর বাড়িতেই থাকতেন। হুমায়ুনরা দুই বোন এক ভাই। রহমত আলী তার ছোট দুলাভাই।
রহমত আলীই পরিবারকে জানিয়েছেন, চলতি বছরের ২৬ জানুয়ারি ইউক্রেইনের ড্রোন হামলায় হুমায়ুন মারা গেছেন। মৃত্যুর আশঙ্কায় তিনি পরিবারের কাছে আকুতি জানিয়েছেন।
এই পরিবারের ঘটনাটি স্থানীয় উপজেলা প্রশাসনও জানে। পরিবারের পক্ষ থেকে ছেলের লাশ এবং জামাতাকে সুস্থভাবে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে।
শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় এরই মধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে। উপজেলা প্রশাসন পরিবারটিকে ১০ হাজার টাকা সহায়তাও দিয়েছে।
উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে শোকগ্রস্ত পরিবারটি গভীর সমস্যার মধ্যে পড়েছে। বাড়িতে হুমায়ুন কবীরের স্ত্রী তারা খাতুন এবং এক মেয়ে ওজিহা প্রীতি রয়েছে।
২৬ জানুয়ারির পর থেকে পরিবারের সদস্যরা রাশিয়ায় অবস্থান করা রহমত আলীর সঙ্গে খুব একটা যোগাযোগ করতে পারছেন না। তবে বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে দালালদের সঙ্গে তাদের কথা হয়েছে। দালাল ও রহমত আলীর সঙ্গে পরিবারের কথোপকথনের বেশ কয়েকটি অডিও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম শুনেছে।
অবৈধ পথে যাত্রা
সম্প্রতি উপজেলার চৌগ্রাম ইউনিয়নের হুমায়ুন কবীরের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, একমাত্র ছেলের মৃত্যু আর মেয়ের জামাইকে ফিরে পেতে মা করীমুন বেগমের বুকফাটা আর্তনাদ যেন শেষ হচ্ছে না। ছেলে আর মেয়ে জামাইয়ের ছবি হাতে নিয়ে কান্না থামছেই না তার।
পরিবার জানায়, প্রতি মাসে আড়াই লাখ টাকা বেতনের আশ্বাসে ২০২৪ সালের ২৮ অক্টোবর ‘ড্রিম হোম ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম লিমিটেড’ নামের ঢাকার একটি কোম্পানি হুমায়ুন ও রহমতকে রাশিয়ায় নিয়ে যায়। প্রথমে তাদের ইউরোপের দেশ সাইপ্রাসে নিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও পরে তাদের রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়।
হুমায়ুনের মা করীমুন বেগম বলেন, “আমার ছেলে তো মারাই গেছে, এখন জামাইটা যেন ফিরে আসে। ছেলের লাশটা যেন দেশে ফিরে আসে সরকারের কাছে সেই দাবি জানাই।”
এ সময় পাশে বসা ছিলেন হুমায়ুনের স্ত্রী তারা খাতুন। তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বলছিলেন, “সোনা ও জমি বিক্রি করে বিদেশ গিয়েছিলেন প্রীতির বাবা। উনাকে হারিয়ে আমি একেবারে নিঃস্ব হয়ে গেছি। রহমত ভাই বারবার ফোন দিয়ে বাঁচানোর জন্য কাকুতি-মিনতি করছেন। কিন্তু দালালরা শুধু আশ্বাসই দিচ্ছে; কিন্তু ব্যবস্থা নিচ্ছে না।”
পরিবারটির দালালচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ হয় উপজেলার হুলহুলিয়া এলাকার সাইপ্রাস প্রবাসী সাখাওয়াতের মাধ্যমে। তিনি সাইপ্রাসের ভিসা দেওয়ার কথা বলে প্রথমে হুমায়ুন কবীর ও রহমত আলীর কাছ থেকে আড়াই লাখ টাকা দেন। পরিবার ঋণ করে সেই টাকা দেয়। কিন্তু ভিসা দিতে না পারায় পরে সাখাওয়াত সেই টাকা ফেরত দেন।
