রিসোর্টে আগুন: কক্সবাজার পর্যটন এলাকায় নিরাপত্তার দায় কার?
নোটিস দেওয়া ও মামলা করার হিসাবই নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার প্রমাণ নয়, বলেন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি।
একটি রিসোর্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নোটিস দিয়েছিল কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। পরিবেশ অধিদপ্তরও বলেছিল প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় স্থাপনাটি নির্মাণের কারণে সেখানে ছাড়পত্র দেওয়ার সুযোগ নেই। অগ্নিনিরাপত্তা বিষয়ক অনুমোদন না থাকার কথা বলছে ফায়ার সার্ভিস।
তারপরও কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টে পর্যটকেরা উঠেছেন, রাত কাটিয়েছেন।
শনিবার সকালে আগুন লাগার পর সেখান থেকে উদ্ধার হয়েছে ১০টি দেহাবশেষ। স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১১ জনের নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে প্রশাসন।
তবে নিখোঁজদের প্রকৃত সংখ্যা এবং উদ্ধার হওয়া মরদেহের পরিচয় নিয়ে নিশ্চিত তথ্য এখনো মেলেনি।
এখন প্রশ্ন উঠছে, এতগুলো সরকারি দপ্তরের নজরদারি, নোটিস ও আইন প্রয়োগের উদ্যোগের পরও রিসোর্টটি কীভাবে চালু ছিল?
আগুন লাগার পর মানুষকে নিরাপদে বের করে আনার ব্যবস্থা ছিল কি? আর কোনো দপ্তরের দায়িত্বে অবহেলা ছিল কি না?
রোববার ঘটনাস্থলে গিয়ে সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
রিসোর্টটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ একেবারে ছিল না, এমন নয়। বরং একাধিক দপ্তর বলছে, তারা ব্যবস্থা নিতে চেয়েছে, নোটিস দিয়েছে, অনুমোদনের আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে কিংবা লাইসেন্স নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। কিন্তু এসব পদক্ষেপের পরও প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়নি।
অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে বারবার এসেছে জনবল সংকটের কথা। তাদের দাবি, একটি জেলার শত শত বা হাজারো প্রতিষ্ঠান তদারক করার মতো লোকবল তাদের নেই।
তাহলে কি পর্যটন এলাকার নিরাপত্তার দায়িত্বও শেষ পর্যন্ত ব্যবসায়ীর সচেতনতার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল?
‘একজন ইন্সপেক্টর, প্রতিষ্ঠান ৫০০-৬০০’
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল এম এ আজাদ আনোয়ার রোববার ঘটনাস্থলে জানান, পুরো কক্সবাজার জেলায় ফায়ার সার্ভিসের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনের দায়িত্বে রয়েছেন মাত্র একজন অনুমোদিত ইন্সপেক্টর।
তার কাছে বিভিন্ন শ্রেণির প্রায় ৫০০ থেকে ৬০০টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১০০টি প্রতিষ্ঠান ই-ফায়ার লাইসেন্স নিয়েছে এবং আরও প্রায় ৫২টি প্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থায় আবেদন করেছে। অর্থাৎ, তার দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, প্রায় ৪০০টি প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স নেই।
মেরিন ড্রাইভের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স আছে কি না এবং লাইসেন্স না থাকলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে জানতে চাইলে আজাদ আনোয়ার বলেন, “এই প্রতিষ্ঠানটি একটি অবৈধ প্রতিষ্ঠান।”
তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি জেলা প্রশাসক, ইউনিয়ন পরিষদ বা পৌরসভা, কোনো কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই ব্যবসা পরিচালনা করছিল বলে তিনি জেনেছেন। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন তিনি।
