যেভাবে মিয়ানমারে ফিরলেন বিজিপির ৩৩০ জন

প্রথম দফায় দুপুর ১২টায় এবং দ্বিতীয় দফায় বিকাল ৪টায় মোট ৩৩০ জনকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।

কক্সবাজার প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 15 Feb 2024, 11:43 AM
Updated : 15 Feb 2024, 11:43 AM

রাখাইন রাজ্যে যুদ্ধের মধ্যে পালিয়ে আসা মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী ও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যসহ ৩৩০ জনকে দুই ধাপে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।

তাদের মধ্যে রয়েছেন মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) ৩০২ জন, তাদের পরিবারের চার সদস্য, দুজন সেনা সদস্য, ১৮ জন ইমিগ্রেশন সদস্য এবং চারজন বেসামরিক নাগরিক।

বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে প্রথম দফায় ১৬৫ জনকে কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানী নৌবাহিনী জেটিঘাট থেকে জাহাজে করে পাঠানো হয় গভীর সমুদ্রে অপেক্ষায় থাকা মিয়ানমারের জাহাজে।

দ্বিতীয় দফায় বিকাল ৪টায় বাকি ১৬৫ জনকে একই প্রক্রিয়ায় মিয়ানমারের জাহাজে পাঠানো হয় বলে বাংলাদেশ সীমান্ত রক্ষা বাহিনী-বিজিবির সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম জানান।

বিজিবি জানায়, ২ ফেব্রুয়ারি রাত থেকে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্তের ওপারে মিয়ানমারের সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সঙ্গে বিজিপির সংঘর্ষ শুরু হয়। এর জের ধরে ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন বিজিপির সদস্যসহ ৩৩০ জন। তারা এসে অস্ত্রসহ বিজিবির কাছে আত্মসমর্পণ করেন।

মিয়ানমারের এই নাগরিকদের বিজিবি হেফাজতে কক্সবাজারের টেকনাফ ও বান্দরবানের ঘুমধুমের দুটি স্কুলে রাখা হয়েছিল। তাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ ও আলোচনা করে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে বিজিবির রামু সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মেহেদী হোসাইন কবীরের নেতৃত্বে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও পুলিশের প্রতিনিধির সমন্বয়ে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়।

এই কমিটি মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও বিজিপি সদস্যদের ফেরত যাওয়ার বিষয়টি সমন্বয় করে।

বিজিবি জানায়, বিজিপি সদস্যদের হস্তান্তরের জন্য কড়া নিরাপত্তায় বৃহস্পতিবার ভোরে বাসে করে তাদের উখিয়ার ইনানী উপকূলে নৌবাহিনীর জেটি ঘাটে নিয়ে আসা হয়।

ওই ৩৩০ জনের মধ্যে নয়জনকে হাসপাতালে রেখে চিকিৎসাও দেওয়া হয়। তাদের ইনানীতে নিয়ে আসা হয় অ্যাম্বুলেন্সে করে। সবাইকে প্রথমে সেখানে একটি অস্থায়ী তাঁবুতে রাখা হয়।  

সকাল ৮টা থেকে ইনানিতে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মিয়ানমার বিষয়ক পরিচালক মো. রাকিবুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের উপসচিব মো. রাশেদ হোসেন চৌধুরী, বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী, মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়ে, বিজিবির অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মুহম্মদ শাহীন ইমরান, পুলিশ সুপার মো. মাহাফুজুল ইসলাম।

সকাল সাড়ে ৯টার কিছু পরে কোস্ট গার্ডের জাহাজে করে ইনানী জেটিতে আসেন বিজিপির কর্নেল মায়ো থুরা নউংয়ের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধিদল।

তারা পৌঁছার পর দুই রাষ্ট্রের মধ্যে লিখিত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়ে। তারপর বেলা ১১টায় বিজিবির মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়ের সামনেই ৩৩০ সদস্যকে বিজিপির কর্নেল মিয়ো থুরা নউংয়ের হাতে হস্তান্তর করেন।

প্রথম ধাপে ১৬৫ জনকে জেটি দিয়ে তোলা হয় ইনানি ও সেন্ট মার্টিন নৌপথে চলাচলকারী পর্যটকবাহী জাহাজ কর্ণফুলিতে। দুপুর ১২টার দিকে জাহাজ তাদেরকে বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানায় অপেক্ষারত মিয়ানমারের নৌ বাহিনীর জাহাজে পৌঁছে দেয়।

দ্বিতীয় দফায় ১৬৫ জন যায় বিকাল ৪টায়। এই ৩৩০ জনকে নিয়ে মিয়ানমারের জাহাজটি রাজধানীর দিকে যাত্রা শুরু করে বলে বিজিবি জানায়।

তবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের সময় সঙ্গে করে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ নিয়ে এসেছিলেন মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা। আপাতত সেসব তাদের সঙ্গে ফেরত দেওয়া হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন বিজিবি সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (জিএস ব্রাঞ্চ) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাহাঙ্গীর আলম।

এই হস্তান্তর প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে নৌবাহিনীর জেটি ঘাট এলাকায় নেওয়া হয় ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির পাশাপাশি কোস্ট গার্ড সদস্যরাও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করেন।

এ সময় বিজিবি মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জান্তা সরকারের বিভিন্ন বাহিনী এবং দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। যার প্রভাব বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের এপারে এসে পড়ে।

পালিয়ে আশ্রয় নেওয়া ৩৩০ জনকে বিজিবির পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহায়তা, সহযোগিতা ও আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মহাপরিচালক বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ধৈর্য ধারণ করে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রেখে বিজিবিকে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করার নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা মেনে বিজিবি সীমান্তে সর্বোচ্চ সর্তক রয়েছে। রোহিঙ্গাসহ কোনো প্রকার অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হবে না।

এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়ে বাংলাদেশ সরকার ও বিজিবির প্রতি কতৃজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, এই প্রক্রিয়াটির মধ্য দিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আন্তরিক সম্পর্ক আরও উন্নত হয়েছে।

এদিকে, সীমান্ত পরিস্থিতি বৃহস্পতিবারও পুরোদিনই শান্ত ছিল। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে গোলা বারুদ বিস্ফোরণের কোনো শব্দ দিনব্যাপী শোনা যায়নি।

কী ঘটেছিল

২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে অং সান সু চির নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের ক্ষমতা নেয় দেশটির সেনাবাহিনী। ২০২৩ সালের অক্টোবরের শেষ দিক থেকে মিয়ানমারের তিনটি জাতিগত বিদ্রোহী বাহিনী একজোট হয়ে জান্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণ শুরু করে।

বাহিনীগুলো হল- তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি-টিএনএলএ, আরাকান আর্মি-এএ এবং মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্স আর্মি-এমএনডিএএ। তারা শান, রাখাইন, চীন ও কেয়াহ রাজ্যে লড়াই চালাচ্ছে। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সেনাপোস্ট দখল করে ইতোমধ্যে তারা সাফল্য দেখিয়েছে।

আরাকান আর্মি (এএ) এ জোটের অন্যতম অংশ। মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় রাজ্য রাখাইনের সংখ্যালঘু নৃগোষ্ঠীর একটি সশস্ত্র বাহিনী এটি। তারা রাখাইনের বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে লড়াই করছে।

রাখাইনে সেনা ও বিদ্রোহীদের মধ্যে লড়াইয়ের প্রভাব পড়ছে সীমান্তের এপারের জনগোষ্ঠীর মধ্যেও। যুদ্ধের গুলি ও মর্টার শেল এসে পড়ছে এপাড়ে। এরকম ঘটনায় অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন কয়েকজন। ঢাকায় মিয়ানমারের দূতকে ডেকে এসব ঘটনার কড়া প্রতিবাদ জানানো হয় বাংলাদেশের তরফ থেকে।

এদিকে যুদ্ধের মধ্যে বিদ্রোহীরা বিজিপির কয়েকটি সীমান্ত ফাঁড়ি দখল করে নিলে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সদস্যরা ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে শুরু করে। পরের কয়েক দিনে তাদের সংখ্যা পৌঁছায় ৩৩০ জনে।

শুরুতে তাদের নিরস্ত্র করে বিজিবি হেফাজতে রাখা হয় বান্দরবানের একটি স্কুলে। পরে তাদের একটি অংশকে সরিয়ে নেওয়া হয় টেকনাফে।

এর মধ্যেই তাদের ফেরত পাঠাতে বাংলাদেশের তরফ থেকে মিয়ানমারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। মিয়ানমারও তাদের সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ফিরিয়ে নিতে সম্মত হয়।  

কিছুদিন আগে ভারত যেভাবে মিয়ানমারের সৈন্যদের ফেরত পাঠিয়েছিল, সেই অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সময়ে প্রত্যাবাসনের জন্য বিজিপি সদস্যদের আকাশপথে ফেরত পাঠানোর কথা বলেছিল বাংলাদেশ।

তবে ধারণক্ষমতা এবং একসঙ্গে সবাইকে নিয়ে যাওয়ার সুবিধার কথা বিবেচনায় নিয়ে পরে মিয়ানমারের প্রস্তাবে তাদের নৌপথে পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

পুরনো খবর:

মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীদের নৌপথে পাঠানোর প্রস্তুতি

মিয়ানমার থেকে আর কাউকে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

রাখাইন থেকে কূটনীতিকদের সরিয়ে নিচ্ছে বাংলাদেশ

মিয়ানমারে যুদ্ধ: পাল্টে গেল ঘুমধুমের সেই এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্র

মিয়ানমারে যুদ্ধ: রাখাইনের যে খবর পাচ্ছেন ক্যাম্পের রোহিঙ্গারা

Also Read: ১৬৫ বিজিপি গেল মিয়ানমারের জাহাজে, বিকালের মধ্যে বাকিদের হস্তান্তর