Published : 07 Oct 2025, 04:09 PM
কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা নিয়ে যাদের গবেষণা কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি, কোয়ান্টাম কম্পিউটার ও কোয়ান্টাম সেন্সরের উন্নয়নের দুয়ার খুলে দিয়েছে, সেই তিন বিজ্ঞানী পাচ্ছেন চলতি বছরের পদার্থবিদ্যার নোবেল।
মঙ্গলবার সুইডেনের স্টকহোমে এক সংবাদ সম্মেলনে এই পুরস্কারের জন্য মার্কিন গবেষক জন ক্লার্ক, মিশেল দেভোরে এবং জন মার্টিনিসের নাম ঘোষণা করেছে রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অফ সায়েন্সেস।
নোবেল কমিটি বলেছে, বর্তমানে এমন কোনো উন্নত প্রযুক্তি নেই, যা কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ওপর নির্ভর করে না। মোবাইল ফোন ক্যামেরা থেকে শুরু করে ফাইবার অপটিক কেবলের মতো প্রযুক্তিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে কোয়ান্টাম মেকানিক্স।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজে জন্মগ্রহণকারী ও যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলে’তে কর্মরত জন ক্লার্ক তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, “খুব সহজ করে বললে, আমার জীবনের সবচেয়ে বড় চমকের বিষয় নোবেল পুরস্কার জেতা।”
পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পাওয়া আরেক বিজ্ঞানী মিশেল দেভোরে জন্মগ্রহণ করেছেন ফ্রান্সের প্যারিস শহরে এবং বর্তমানে তিনি ‘ইয়েল ইউনিভার্সিটি’তে অধ্যাপক হিসেবে কাজ করছেন।

অন্যদিকে, জন এম মার্টিনিস ‘ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, সান্তা বারবারা’র অধ্যাপক।
নোবেল পুরস্কারের ১ কোটি ১০ লাখ সুইডিশ ক্রোনার সমানভাবে ভাগ করে নেবেন তারা।
১৯৮০-এর দশকে বৈদ্যুতিক সার্কিট নিয়ে করা একাধিক পরীক্ষায় এই তিনজন বিজ্ঞানীর যুগান্তকারী কাজকে এ বছর স্বীকৃতি দিয়েছে নোবেল কমিটি।
কমিটি বলেছে, “বৈদ্যুতিক সার্কিটে বড় পরিসরে কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং ও শক্তি সবসময় নির্দিষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান থাকার মতো ঘটনা। অর্থাৎ বড় বিভিন্ন বৈদ্যুতিক সার্কিট কীভাবে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের নিয়ম মেনে কাজ করে তা উঠে এসেছে তাদের উদ্ভাবনে।”
বিবিসি লিখেছে, কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এ উদ্ভাবন অনেকের কাছে বিভ্রান্তিকর শোনাতে পারে। তবে এর গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে।
যেসব ইলেকট্রনিক ডিভাইস মানুষ রোজ ব্যবহার করছে, সেগুলো এই নীতির ওপর নির্ভর করেই তৈরি। বর্তমানে শক্তিশালী বিভিন্ন কম্পিউটার তাদের এই উদ্ভাবনের ওপর ভিত্তি করেই তৈরি হচ্ছে।
নোবেল পুরস্কার জেতার বিষয়টি জানার পর অধ্যাপক ক্লার্ক টেলিফোনে বলেন, “এটা এমন কিছু, যা কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির পথ খুলে দিয়েছে। অনেকেই এখন কোয়ান্টাম কম্পিউটিং নিয়ে কাজ করছেন। আর আমাদের উদ্ভাবন অনেক দিক থেকেই তার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে।”

চার দশক আগে শেষ করা গবেষণার জন্য বর্তমানে বিজ্ঞান জগতের সর্বোচ্চ সম্মান নোবেল পুরস্কার পাওয়ার কথা শুনে খানিকটা বিস্মিত হয়ে ক্লার্ক বললেন, “আমি হতবাক। ওই সময় আমরা একেবারেই বুঝতে পারিনি যে, এই কাজ একদিন নোবেল পুরস্কারের যোগ্য হতে পারে।”
কোয়ান্টাম মেকানিক্স অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণার আচরণ নিয়ে কাজ করে। এই ক্ষুদ্র কণা জগতে রয়েছে ইলেকট্রনের মত কণা, যা কীভাবে চলে, কীভাবে শক্তি নেয় বা ছাড়ে এসব বিষয়।
অধ্যাপক ক্লার্ক ও তার গবেষণা দল দেখেছেন, এসব ছোট ছোট কণা কখনও কখনও এমন কাজ করতে পারে, যা প্রচলিত বলবিদ্যা দিয়ে ব্যখ্যা করা অসম্ভব। যেমন এরা শক্তির কোনো বাধা বা বাধার মত কিছু থাকলেও তা পেরিয়ে যেতে পারে, যাকে বলে ‘টানেলিং’। কীভাবে এমনটি ঘটে তা খুঁজে বের করেছিলেন তারা।
কোয়ান্টাম ‘টানেলিং’ এর মাধ্যমে কোনো পদার্থে ইলেকট্রন শক্তির বাধা পেরিয়ে অন্য পাশে চলে যেতে পারে। কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এ অদ্ভুত ঘটনা কেবল পরমাণু বা খুব ছোট কণা জগতেই ঘটে না, বরং ‘বাস্তব জগতের’ বৈদ্যুতিক সার্কিটের মধ্যেও তৈরি করা যেতে পারে।

তাদের এই জ্ঞানকে আধুনিক কোয়ান্টাম চিপ তৈরিতে কাজে লাগিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
‘ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন’-এর পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী প্রোভোস্ট অধ্যাপক লেসলি কোহেন বলেন, “সত্যিই দারুণ খবর এটি। তাদের এ কাজ নোবেল পুরস্কার পাওয়ারই যোগ্য।
“কোয়ান্টাম প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান হার্ডওয়্যার প্রযুক্তি সুপারকন্ডাক্টিং কিউবিটের ভিত্তি স্থাপন করেছে তাদের এ গবেষণা।”
গতবছর পদার্থের নোবেল পেয়েছিলেন ‘মেশিন লার্নিং’ এর দুই পথিকৃত যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞানী জন জে হপফিল্ড এবং কানাডার গবেষক জেওফ্রে ই হিন্টন।
বরাবরের মতই চিকিৎসা বিভাগের পুরস্কার ঘোষণার মধ্য দিয়ে সোমবার চলতি বছরের নোবেল মৌসুম শুরু হয়। বুধবার রসায়নে চলতি বছরের নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণার পর বৃহস্পতিবার আসবে সাহিত্যের নোবেল ঘোষণা। এরপর শুক্রবার শান্তি এবং আগামী ১৩ অক্টোবর অর্থনীতিতে এবারের নোবেল বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে।
১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে বিজয়ীদের হাতে নোবেল পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।