চৌদ্দগ্রামে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ১২ যাত্রীছাউনি বেহাল

কোনো কোনো ছাউনির মধ্যে বসেছে ভ্রাম্যমাণ দোকান; কোনোটিতে চলছে ইট-বালুর ব্যবসা; কোনোটির ছাউনির টিন খুলে নিয়েছে স্থানীয়রা।

আবদুর রহমানকুমিল্লা প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 29 July 2022, 04:37 PM
Updated : 29 July 2022, 04:37 PM

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের প্রায় ৪৪ কিলোমিটার পড়েছে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার অংশে। যাত্রীদের সুবিধার্থে এ অংশে নির্মাণ করা হয় ১২টি যাত্রীছাউনি। এসব ছাউনি ইতোমধ্যে দখলে নিয়েছে দোকারদার ও স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, কোনো কোনো ছাউনির মধ্যে বসেছে ভ্রাম্যমাণ দোকান। কোনোটির ভেতরে ও সামনে ইট-বালু রেখে ব্যবসা করছে কেউ কেউ। কোথাও যাত্রী ছাউনির টিন খুলে নিয়ে নিয়েছে স্থানীয়রা। ব্যবহার না থাকায় জমেছে ময়লা-আবর্জনার স্তূপ।

মহাসড়কে চলাচলকারী যাত্রী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হাইওয়ে পুলিশসহ প্রশাসনের নজরদারি না থাকায় নির্দিষ্ট ছাউনিগুলোর সামনে কোনো গাড়ি থামে না। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে যত্রতত্র যানবাহন থামিয়ে যাত্রী ওঠানামা করানো হচ্ছে।

বিশেষ করে, লোকাল বাসগুলো প্রতিটি বাজার এলাকায় মহাসড়কে দীর্ঘ সময় গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলে। এতে একদিকে বাজারে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট, অন্যদিকে দূরপাল্লার দ্রুতগতির গাড়ি চলাচলে সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। এসব কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি মানুষের ভোগান্তিও হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চৌদ্দগ্রামের লালবাগ রাস্তার মাথা, মিয়ার বাজার, নোয়াবাজার, ছুপুয়া, দৌলবাড়ি, সৈয়দপুর, নাটাপাড়া, উপজেলা সদরের চৌদ্দগ্রাম সরকারি হাসপাতালের সামনে, বাতিসা বাজার ও বাতিসা নতুন সড়কে, চিওড়া, ফকির বাজার ও জগন্নাথদিঘি এলাকায় তৈরি করা হয়েছিল ১২টি যাত্রীছাউনি।

সরেজমিনে বাতিসা বাজার এলাকায় নির্মিত ছাউনিটিতে গিয়ে দেখা যায়, এক ব্যক্তি ছাউনির ভেতর পান-সিগারেটের দোকান নিয়ে বসেছেন। ছাউনির পেছনের বেড়ার টিনগুলো খুলে নিয়েছে কে বা কারা। চৌদ্দগ্রাম সরকারি হাসপাতালের সামনে নির্মিত যাত্রীছাউনিতে ইট-বালু রেখে ব্যবসা করছেন স্থানীয় প্রভাবশালী এক ব্যক্তি। এ ছাড়া অন্য ছাউনিগুলোও বিভিন্নভাবে অপব্যবহার হচ্ছে। চুরি হয়ে গেছে টিনসহ অনেক সরঞ্জাম।

উপজেলা প্রশাসনের চোখের সামনে এসব ঘটলেও এনিয়ে কারো যেন মাথা ব্যথা নেই।

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেন হওয়ার সময় সড়ক লাগোয়া বাজারগুলোর একপাশে কিছু জায়গা প্রশস্ত রাখা হয়েছিল। পরে এসব স্থানে নির্মাণ করা হয় যাত্রীছাউনি। বাজারের এক পাশে বাসস্ট্যান্ড ও ছাউনি তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল মূলত দ্রুতগতির যানবাহনের বাধাহীন চলাচল এবং যাত্রীরা যেন নিরাপদে যানবাহনে ওঠানামা করতে পারেন সেজন্য।