ফায়ার সার্ভিসের এই কর্মকর্তা জানান, গত জুন মাসে তাদের ইন্সপেক্টর প্রতিষ্ঠানটিকে লিখিত নোটিস দিয়েছিলেন। তাতে ই-ফায়ার লাইসেন্স নেওয়ার জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বলা হয়েছিল।
ঘটনার দিন শনিবার দুপুরে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত জুনেই পরিদর্শনের পর তাদের তরফে রিসোর্টটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে সতর্ক করে নোটিস দেওয়া হয়েছিল। এরপরেও রিসোর্টটি অবৈধভাবে কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল।
কিন্তু নোটিস দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি লাইসেন্স নিয়েছিল কি না, কিংবা এরপর ব্যবসা চালানোর বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর শুধু নোটিসের তথ্য থেকে পাওয়া যায় না।
এখানেই জনবলসংকটের ব্যাখ্যা দেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা আজাদ আনোয়ার।
তিনি বলেন, “আমাদের ইন্সপেক্টর মাত্র একজন, অথচ প্রতিষ্ঠান ৫০০-৬০০টি। সে যদি প্রতিদিন একটি করেও ভিজিট করে, তাহলেও এক-দেড় বছর পর আবার সেই প্রতিষ্ঠানে তার পুনরায় যাওয়ার সুযোগ হয়।”
তার ব্যাখ্যা, একজন ইন্সপেক্টরের কাজ শুধু প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা নয়। প্রতিবেদন তৈরি, শুনানি এবং অন্যান্য দায়িত্বও পালন করতে হয়। ফলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত গিয়ে অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই করা সম্ভব হয় না।
এ বক্তব্যে একটি বাস্তব সীমাবদ্ধতার কথা উঠে আসে। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্নও তৈরি হয়, কোনো প্রতিষ্ঠানকে অগ্নিঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করার পর সেটি লাইসেন্স না নেওয়া পর্যন্ত তার ব্যবসা চালানো ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়?
‘নোটিস দিয়েছি, কিন্তু অপসারণ হয়নি’
রিসোর্টটির নির্মাণ ও অবস্থান নিয়ে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বি জানান, টুপটুপ রিসোর্টকে ২০২৩ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে নোটিস দেওয়া হচ্ছিল। কাজ বন্ধ করা এবং স্থাপনাটি অপসারণের নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের অনুমোদন চেয়ে আবেদন করা হলেও তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। কারণ, স্থাপনাটি ‘নো-ডেভেলপমেন্ট জোনে’, যেখানে এ ধরনের নির্মাণের অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের পর্যটনকে মডেল হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে এমন স্থাপনা গড়ে ওঠা ও চালু থাকার দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারে কি না জানতে চাইলে ফজলে রাব্বি বলেন, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে রয়েছে। মেরিন ড্রাইভের প্রায় ৮০ কিলোমিটার এলাকায় ডিজিটাল জরিপের মাধ্যমে স্থাপনা শনাক্ত করা হচ্ছে এবং অনুমোদনহীন স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, এই এলাকার প্রায় ১৫০ থেকে ২৫০টি স্থাপনাকে তারা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার আওতায় এনেছেন।
নোটিস দেওয়ার পরও যদি স্থাপনা থেকে যায়, তাহলে সেগুলো সরানো যাচ্ছে না কেন, এ প্রশ্নে ফজলে রাব্বির ব্যাখ্যা, অনেক প্রতিষ্ঠানকে বারবার সতর্ক করার পরও তারা আইন মানে না।
তার ভাষায়, “ফায়ার সার্ভিস নোটিস দিচ্ছে, আমরাও নোটিস দিচ্ছি। ইভেন অনেক জায়গায় দেখবেন যে তাদের ব্যবসা করার পারমিশনই নাই, তারপরেও তারা এখানে ব্যবসা করতেছে।”
কেন তারা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, “অপরাধী মানসিকতা!”
একদিকে তারা বলছে, রিসোর্টটির অনুমোদন ছিল না এবং অপসারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, সেই নির্দেশ কার্যকর করে স্থাপনাটি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্যে ২০২৩ ও ২০২৪ সালে স্থাপনাটি অপসারণের নির্দেশ দেওয়ার কথাও এসেছে। ফলে তদন্তে এখন শুধু স্থাপনাটি অনুমোদনহীন ছিল কি না, তা নয়; বরং নির্দেশ দেওয়ার পরও কেন তা কার্যকর হয়নি, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা।
পরিবেশ অধিদপ্তরের ক্ষতিপূরণ ১ লাখ টাকা
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশার বক্তব্যেও রিসোর্টটির বিরুদ্ধে এর আগে ব্যবস্থা নেওয়ার তথ্য রয়েছে।
তিনি বলেন, কক্সবাজার-টেকনাফ উপদ্বীপ, সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ও সোনাদিয়া দ্বীপ, এই তিনটি এলাকা প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার অন্তর্ভুক্ত। এসব এলাকায় পরিবেশের ক্ষতি করে এমন কর্মকাণ্ডের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, চলতি বছর টুপটুপ রিসোর্টকে প্রথমে নোটিস দেওয়া হয়। এরপর পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৭ ধারার ক্ষমতাবলে ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয় ১ লাখ টাকা।
জরিমানা বা ক্ষতিপূরণ ধার্য করার পর কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? জবাবে মাহমুদ পাশা বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তর শুধু এই একটি স্থাপনা নয়, মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রায় ৬০টি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মোট ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ ধার্য করা হয়েছে। এ ছাড়া কক্সবাজারের প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় ৩০টি নিয়মিত মামলা করা হয়েছে।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি খোকার কাছে এ বিষয়টি তুলে ধরা হলে তিনি বলেন, এসব পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায় না কতটি স্থাপনা বন্ধ হয়েছে, কতটি অপসারণ করা হয়েছে কিংবা কতটি প্রতিষ্ঠান জরিমানা দেওয়ার পরও কার্যক্রম চালিয়ে গেছে।
নতুন করে বড় বড় স্থাপনা গড়ে উঠছে কীভাবে? জবাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মাহমুদ পাশা বলেন, প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকায় কোনো প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই।
ছাড়পত্র না থাকলে এসব প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও পরিচালনার সুযোগ পেল কীভাবে?
জবাবে তিনি আবারও জনবলসংকটের প্রসঙ্গ টানেন।
মাহমুদ পাশার ভাষ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারের ১০টি উপজেলার জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন মাত্র আটজন, যাদের মধ্যে সহকারী পরিচালক মাত্র দুজন। তাদেরই পরিবেশগত আইন প্রয়োগ, মামলা পরিচালনা এবং অন্যান্য দায়িত্ব সামলাতে হয়।
অর্থাৎ, পরিবেশ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যেও দেখা যাচ্ছে, অনুমোদনহীন স্থাপনা শনাক্ত করার উদ্যোগ থাকলেও তা প্রতিরোধ ও অপসারণের সক্ষমতা সীমিত।
তবে এখানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি খোকা প্রশ্ন তোলেন, আইন লঙ্ঘনের ঘটনায় ক্ষতিপূরণ বা মামলা করার পরও সংশ্লিষ্ট স্থাপনার কার্যক্রম বন্ধ না হলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব কোন দপ্তরের, এবং সেই ব্যবস্থা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়েছে?
কাঠের স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার ঝুঁকি
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, রিসোর্টের রান্নাঘর ও সিঁড়ি কাছাকাছি ছিল। আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ভেতরে থাকা পর্যটকদের বের হওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে।
তবে স্থাপনার নকশা, বিকল্প বহির্গমনপথ এবং আগুন ছড়িয়ে পড়ার প্রকৃত কারণ তদন্তেই জানা সম্ভব।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক আজাদ আনোয়ার বলেন, কাঠ বা বাঁশ দিয়ে তৈরি স্থাপনায় অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা আরও বেশি গুরুত্ব দিয়ে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, এ ধরনের স্থাপনায় কক্ষভিত্তিক স্প্রিঙ্কলার (পানি ছিটানোর ছিদ্র যুক্ত যন্ত্র), সংযুক্ত রাইজার (বিশেষ ধরনের খাড়া পানির পাইপলাইন), পাইপলাইন, ফায়ার পাম্প এবং পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থাসহ পূর্ণাঙ্গ অগ্নিনিরাপত্তা অবকাঠামো প্রয়োজন হতে পারে।
ফায়ার সার্ভিসের এ পরিচালক বলেন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে কম খরচের দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়, কিন্তু নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগে অনীহা থাকে। কাঠ বা বাঁশ দিয়ে তৈরি স্থাপনা দেখতে পরিবেশবান্ধব মনে হলেও যথাযথ অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকলে ঝুঁকি থেকেই যায়।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অথরাইজড অফিসার ফজলে রাব্বিও বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড ২০২০-এর কথা তুলে ধরে বলেন, এ ধরনের নির্মাণে অগ্নিপ্রতিরোধী কাঠামোগত ব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম থাকা দরকার।
কিন্তু এই রিসোর্টে সেসব ব্যবস্থা ছিল কি না, তা তদন্তের বিষয়।
ফায়ার সার্ভিসের নোটিসের পর প্রতিষ্ঠানটি কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন করেছিল কি না, লাইসেন্সের আবেদন করেছিল কি না, কিংবা অগ্নিঝুঁকি নিরসনে কোনো পদক্ষেপ নিয়েছিল কি না, এসব প্রশ্নের উত্তরও এখনো স্পষ্ট নয়।
জনবলসংকট কী দায়মুক্তির ব্যাখ্যা?
রিসোর্টটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে একাধিক দপ্তরের উদ্যোগের কথা পাওয়া গেছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যে দায়ের প্রশ্নটি এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরের দিকে সরে যেতে দেখা যায়।
কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা নোটিস দিয়েছে এবং অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে; কিন্তু ব্যবসায়ীরা আইন মানেনি।
পরিবেশ অধিদপ্তর বলছে, তারা নোটিস, ক্ষতিপূরণ ও মামলা করেছে; কিন্তু তাদের জনবল সীমিত।
ফায়ার সার্ভিস বলছে, অগ্নিনিরাপত্তার লাইসেন্স ছাড়া প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হচ্ছে; কিন্তু একজন ইন্সপেক্টরের পক্ষে শত শত প্রতিষ্ঠান নিয়মিত পরিদর্শন করা সম্ভব নয়।
তাহলে কী সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা আছে? জবাবে ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক আজাদ আনোয়ার বলেন, “না, কোনো সমন্বয়হীনতা নেই।”
তার ব্যাখ্যা, ফায়ার সার্ভিসের নিজস্ব নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নেই। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসনের সহায়তা নিতে হয়।
তিনি বলেন, ই-ফায়ার লাইসেন্স চালুর পর থেকে নোটিসের অনুলিপি স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু জেলা প্রশাসনের অধীনেও প্রায় এক হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে এবং তাদের তদারকির জন্য জনবল নির্দিষ্ট।
আজাদ আনোয়ারের ভাষায়, একটি প্রতিষ্ঠানকে নোটিস দেওয়ার পর পরবর্তী তিন বছরের মধ্যে আবার সেখানে যাওয়ার সুযোগও অনেক সময় হয় না।
একটি দপ্তর নোটিস দিচ্ছে, অন্য দপ্তর অনুমোদন প্রত্যাখ্যান করছে, আরেক দপ্তর লাইসেন্স না থাকার কথা জানাচ্ছে। কিন্তু এসব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করা, ঝুঁকি দূর করা কিংবা নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কীভাবে ভাগ করা হয়েছিল, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি খোকা বলেন, জনবলসংকট বাস্তব সমস্যা হতে পারে। কিন্তু সেই সংকটের কারণে আইন প্রয়োগ সম্ভব না হলে, ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা বন্ধ করার বিকল্প ব্যবস্থা কী ছিল, সেটিও তদন্তে খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
আগুনের পর তদন্ত, কিন্তু প্রশ্নগুলো আগের
টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের কারণ, অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর ভূমিকা খতিয়ে দেখতে সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে পাঁচ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।
কমিটির প্রধান ও কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেছেন, রিসোর্ট নির্মাণের সময় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা নিজ নিজ ক্ষেত্র থেকে কারিগরি বিষয়গুলো মূল্যায়ন করবেন।
তদন্তে এখন কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে বলে মনে করেন কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি।
তিনি বলেন, প্রথমত, কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দেওয়া নোটিস ও অপসারণের নির্দেশের পরও রিসোর্টটি কীভাবে চালু ছিল? দ্বিতীয়ত, পরিবেশ অধিদপ্তরের নোটিস ও ক্ষতিপূরণ ধার্যের পর স্থাপনাটির কার্যক্রম বন্ধ বা অপসারণে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল? তৃতীয়ত, ফায়ার সার্ভিসের ইন্সপেক্টর জুন মাসে নোটিস দেওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির অগ্নিনিরাপত্তা যাচাই করা হয়েছিল কি না, এবং লাইসেন্স না নেওয়ার পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল? চতুর্থত, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর কাছে প্রতিষ্ঠানটির অনুমোদন ও নিরাপত্তার ঘাটতির তথ্য থাকলে সেই তথ্যের ভিত্তিতে সম্মিলিতভাবে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কি না?
এ প্রশ্নগুলোর উত্তর ছাড়া শুধু জনবলসংকটকে দায়ী করে অগ্নিকাণ্ডের প্রশাসনিক ব্যর্থতার ব্যাখ্যা দেওয়া অসম্পূর্ণ থেকে যাবে বলে মনে করেন তিনি।
কক্সবাজার সিভিল সোসাইটির সভাপতি বলেন, জনবল সীমিত থাকলেও কোনো স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ বলে শনাক্ত হওয়ার পর সেই ঝুঁকি কমানোর দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। আর নোটিস দেওয়া ও মামলা করার হিসাবই নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়ার প্রমাণ নয়।
তিনি বলেন, এর দায় কেউই এড়াতে পারেন না।
প্রত্যক্ষদর্শীরা যা বলছেন
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটোয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রেস্তো অ্যান্ড রিসোর্টটি ছিল তিনতলা। ভবনটির বিভিন্ন অংশে কাঠ, বাঁশ ও কাঠের তক্তা ব্যবহার করা হয়েছিল। আগুন লাগার পর দ্রুত তা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ওপরের তলার কাঠামো ধসে পড়ে, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয় ভেতরে থাকা মানুষের।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আবদুল্লাহর ধারণা, সকালে নাশতা তৈরির সময় রিসোর্টের রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। রান্নাঘরটি ছিল অভ্যর্থনাকক্ষ ও সিঁড়ির পাশেই।
তবে আগুনের প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায়, আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় ভেতরে থাকা অনেকে বের হওয়ার সুযোগ পাননি। কয়েকজন প্রাণ বাঁচাতে জানালা ও বারান্দা দিয়ে লাফিয়ে বের হন।
তাদের একজন আশিকুল ইসলাম। তিনি বলেছেন, আগুনের খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যদের সতর্ক করতে গিয়ে নিজেও জানালা ভেঙে লাফ দিয়ে বের হন।
আশিকুলের স্ত্রীসহ পরিবারের ছয়জন নিহত হয়েছেন।
কিন্তু আগুনে পুড়ে মরদেহগুলো এতটাই বিকৃত হয়ে যায় যে, তাৎক্ষণিকভাবে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলেছেন, উদ্ধার করা ১০টি মরদেহ শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। ভবনের ধ্বংসস্তূপে আর কেউ আটকে আছেন কি না, তা নিশ্চিত হতেও তল্লাশি চালানো হয়।
নিহতদের পরিবারের সদস্যদের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে রাজধানীর সিআইডি অফিসে।