এরপর পরিবারটির যোগযোগ হয় সাখাওয়াতের আত্মীয় (সম্পর্কে নানা) আত্রাই উপজেলার মইনুর এলাকার বাসিন্দা শামীমের সঙ্গে। শামীম ঢাকার ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম লিমিটেডের মাধ্যমে লোক পাঠান। দুইজন সাইপ্রাসের ভিসার জন্য কোম্পানিটির স্বত্বাধিকারী এম এম আবুল হাসান আড়াই লাখ টাকা দেন। কিন্তু তিনিও সাইপ্রাসের ভিসা দিতে পারেননি।
রহমত আলীর স্ত্রী যমুনা বেগম বলেন, “এরপর আবুল হাসান রাশিয়ায় আড়াই লাখ টাকা বেতনে মালি ও কুক হিসেবে চাকরির ভিসার জন্য দুজনকে অফার দেন। তিনি দুজনের জন্য ১৮ লাখ টাকা জমা দিতে বলেন। পরে আমার স্বামী আর আমার ভাই জমি বিক্রি করে আবুল হাসানের প্রতিষ্ঠানে ১৮ লাখ টাকা জমা দেয়।”
২০২৪ সালের ১৮ অক্টোবরে রহমত আলী ও হুমায়ুন কবীরকে সৌদি আরবের ওমরা ভিসা দেওয়া হয়। কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওমরা শেষে তাদেরকে রাশিয়া নেওয়া হবে। সেই ভিসা নিয়ে দুলাভাই ও শ্যালক সৌদি আরবে যান। সেখানে তারা দুই মাস অবস্থান করেন।
যমুনা বলেন, “তারপর দালালরা আবার টাকার জন্য চাপ দিলে আমাদের সর্বশেষ সম্বল সোনার অলঙ্কার বিক্রি করে দুই লাখ ৭০ হাজার টাকা দেই। তখন তারা দুজনকে রাশিয়া পাঠায়।”
রাশিয়ায় যাওয়ার পর তাদের দুজনকে জোর করে যুদ্ধের জন্য প্রশিক্ষণে নিয়ে যাওয়া হয় দাবি করে যমুনা বেগম বলেন, “ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে আমার স্বামী ও ভাইকে জোর করে চুক্তিনামায় স্বাক্ষর করিয়ে ২০ দিন সেনা ট্রেনিং করানো হয়। আমাদের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে তারা বারবার বাঁচার আর্তনাদ জানায়। তখন আমরা কোম্পানির মালিক আবুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের দেশে ফেরানোর চেষ্টা করছে বলে জানান তিনি।
“এরপর ২৬ জানুয়ারি আমার স্বামী ফোন করে জানান, যুদ্ধে হুমায়ুন মারা গেছে। তিনি বাঁচানোর জন্য কান্নাকাটি করেন। ফোন দিয়ে কান্নাকাটি করে বলেন, ‘আমাকে বাঁচাও, আমাকে বাঁচাও’। পরে আবুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগ চেষ্টা করলে তিনি ফোন না ধরে ভয়েস ম্যাসেজে আবার চেষ্টা করছেন বলে জানান।”
রহমত আলীর স্ত্রী বলেন, “হুমায়ুনের এক মেয়ে ও বউ, আমার এক মেয়ে ও আমি। আর আমার মা ছাড়া আমাদের পরিবারের উপার্জনের মতো আর কোনো পুরুষ নেই। বাচ্চাদের দুধ কেনা, আমাদের সংসার চালানো এখন খুবই কঠিন হয়ে গেছে।
“সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন আমার ভাইয়ের মরদেহ এবং আমার স্বামীকে জীবিত যেন দেশে ফিরিয়ে আনেন। সরকার যদি আমাদের পাশে না দাঁড়ায় তাহলে আমাদের বিষ খাওয়া ছাড়া আর কোনো রাস্তা থাকবে না।”
হুলহুলিয়া গ্রামের বাসিন্দা নিহত হুমায়ুনের বড় দুলাভাই দুলাল তালুকদার বলেন, “রাশিয়ার যুদ্ধে অংশ নিতে তাদের জোর করে বাধ্য করা হয়। ২৬ জানুয়ারি ড্রোন হামলায় আমার শ্যালক হুমায়ুন কবীর মারা যান বলে ফোন করে বলে জানান রহমত আলী।”
‘সাংঘাতিক যুদ্ধ, আমরা টিক্যা থাকতে পারি না’
রহমত আলীর সঙ্গে তার পরিবার ও স্বজনদের কথোপকথনের অডিওতে সেখানকার পরিস্থিতি নিয়ে একটি ধারণা পাওয়া যায়।
সেগুলোর একটিতে রহমত আলী তার স্ত্রী যমুনা খাতুনকে বলছিলেন, “যে জাগা পাসপোর্ট আছে সেডা থ্রি ব্যাটালিয়ান, এই কতা হাসানেক বলো, এটি থেকি যেন লিয়্যা যায়। আমাক হেলমেট আর লাইফ জ্যাকেট দিছে। আবার কী ট্রেনিং কুরায় লেয় নাকি আল্লাহ জানে!
