নিয়োগে অনিয়ম: সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা

নিয়োগে নানা অনিয়মের বিষয়টি নিয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে ইউজিসি ও দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্তে নামে।

সিলেট প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 3 April 2024, 05:45 AM
Updated : 3 April 2024, 05:45 AM

সিলেটের বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য, ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারসহ ৫৮ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সোমবার বিকালে নিয়োগে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের কাছে মামলাটি করেন দুদকের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের উপ-সহকারী পরিচালক ইসমাইল হোসাইন ইমন।

মঙ্গলবার রাতে মামলার বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন সিলেটের উপ-পরিচালক উপ-পরিচালক মো. জাবেদ হাবীব।

মামলায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী, সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. নঈমুল হক চৌধুরী, উপপরিচালক (পরিবহন ও উন্নয়ন) ফাহিমা খানম চৌধুরী, সহকারী রেজিস্ট্রার অঞ্জন দেবনাথ, সহকারী কলেজ পরিদর্শক মাইদুল ইসলাম চৌধুরী, সহকারী পরিচালক (পরিবহন ও উন্নয়ন) মো. গোলাম সরোয়ার, সহকারী পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক বিলাল আহমদ চৌধুরী, সহকারী পরিচালক (বাজেট) শমসের রাসেল, জনসংযোগ কর্মকর্তা গাজী মো. ফারাজসহ ৫৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, “অভিযুক্ত ব্যক্তিরা পারস্পরিক যোগসাজশে ব্যক্তিগতভাবে বা অন্যদের লাভবান করার উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে বিদ্যমান বিধিবিধান ও আইনকানুন যথাযথভাবে অনুসরণ না করে অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়ে বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের ৫ কোটি ৫৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪৯ টাকা আত্মসাৎ করে দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারাসহ ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন।

“দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধানকালে রেকর্ডপত্র পর্যালোচনা করা হয়। এতে দেখা যায় সাবেক উপাচার্য মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার নঈমুল হক চৌধুরী ২০১৯ সাল থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করে সিন্ডিকেট ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন ছাড়া কোনো ধরনের নিয়োগবিধি না মেনে প্রার্থীদের যথাযথ বয়স ও যোগ্যতা না থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন পদে নিয়োগ ও পদোন্নতি দেন।

“২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত মোট ২২০ জনকে ছয় মাসের জন্য অস্থায়ীভাবে (অ্যাডহক) নিয়োগ দেওয়া হয়। পরে মেয়াদ অনূর্ধ্ব ছয় মাস পর্যন্ত বাড়ানো হয়। নির্ধারিত সময় পূর্ণ হওয়ার পর চাকরি নিয়মিত না করে আবার অ্যাডহকে দুই থেকে পাঁচবার পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়।"

এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, “সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১৮-এর ১২-এর ১০ উপধারা অনুযায়ী উপাচার্য শূন্য পদে অ্যাডহক নিয়োগের ক্ষেত্রে অস্থায়ীভাবে অনধিক ছয় মাসের জন্য নিয়োগ দিতে পারবেন এবং প্রয়োজনে মেয়াদ অনূর্ধ্ব ছয় মাস পর্যন্ত বাড়াতে পারবেন। পরবর্তী সময়ে হয় চাকরি নিয়মিত করতে হবে অথবা অব্যাহতি দিতে হবে। কোনোভাবেই আবার অ্যাডহকে নিয়োগ বা মেয়াদ বাড়াতে পারবেন না। তবে তৎকালীন উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয় আইন লঙ্ঘন করে ব্যক্তিগতভাবে ও অন্যদের লাভবান করার অসৎ উদ্দেশ্যে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অ্যাডহকে নিয়োগ দেন। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার তাকে ওই কাজে সহযোগিতা করেন।"

দুদকের অনুসন্ধানের বিভিন্ন তথ্য এজাহারে উল্লেখ করে বলা হয়, "বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্তমানে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা ২৩৯। কিন্তু ইউজিসি অনুমোদিত পদ আছে ১১২টি। অনুমোদিত পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ৯৮ জনকে এবং ইউজিসি থেকে তাদের বেতন-ভাতা জনতা ব্যাংক লিমিটেডের মাধ্যমে দেওয়া হয়। অতিরিক্ত ১৪১ জনের নিয়োগের বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা ইউজিসি থেকে কর্তৃপক্ষ কোনো অনুমোদন নেয়নি।

“অনুসন্ধানে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ৫৮ জনের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৫৮ জনের বিরুদ্ধে মামলার অনুমোদন দেয় দুদক।"

এর আগে ২০১৮ সালের অক্টোবরে কার্যক্রম শুরু করে সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়। পরে এর নামকরণ করা হয় ‘বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট’।এটি দেশের চতুর্থ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।

ওই বছরের নভেম্বরে প্রথম ভিসি হিসেবে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মোর্শেদ আহমদ চৌধুরীকে নিয়োগ দেওয়া হয়। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পান শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অতিরিক্ত পরিচালক (অর্থ) নঈমুল হক চৌধুরী। শুরুতেই জনবল কাঠামোর বাইরে দ্বিগুণ নিয়োগের অভিযোগ উঠে তাদের বিরুদ্ধে।

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী (ইউজিসি) অনুমোদিত পদের বাইরে অতিরিক্ত ১০৯ জনকে নিয়োগ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। অস্থায়ীভাবে দেওয়া এসব নিয়োগে উপাচার্যের আত্মীয়স্বজন থেকে শুরু করে ক্ষমতাসীন দলের একাধিক সংসদ সদস্যের স্বজনেরা ছিলেন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন অনুষদে বেআইনিভাবে আটজনকে ডিন হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে ইউজিসির তদন্তে।

আইন অনুযায়ী, ইউজিসির অনুমোদিত পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সিন্ডিকেটের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কিন্তু সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করেই ভিসি ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অ্যাডহক ভিত্তিতে অতিরিক্ত নিয়োগ দেন।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে বিষয়টি নিয়ে ইউজিসি ও দুর্নীতি দমন কমিশন তদন্তে নামে। তাদের প্রতিবেদনে অনিয়মের সত্যতা মেলায় ২০২২ সালের ২২ জুন দুদকের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ার হোসেনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মোর্শেদ আহমেদ চৌধুরী ও নঈমুল হক চৌধুরীকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয় আদালত।

২০২৩ সালের ২ জানুয়ারি নতুন উপাচার্য হিসেবে স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এএইচএম এনায়েত হোসেনকে নিয়োগ দেয় সরকার।

আরও পডুন:

Also Read: দুর্নীতি: সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসির বিরুদ্ধে মামলা অনুমোদন

Also Read: সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও রেজিস্ট্রারের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা

Also Read: সিলেট মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়: অনিয়মে শুরু, ৫ বছর পরও হ-য-ব-র-ল