উখিয়ায় আগুন জ্বলছে: এখনই গ্যাসক্ষেত্র বলতে চায় না বাপেক্স
এ ঘটনায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ১৫ দিন সময় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স।
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের আগুন পঞ্চম দিনের মতো জ্বলছে।
এতে ভূগর্ভে বড় কোনো গ্যাসের আধারের সম্ভাবনা আছে কি না, তা নিয়ে নানা আলোচনা চললেও এখনই একে গ্যাসক্ষেত্র বলার সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন বাপেক্সের কর্মকর্তারা।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, গবেষণা ও পরবর্তী জরিপ ছাড়া এ বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “সম্ভাবনা তো অবশ্যই আছে। তবে বিষয়টা গবেষণানির্ভর।”
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদে ঘটনাটিকে দেশের ৩১তম গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করার বিষয়েও সতর্ক করেন তিনি।
“ওই ধরনের বলার কোনো সুযোগ নেই আমাদের পক্ষ থেকে। এটা বলা খুবই কঠিন।”
আরহাম বলেন, পাহাড়ি এলাকায় এক হাজার ফুটের মধ্যে বড় কোনো গ্যাসের আধার থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে দেশে এ ধরনের বড় আবিষ্কারের নজির খুব বেশি নেই।
গভীরের কোনো বড় গ্যাসের আধারের সঙ্গে এ ঘটনার সংযোগ থাকতে পারে কি না, সেটি পর্যবেক্ষণ ও জরিপের পর বোঝা যাবে বলে জানান তিনি।
গত ২৭ অক্টোবর উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছোট ইনানী এলাকায় মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তির বাড়ির আঙিনায় নলকূপ বসানোর জন্য প্রায় এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করা হয়।
পানি না পাওয়ায় পাইপ ও খননকাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম তুলে নেওয়ার পর সেখান থেকে গ্যাস ও পানি বের হতে শুরু করে। এক পর্যায়ে গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এরপর থেকে আগুন জ্বলছে।
পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ১৫ দিন সময় নেওয়ার সিদ্ধান্ত
এ ঘটনায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ১৫ দিন সময় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স। আগুনের উচ্চতা ও তীব্রতা একই থাকলে তা নিয়ন্ত্রণে ভূগর্ভ থেকে ‘রিলিফ ওয়েল’ খননের বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন, বাপেক্স, পেট্রোবাংলা ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের নিয়ে বৈঠকের পর প্রাথমিকভাবে ১৫ দিন ঘটনাটি পর্যবেক্ষণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আগুনের তীব্রতা ও উচ্চতা এ সময় পর্যবেক্ষণ করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ১৫ দিন পরও পরিস্থিতি একই থাকলে পরবর্তী কারিগরি পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে চিন্তা করা হবে।
প্রকৌশলী শোয়েব বলেন, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস নির্গমন বন্ধ করতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভ থেকে পাশ কাটিয়ে বা ‘সাইড ট্র্যাক’ করে রিলিফ ওয়েল খননের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়।
“আগুনের উচ্চতা যদি বেড়ে যায় বা একই রকম থাকে, তাহলে আমরা রিলিফ ওয়েল করার চিন্তাভাবনা করব।”
তবে গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে জানান তিনি।
আগুনের রং দেখে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতির ধারণা
এদিকে ঘটনাস্থলে রাতে গিয়ে আগুনের রং পর্যবেক্ষণ করেছেন পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা।
প্রকৌশলী শোয়েব বলেন, আগুনের রং কালো দেখা যাচ্ছে। এতে গ্যাসের সঙ্গে তেল বা কনডেনসেট জাতীয় উপাদান থাকার প্রাথমিক ধারণা করছেন তারা। তবে এ বিষয়ে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে গ্যাসে উচ্চতর হাইড্রোকার্বনের উপস্থিতির ধারণা করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এটা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর্যায়ে আছে। আমরা ধারণা করছি, এর মধ্যে হায়ার হাইড্রোকার্বন বেশ আছে। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে অ্যানালাইসিস ছাড়া নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।”
এখনও গ্যাসের নমুনা সংগ্রহ করা যায়নি বলেও জানান তিনি। আগুনের কাছে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় গ্যাস সংগ্রহের মতো নিরাপদ কোনো জায়গা পাওয়া যায়নি।
হবে থ্রিডি সাইসমিক জরিপ
প্রকৌশলী শোয়েব বলেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর বাপেক্স সেখানে থ্রিডি সাইসমিক জরিপ করার পরিকল্পনা করছে।
এ জরিপের মাধ্যমে ভূগর্ভের গঠন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হবে। সেখানে সম্ভাব্য কোনো গ্যাসের আধার থাকলে তার অবস্থান এবং অর্থনৈতিকভাবে তা উত্তোলনযোগ্য কি না, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
প্রাথমিকভাবে বিশেষজ্ঞরা এটিকে অগভীর বা ‘শ্যালো রিজার্ভ’ হওয়ার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন। কারণ বাংলাদেশে সাধারণত আরও গভীরে গ্যাসের আধার পাওয়া যায় বলে জানান পেট্রোবাংলার পরিচালক।
তবে এ পর্যবেক্ষণও এখনো প্রাথমিক বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ভূমিধসের ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে না
গ্যাস নির্গমনের কারণে ভবিষ্যতে মাটি বসে যাওয়া বা ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
বাপেক্সের কর্মকর্তা নাফিফুন আরহাম বলেন, এ সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দেশে ও দেশের বাইরে এ ধরনের ঘটনায় মাটি বসে যাওয়ার নজির রয়েছে।
তিনি বলেন, মাটির নিচে বালির পরিমাণ বেশি হলে ভূমি ধসে যাওয়া বা ‘সাবসিডেন্সের’ ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে এ মুহূর্তে তাঁদের প্রধান কাজ হচ্ছে ঘটনাস্থল ও আশপাশের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
“কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে যাতে জানমালের ক্ষতি না হয়, সেই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই আমরা এগোচ্ছি,” বলেন তিনি।
বাপেক্সের বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দল পর্যায়ক্রমে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে বলে জানিয়েছেন নাফিফুন আরহাম।