“আমাক এটি থেকা বাঁচাও, অ্যাজকে রাতের মধ্যেই ব্যবস্থা করি রাখো। কালক্যে সকালেই হয়তো আমাক লিয়্যা যাবি। বিটিড্যাক (মেয়েটাকে) দেখা রাইখো, যুদ্ধে লিয়্যা গেলে আর কথা কতে পারবো লা। হাসান (কোম্পানির মালিক) কুতা না শুনলে পুলিশ লিয়্যা যায়ো। ২০ লাখ টেকা করে লিয়্যা আমারে বেচে দিছে। আর বাঁচার উপায় নাই! আমাক এটি থেকা বাঁচাও।
রহমত বলেন, “দুরকার হয় হাসানের হাতে-পায়ে ধর্যা, যে আমরা পাঁচজন মহিলা মানুষ, যে আমি আছি আমার মাও আছে, দুডা ছওয়াল আছে, কে বাঁচাবি আমারেক, কে খাওয়াবি, সবকিছু কর্যা হাতে-পায়ে ধর্যা তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা করো। তোমার সাথে আমার এডাই শেষ কথা হতে পারে। ভালো থাইকো।”
আরেকটি কল রেকর্ডে রহমত আলী পরিবারের সদস্যদের বলছিলেন, “(হুমায়ুন) কবীর মারা গেছে তিনদিন আগে। এই যুদ্ধ সাংঘাতিক যুদ্ধ। আমরা টিক্যা থাকতে পারি না। আমি পলায় ছিলাম দেখা আমি ব্যাচে গেছি। আরেকবার গেলে হয়তো মরে যাবো। আপনারা সবাই মাফ করা দিয়েন।”
‘মেজর সাহেবকে বলতেছি, তোমারে যেন যুদ্ধে না নেয়’
২৬ জানুয়ারি হুমায়ুন কবীর যুদ্ধে মারা যাওয়ার খবর পেয়ে পরিবারটি ঢাকার ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম লিমিটেডের মালিক হাসান আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করে। সেদিন রাতে রহমত আলী তার স্ত্রী যমুনা খাতুনকে ফোন দেন। তখন পরিবারের সবাই তার সঙ্গে কথা বলেন। যমুনা খাতুন সেসময় হাসান আলীকে আরেকটি ফোনে সংযুক্ত করেন; সেসময় তার সঙ্গে রহমত আলীরও কথা হয়। সেই কল রেকর্ডও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম শুনেছে।
তিনজনের সেই কথোপকথন ছিল এরকম-
রহমত আলী: “নানা, আমার শালা মারা গেছে। কালকি হয়ত আমিও মারা যাব।”
আবুল হাসান: “না, না। আপনি মারা যাবেন নানি ইনশাআল্লাহ। আমিনুল কি আপনার কাছ?”
রহমত আলী: “না, কেউ নাই। খালি আমি একা বাংলাদেশি।”
হাসান আলী: “কবির ভাইয়ের লাশ কোন জায়গায়?”
রহমত আলী: “ওই যুদ্ধের ওটিউ আছে। আমাক আজকে লি আইছে, কালকে আবার লিয়্যা যাবি।”
আবুল হাসান: “সরাসরি যুদ্ধ হচ্ছে ওইখানে?”