সরেজমিনে মহাসড়কের ব্যস্ততম চৌদ্দগ্রাম বাজার এলাকা ঘুরে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে বাজারের ভেতরে কোনো যাত্রীছাউনি তৈরি করা হয়নি। ছাউনি তৈরি করা না হলেও বাসস্ট্যান্ডের জন্য আলাদা করে জায়গা রাখা হয়েছিল। কিন্তু ওই জায়গাকে স্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহার না করে মহাসড়কের উপর বাস থামিয়ে যাত্রী উঠানামা করানো হচ্ছে। ফলে দ্রুতগতির গাড়িগুলোর গতি কমে অনেক সময় যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।

উপজেলার মিয়ার বাজারে মহাসড়কের উপর প্রতিদিন শতশত যাত্রীবাহী গাড়ি থামানো হচ্ছে। যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট স্ট্যান্ড ও যাত্রীছাউনি এলাকাটি ভ্যান, মাইক্রোবাস, নছিমন ও ভাসমান ব্যবসায়ীরা দখল করে রেখেছেন।

চৌদ্দগ্রাম সদরের জামে মসজিদ রোড থেকে ফেনী যেতে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করা যাত্রী আবুল কালাম বলেন, “যাত্রী ছাউনির কাছে বাস থামানোর কথা সাইন বোর্ডে লেখা থাকলেও চালকরা সেখানে গাড়ি থামান না। ফলে যাত্রীরা যেখানে পারছেন সেখান থেকেই গাড়িতে উঠছেন। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়লেও কিছু করার থাকে না।”

কুমিল্লা-ফেনী-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী একটি পরিবহনের চালক রুস্তম মিয়া বলেন, “বাজারগুলোতে নির্দিষ্ট স্টপেজ করা থাকলেও যাত্রীরা তাদের সুবিধামতো স্থানে ওঠানামা করতে চায়। ফলে যাত্রীরা যেখানে বলে গাড়ি সেখানেই থামাতে হয়। এ ছাড়া এ নিয়ে হাইওয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের কোনো নির্দেশনা পাইনি আমরা। তবে সব যাত্রী নির্দিষ্ট স্টপেজে অপেক্ষা করলে চালকরা বাধ্য হয়ে ওই জায়গায় গাড়ি থামাতেন।”

চৌদ্দগ্রামের একটি স্কুলের শিক্ষিকা পারভীন আক্তার কুমিল্লা নগরী থেকে প্রতিদিন আসা-যাওয়া করেন। তার ভাষ্য, “যাত্রী ছাউনি থাকলে কী হবে; সেখানে বাস থামে না। যাত্রী ওঠানামা করে মহাসড়কের মধ্যেই। ফলে রোদ-বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এসব ছাউনি আমাদের কোনো কাজে আসছে না।”

চৌদ্দগ্রাম বাজার পরিচালনা কমিটির সভাপতি আক্তার হোসেন পাটোয়ারী বলেন, “চৌদ্দগ্রাম বাজারের মাঝখানে গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে যানজট ও মানুষের দুর্ভোগ সৃষ্টি করে। এ ছাড়া বাজারের হায়দার মার্কেটের সামনে জায়গা নির্ধারণ করা হলেও চালকরা সেখানেও গাড়ি থামান না; যে কারণে চৌদ্দগ্রাম বাজারে প্রতিদিনই যানজট লেগে থাকে। এ সমস্যা সমাধানে হাইওয়ে পুলিশ ও প্রশাসনের কোনো ভূমিকা আমরা দেখিনি। আমরা এসব সমস্যার সমাধান চাই।”

বাজার এলাকায় উভয় লেনে আরও দুইটি যাত্রীছাউনি নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে করছেন তিনি।

জানতে চাইলে মিয়ারবাজার হাইওয়ে থানার ওসি একেএম মঞ্জুরুল হক আখন্দ বলেন, “এ সমস্যাটি আমার জানা নেই। শিগগিরই বিষয়টি পযবের্ক্ষণ করে দেখব। আর নির্দিষ্ট স্থানে বাস না দাঁড়িয়ে বাজারগুলোতে যান চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির কোনো সুযোগ নেই। এমনটা হয়ে থাকলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।”

চৌদ্দগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর হোসেন বলেন, “কয়েকটি যাত্রীছাউনি সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আর নির্দিষ্ট স্থানে বাস না থামায় যাত্রীছাউনিগুলো ব্যবহার হচ্ছে না। আগামী আইনশৃঙ্খলা সভায় থানা ও হাইওয়ে পুলিশকে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হবে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক