০৯ অক্টোবর ২০২৬, ২৪ আশ্বিন ১৪৩৩

খুলনায় বেড়িবাঁধে ভাঙন, আতঙ্কে হাজারো পরিবার

“নদী ভাঙায় আমরা একটু ভেতরের দিকে এসে নতুন করে ঘর তুলেছিলাম, কিন্তু বর্তমানে আবার যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে, মনে হচ্ছে এখানেও আর থাকা হবে না।”

খুলনায় বেড়িবাঁধে ভাঙন, আতঙ্কে হাজারো পরিবার

খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের খোনা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধে ভাঙন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 09 Oct 2026, 06:32 PM

Updated : 09 Oct 2026, 06:31 PM

“প্রায় ৩০ বছর ধরে ভাঙন দেখে আসছি। প্রতি বছরই দু-একবার বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢোকে। ভাঙতে ভাঙতে নিজের পরিবারসহ আশপাশের বহু মানুষের ঘরবাড়ি ও প্রায় ৩০০ বিঘা ফসলিজমি ঢাকি নদীর পেটে চলে গেছে।”

আক্ষেপ করে কথাগুলো বলছিলেন খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের খোনা এলাকায় নদী ভাঙনের শিকার লিটন মোল্লা। তার বাড়ির সামনে দিয়ে বয়ে গেছে ঢাকি নদী। ভাঙন থেকে রক্ষায় নদীতে রয়েছে বেড়িবাঁধ।

সম্প্রতি সেই বাঁধে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে খোনার মোল্লা বাড়ির আশপাশের হাজারো পরিবার ও কৃষক তাদের আমন ফসল নিয়ে চরম আতঙ্কে রয়েছেন।

খবর পেয়ে খোনা মোল্লা বাড়ি সংলগ্ন এলাকাসহ বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করেছেন খুলনা পানি উন্নয়ন বোর্ড (বিভাগ-২)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাশিদুর রহমান। বলেন, “খুব শীঘ্রই এসব এলাকায় কাজ শুরু করা হবে।”

পূর্বে নদী ভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো লিটন বলেন, “নদী ভাঙায় আমরা একটু ভেতরের দিকে এসে নতুন করে ঘর তুলেছিলাম, কিন্তু বর্তমানে আবার যেভাবে ভাঙন শুরু হয়েছে, মনে হচ্ছে এখানেও আর থাকা হবে না।”

পানখালী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য রাশেদুল ইসলাম বাবু বলেন, ২ অক্টোবর খোনা মোল্লা বাড়ির সামনের বেড়িবাঁধে ফাটল ধরে। এর মধ্যে রাস্তার অর্ধেক অংশ নদীতে চলে গেছে।

বাবুর অভিযোগ, পানি উন্নয়ন বোর্ডকে পরিস্থিতি অনেক বার জানানোর পরও তারা দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেননি। এলাকার কয়েক হাজার মানুষ আতঙ্কে রাত কাটাচ্ছেন। দ্রুত টেকসই ব্যবস্থা না নিলে পুরো এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাবে।

নয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত নদীবেষ্টিত দাকোপ উপজেলা মূলত তিনটি দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত। পানি উন্নয়ন বোর্ড ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী এই তিনটি দ্বীপকে ৩১, ৩২ ও ৩৩ নম্বর পোল্ডারে বিভক্ত করেছে।

৩১ নম্বর পোল্ডারের আওতায় পানখালী ইউনিয়নের খোনা মোল্লা বাড়ির সামনের বেড়িবাঁধের প্রায় ১০০ মিটার রাস্তার বেশ কিছুটা অংশ ধসে ঢাকি নদীতে বিলীন হয়েছে। বাঁধটি যেকোনো মুহূর্তে পুরোপুরি ভেঙে বিস্তৃত এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

এ ছাড়া উপজেলার পানখালী ইউনিয়নের জাবেরের খেয়াঘাট, তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের কামিনীবাসিয়া, গড়খালী আন্দারমানিক, সুতারখালি ইউনিয়নের গুনারীর কালিবাড়ি লঞ্চঘাট, কালাবগী মডেল বাজারসহ বেশ কয়েকটি স্থানে বেড়িবাঁধে ফাটল দেখা দিয়েছে।

ভাঙন অব্যাহত রয়েছে- বাণীশান্তা ইউনিয়নের বাণীশান্তা যৌনপল্লী ও রেখামারি, সুতারখালি ইউনিয়নের কালাবগী বাজার, আমিনুর সানার বাড়ির সামনে, তেলিরকোনা বাজারের দক্ষিণ পাশে, কাছারী বাড়ি, তিলডাঙ্গা ইউনিয়নের কামনীবাসিয়ার গাইন বাড়ির সামনে এলাকায়।

নদী পাড়ের বাসিন্দারা বলছেন, দুর্যোগ ছাড়াও কোনো কোনো সময় অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারেও বাঁধ ভেঙে ক্ষতির শিকার হন তারা। প্লাবিত হয় বিস্তীর্ণ এলাকা। ভাসিয়ে নেয় হাজারো মানুষের বসতি, কেড়ে জীবন-জীবিকা। নিঃস্ব হয় মানুষ।

বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রতি বছরই উপজেলার কোনো না কোনো এলাকার বেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়, আর পানি উন্নয়ন বোর্ড নামমাত্র জোড়াতালি দিয়ে তা মেরামত করে। গত বছর বটবুনিয়া এলাকায় বাঁধ ভেঙে বহু কৃষকের রোপা আমন খেত ও পুকুরের মাছ ভেসে গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পিত ও স্থায়ী টেকসই বাঁধ নির্মিত না হওয়ায় প্রতিবছরই ভাঙন দেখা দেয়। আর বেড়িবাঁধ সংস্কার ও প্রকল্পের নামে চলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের লাগামহীন দুর্নীতি ও লুটপাট।

দাকোপ উপজেলা সদরের বাসিন্দা সাবেক ছাত্রনেতা আফজাল হোসেন খান বলেন, “যখন জোয়ারের পানি বাঁধ উপচে পড়ার উপক্রম বা বাঁধ ভেঙে যায়, তখনই ‘জরুরি পরিস্থিতি’র বাঁধ মেরামতে উদ্যোগ নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড।

“এক্ষেত্রে লাভ হয় পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা আর ঠিকাদারদের। কারণ, মানুষ তখন জন্মভিটায় টিকে থাকার স্বার্থে স্বেচ্ছাশ্রমে রিং-বাঁধ দেয়, অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা এসব কাজের কোটি কোটি টাকা ব্যয় দেখান।”

আফজালের অভিযোগ, বেড়িবাঁধ নির্মাণে বাঁধের খুব কাছ থেকে মাটি কাটা হয়। সেই মাটির সঙ্গে স্থানীয় নদীর বালু এবং কিছু মানহীন জিওব্যাগ ফেলেই দায় সারাভাবে এক একটি প্রকল্পের কাজ শেষ করে কোটি কোটি টাকা লোপাট করা হচ্ছে।

অপরিকল্পিত ও নিম্নমানের কাজের কারণে তা দ্রুত নষ্ট হয়ে প্রতিবছরই নতুন সংকট তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন সাবেক এই ছাত্রনেতা।

দুর্যোগপ্রবণ এই এলাকার উন্নয়নে সরকারি প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে জানিয়ে দাকোপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বোরহান উদ্দিন মিঠু বলেন, “বাঁধ ভেঙে যেন এলাকা প্লাবিত হতে না পারে এবং মানুষের জানমালের ক্ষতি না হয়, সেজন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত বাঁধ সংস্কারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।”