রহমত আলী: “সরাসরি যুদ্ধ হচ্ছে, বন্দুকযুদ্ধ, ওপর থেকা গ্রেনেড পড়ে, গ্রেনেডে মারিচ্চে। ড্রোন দিয়া মারিচ্চে।”
যমুনা খাতুন: “আমার স্বামীক বাঁচান, লাশ লিয়া আসার ব্যবস্থা করেন।”
আবুল হাসান: “এখনি ফোন দিয়ে বলতেছি, যেন যুদ্ধে না নেয়। আমি মেজর সাহেবরে এখনি বলতেছি বলার জন্য। লাশ আনা, ক্ষতিপূরণ আর রহমত ভাইকে সুস্থভাবে বাংলাদেশে ফেরত আনার কথা বলতেছি।”
এই অডিওতে আরও দুজন ছিলেন। একজন যমুনা খাতুনের ভাগনে দুর্জয় তালুকদার এবং ভাগনি দিনামনি। তারাও তাদের খালুকে বাঁচাতে কাকুতি-মিনতি করেন।
সোমবার বিকালে কথা হলে যমুনা খাতুন বলেন, ২৬ জানুয়ারির পর স্বামীর সঙ্গে তাদের আর তেমন কোনো কথা হয়নি।
তিনি বলেন, “ক্যাম্পের যাদের কাছে ফোন ছিল সব কেড়ে নিছে। উনার ফোনটা লুকায় রাখছে। বাঁচানোর কথা বলে দুই-একটু ভয়েস টেক্সট পাঠিয়েছে, কথা আর হয়নি।”
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সরাসরি রহমত আলীর সঙ্গে কথা বলতে পারে কি-না, এমন কোনো যোগাযোগ নম্বর আছে কি-না জানতে চাইলে যমুনা খাতুন বলেন, “আমাদের সঙ্গেই তো এখন কথা হয় না, তাহলে আপনারা কথা বলবেন কীভাবে?”
উপজেলার হুলহুলিয়া সামাজিক উন্নয়ন পরিষদটি স্থানীয়ভাবে খুবই শক্তিশালী। স্থানীয়দের নানা বিষয় নিয়েই সেটি কাজ করে। এলাকার মানুষের ভোটের মাধ্যমে এই সংগঠনটির নেতৃত্বে নির্বাচিত হয়।
হুমায়ুন কবীর নিহত হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই সংগঠনটির চেয়ারম্যান আমিনুল মণ্ডল পরিবারটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।
তিনি বলছিলেন, “আমরা তাদের পাশে রয়েছি। দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ এবং হুমায়ুন কবিরের মরদেহ এবং রহমত আলীকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি করছি।”
চৌগ্রাম ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ৫ অগাস্ট সরকার পতনের পর থেকে পালাতক। তার মোবাইল ফোনে বার বার কল করা হলেও তিনি তা ধরেননি।
ঢাকার ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরিজম লিমিটেডের মালিক হাসান আলীর একটি মোবাইল নম্বরে কল করলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়।
দালাল হিসেবে পরিচিত নওগাঁর আত্রাইয়ের শামীমকে (নানা) মোবাইলে বার বার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি।
এসব অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সাইপ্রাস প্রবাসী সাখাওয়াতের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো মাধ্যম পাওয়া যায়নি।
‘যুদ্ধক্ষেত্রে’ জাফর, দুঃশ্চিন্তায় পরিবার
যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়ার সরদারপাড়ার খায়রুল সরদারের ছেলে জাফর হোসেনকেও রাশিয়ায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ করেছে পরিবার।
জাফরকেও অন্যদের মত প্রথমে সৌদি আরব, পরে দুবাই হয়ে রাশিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। প্রথমে জাফরকেও সাইপ্রাসে পাঠানোর কথা বলেছিল এজেন্সি। কিন্তু পাঠাতে না পেরে দুই বছর পর রাশিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আতঙ্কগ্রস্ত জাফর পরিবারকে বিপদে থাকার কথা বলেছেন।
বাড়িতে জাফরের বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই ছেলে, এক মেয়ে রয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় জাফর সেনা পোশাক পরিহিত অবস্থায় ছবি পাঠায়।
জাফরের বাবা খায়রুল সরদার বলছিলেন, পাঁচ মাস আগে ঢাকার একটি এজেন্সির মাধ্যমে সাইপ্রাসে যাওয়ার উদ্দেশে বাড়ি ছাড়েন জাফর। এজন্য তাকে দিতে হয় নয় লাখ টাকা। কিন্তু দালালরা প্রথমে তাকে সৌদি আরবে নিয়ে দুই মাস রাখে। এরপর দুবাই নিয়ে যায়।
“তারপর ছেলেকে বিক্রি করে দিয়েছে। এখন রাশিয়ায় রয়েছে। রাশিয়ায় যাওয়ার পর বলা হয়, আর্মিদের কাপড় পরিষ্কার করতে হবে। কিন্তু তাদের নিয়ে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিয়ে যুদ্ধে পাঠাচ্ছে।”
খায়রুল সরদার বলেন, “এখন ছেলে কান্নাকাটি করছে। সে জানিয়েছে, যুদ্ধ করতে গিয়ে বাংলাদেশি একজন মারা গেছে এবং একজন আহত হয়েছে। আমার ছেলে এখন বাংলাদেশে ফিরে আসতে চাইছে। না হলে তার মৃত্যু হবে বলে জানিয়েছে।”
খায়রুল ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
এদিকে স্বামীকে নিয়ে দুঃচিন্তার মধ্যে সময় কাটছে জাফরের স্ত্রী খাদিজা খাতুনের। তিনি স্বামীর ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত বলেও জানান।
খাদিজা খাতুন সোমবার বলেন, “আমার স্বামী অনেক কষ্টে আছে। আমার স্বামীকে ফিরে পেতে চাই আমি। ৪-৫ দিন আগে আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। সে বলেছে, আমার সন্তান দুটোকে তুমি দেখে রেখো। সরকারের কাছে একটাই দাবি, আমার স্বামীকে আমি ফিরে পেতে চাই।”
পরিবার জানায়, জাফরের মামাতো ভাই মাহাবুবুর রহমানের মাধ্যমে ঢাকার জনশক্তি রপ্তানিকারক একটি কোম্পানির সঙ্গে তাদের পরিচয় হয়। তবে মাহাবুবুর সেটি অস্বীকার করেছেন।
মাহবুবুর রহমানের ভাষ্য, “ঢাকার হাজি ক্যাম্প এলাকার তামান্না নামে এক মহিলার সঙ্গে যোগাযোগ করে বনানীর ৪ নম্বর রোডের ‘হাসান এজেন্সির’ (ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরসের মালিক আবুল হাসান) মাধ্যমে বিদেশে গেছে জাফর।”
তবে প্রক্রিয়াটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জানিয়ে তিনি বলেন, “সাইপ্রাসে না হওয়ার কারণে দুই বছর পর এজেন্সি বলে, রাশিয়ায় লোক যাচ্ছে, রাশিয়ায় পাঠাবে। আমরা বলি, রাশিয়া যুদ্ধের দেশ, ওই জায়গা তো নিরাপদ না। তখন তারা বলে, নিরাপদ আছে। ওই জায়গায় ক্লিনারের কাছ করবে। যুদ্ধের কাহিনী ওরা দেখতে পারবে না, জানবেও না। এইভাবে নিয়ে যাওয়ার পরে এখন বিপদে পড়েছে।
“তারা এখন অস্ত্র হাতে ট্রেনিং দিয়েছে। এখন সে (জাফর) মাটির নিচে ব্যাংকারে আছে। এখন সে মৃত, নাকি বেঁচে আছে, কোনো খোঁজ-খবর পাচ্ছিনে পাঁচ দিন ধরে।”
মাহবুব দাবি করেন, “জাফরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পরিবারের পক্ষ থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে।”
বন্ধ ট্রাভেল এজেন্সি, লাপাত্তা দালাল
বনানীর ৪ নম্বর সড়কের একটি বাড়ির নিচতলার দুটো কক্ষ নিয়ে ‘ড্রিম হোম ট্রাভেলস অ্যান্ড ট্যুরস লিমিটেড’ এর কার্যালয়। তবে ওই কোম্পানির মালিক এম এম আবুল হাসান প্রায় এক মাস ধরে কার্যালয়ে আসছেন না বলে জানালেন ভবনের নিরাপত্তারক্ষী মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ।
সত্তরোর্ধ্ব শহীদুল্লাহ নয় বছর ধরে ওই বাড়িতে নিরাপত্তারক্ষীর কাজ করছেন। তিনি বলছেন, “ওই আদম অফিসের মালিক আসতাছে না দেইখা কর্মচারীরাও আসে না। রুম দুইটায় তালা লাগায় গ্যাছেগা হেরা।”
ভিজিটিং কার্ডে ‘জননী গ্রুপের’ নয়টি সহযোগী প্রতিষ্ঠান থাকার কথা জানিয়ে এই বাড়িকেই করপোরেট কার্যালয়ের ঠিকানা হিসেবে দেখানো হয়েছে। বাস্তবে পুরনো এই বাড়িটির নিচতলার দুটো কক্ষ নিয়ে কার্যালয় তাদের। ভবনের ভেতরে ঢুকতেই ‘ড্রিম হোম ট্রাভেলস’ এর বিরাট বড় সাইনবোর্ড টাঙানো। ভেতরে গিয়ে দেখা গেল, দুটো কক্ষের কার্যালয়ের একটিতে বসতেন জননী গ্রুপের চেয়ারম্যান এম এম আবুল হাসান। এই জননী গ্রুপের একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠান ‘ড্রিম হোম ট্রাভেলস’।
এখানে কতদিন ধরে ‘ড্রিম হোম ট্রাভেলস’ এর কার্যালয় জানতে চাইলে ভবনের নিরাপত্তারক্ষী শহীদুল্লাহ বলেন, “ওই আদম কোম্পানির মালিকে আগে ২৫ নম্বর বাড়িতে প্রায় ২০ বছর ধইরা অফিস চালাইছে। সাত বছর হইছে আমাগো এই বিল্ডিংয়ে আইসা উঠছে। একমাস আগেও এই অফিসে অনেক লোকজন আসত। কিন্তু কয়দিন ধইরা এক্কেবারে ফাঁকা।”
কারা আসে এখানে জানতে চাইলে শহীদুল্লাহ বলেন, “এইহানে আহেতো অনেক লোকে। একেকজন একেক দ্যাশে যাইবার চায়।”
এখান থেকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে লোক পাঠানোর কথা শুনেছেন কি-না জানতে চাইলে শহীদুল্লাহ বলেন, “যারা গ্যাছে তারা সব জাইনা-শুইনাই গ্যাছে। ওইখানে গিয়া ট্রেনিং নেওয়ার পর হ্যাগোরে ২০ লাখ কইরা ট্যাকা দেওয়া হইব পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য, এইটা শুইনা লোভে পড়ছে। অনেকে ট্রেনিং কইরা বাড়িতে সেই ট্যাকা পাঠাইছে বইলাও হ্যাগো কাছে শুনছি। মাইনষের লোভ বড় খারাপ। এহন যুদ্ধে মানুষ মরার পর দোষ হইছে আদমের (পাচারকারীর)।”
এজেন্সির ভিজিটিং কার্ডে যেসব মোবাইল নাম্বার দেওয়া আছে, সেগুলোও বন্ধ যায়।
প্রশাসন যা বলছে
সিংড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাজহারুল ইসলাম বলেন, “নিহতের পরিবারকে তাৎক্ষণিক ১০ হাজার টাকা আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। আরও লাগলে ধাপে ধাপে দেওয়া হবে। ঊধ্বর্তন কতৃপক্ষকে আমরা জানাচ্ছি। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জেলা শাখায় আমরা কথা বলেছি, তারাও একটা আবেদন করে দেবে। আমরা তাদের পাশে আছি, পরিবারটিকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে।”
নাটোরের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, “প্রতারণার শিকার নিহতের স্বজনরা লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের জেলা শাখার কর্মকর্তাদের সঙ্গে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে কথা হয়েছে। এ ছাড়া সিংড়ার ইউএনওকে এ বিষয়ের প্রয়োজনী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কথা বলে তাদের বিষয়টি বিশেষভাবে জানিয়েছি। সচিব স্যারেরা এরই মধ্যেই কাজ শুরু করেছেন।”
নাটোর জেলায় কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, “দালালের খপ্পরে পড়ে রাশিয়ায় গিয়ে যুদ্ধে হূমায়ুন কবির নিহত হয়েছেন। তার সফরসঙ্গী দুলাভাই রহমত আলী সেখানে আটকা পড়েছেন এমন একটি অভিযোগ তাদের স্বজনদের কাছ থেকে পেয়েছি। আমরা এটি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে পাঠাচ্ছি।
“মানবিক এই বিষয়টি নিয়ে আমাদের জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন গতকালই (রোববার) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. রুহুল আমিন স্যারের সঙ্গে কথা বলেছেন।”
[প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক গোলাম মুর্তুজা অন্তু ও নিজস্ব প্রতিবেদক মাছুম কামাল।]