Published : 03 Apr 2023, 11:59 PM
চৈত্রের ঝড়-বৃষ্টি ও মেঘলা আবহাওয়ার মধ্যে খরচ উঠিয়ে লাভের মুখ দেখতে পারা নিয়ে শঙ্কায় দিন গুনছেন বরিশালের তরমুজ চাষিরা।
বৃষ্টিতে ক্ষেতে পানি জমে তরমুজে পচন ধরেছে; যার কারণে বাজারের আনার আগেই পচে যাচ্ছে রসালো এই ফল।
বরিশাল বিভাগের সব জেলাতে লক্ষ্যমাত্রার বেশি জমিতে তরমুজ আবাদ হয়েছে। কিন্তু খরচের কতটুকু তুলে আনতে পারবেন তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন। কোনো কোনো চাষি ক্ষতির বিষয়ে ইতোমধ্যেই নিশ্চিত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
তবে এখনও আশার কথা বলছে কৃষি দপ্তর। তাদের ভাষ্য, আবহাওয়া ভালো হয়েছে। এ আবহাওয়া অব্যাহত থাকলে ক্ষেতে থাকা তরমুজ দিয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।
বরিশাল নগরীর পোর্ট রোডের ইলিশ মোকামের সিংহভাগ জুড়ে এখন চলছে তরমুজ কেনা-বেচা। আর সংলগ্ন নদীতে ভাসছে ফেলে দেওয়া পচা ও নষ্ট তরমুজ।
সরেজমিনে বাজারে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা হয় বিডিনিউজ টোয়েন্টিফেঅর ডটকম প্রতিনিধির।
বাজারে অস্থায়ী আড়ত নিয়ে ব্যবসা করেন নগরীর সিটি মার্কেট কাঁচাবাজারের ফল ব্যবসায়ী ‘নাসির খান বাণিজ্যালয়’ এর মালিক নাসির খান।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এ সময়ে মাছ ধরা নিষেধ। তাই বাজারে মাছ তেমন আসে না। মাছ না আসায় বাজারে দেড় মাস তরমুজ কেনা-বেচা হয়। গত ১৫ ফাল্গুনে শুরু হয়ে ১লা বৈশাখ পর্যন্ত এ বাজারে বেচা-বিক্রি করেন। এ ছাড়া নগরীর কলাপট্টি ও লঞ্চঘাট বালুর মাঠ এলাকায় তরমুজ পাইকারি বিক্রি হয়।

বৃষ্টির আগে তরমুজের যে দাম ছিল, এখন তার অর্ধেক দামে বিক্রি হচ্ছে বলে নাসির খান জানান।
তিনি জানান, বর্তমানে বড় সাইজের তরমুজ ৯০ থেকে ১১০ টাকা, মাঝারি আকারের তরমুজ ৫০ থেকে ৭০ টাকা এবং ছোট আকারের তরমুজ ২০ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া এভারেজ সাইজের তরমুজ প্রতি শত ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
নগরীর কলাপট্টির মনোয়ারা বাণিজ্যালয়ের স্বত্বাধিকারী মো. মিজানুর রহমান জানান, এ বছর তরমুজের ব্যাপক ফলন হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি ও জোয়ারের পানি উঠে যাওয়ায় তরমুজ নষ্ট হয়েছে। এতে চাষিরা আগাম তরমুজ তুলে ফেলেছে। তাই অনেক তরমুজ এসেছে।
“এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তরমুজ আবাদে কৃষকের যে খরচ হয়েছে, তা উঠবে না। কারণ জ্বালানি তেলের দাম বেড়েছে, শ্রমিক মজুরি, সারসহ পরিবহন ব্যয় অনেক বেশি হয়েছে। কৃষকের খরচ উঠবে না।”
মিজান আরও বলেন, বর্তমানে ১০ থেকে ১৫ কেজি ওজনের বড় আকারের তরমুজের শত বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকায়। ৭ থেকে ৮ কেজি ওজনের মাঝারি আকারের তরমুজের শত বিক্রি হচ্ছে ৯ থেকে ১০ হাজার টাকায়। ৪ থেকে ৫ কেজি ওজনের ছোট আকারের তরমুজের শত বিক্রি হচ্ছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায়।

বরগুনার চালিতাতলীর কৃষক মজিবর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তিনি এ বছর ২৬ একর জমিতে তরমুজের আবাদ করেছেন। বৃষ্টিতে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার তরমুজ নষ্ট হয়েছে। এখনও ক্ষেতে ২০ হাজার তরমুজ রয়েছে। বর্তমানে আবহাওয়া ভালো আছে। তাই ক্ষেতে থাকা তরমুজ কাটা শুরু করেননি।
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে এ কৃষক বলেন, “ভাই আমার সব শেষ। কীভাবে ক্ষতি পুষিয়ে উঠব আল্লাহ ভালো জানেন।”
ট্রলারে তরমুজ নিয়ে বরিশাল নগরীর পোর্ট রোডে আসা ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার কৃষক ইউপি সদস্য হাজী মো. নুরনবী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “তরমুজের ব্যবসা মন্দা। অনেক লোকসান হবে। মেঘ ও বৃষ্টির কারণে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়েছে।”
তার এলাকায় কমপক্ষে দুই হাজার একরে তরমুজ আবাদ হয়েছে; এর মধ্যে শতকরা দুয়েকজন ব্যয়ের অর্থ ঘরে নিতে পেরেছেন; বাকি চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে তার ভাষ্য।
ইউপি সদস্য নুরনবী বলেন, একজন কৃষক ১০ কানি [এক কানিতে ৪০ শতক] জমিতে তরমুজ আবাদ করে ৫০ হাজার টাকাও নিতে পারেননি। একেক জন দেড় লাখ টাকার ক্ষতিতে পড়েছেন।
এই ইউপি সদস্য ১০ লাখ টাকার ক্ষতিতে পড়েছেন জানিয়ে বলেন, তিনি ১৫ কানি জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। এতে ৩০ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সর্বোচ্চ ১৬/১৭ লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করতে পেরেছেন তিনি।
ভোলার চরফ্যাশন থেকে আসা কৃষক মো. রুবেল জানান, তিনি ৫ কানি জমিতে তরমুজ আবাদ করেছেন। এতে তার ব্যয় হয়েছে ৫ লাখ টাকা। তরমুজ বিক্রি করেছেন ২ লাখ টাকায়।
তিনি বলেন, “আকাশের অবস্থা খারাপ, ঝড়-বৃষ্টি হয়েছে, পানি উঠেছে। এ কারণে সবাই একসঙ্গে তরমুজ নিয়ে বাজারে এসেছে, তাই দাম কম পেয়েছি। তাই সকলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।”

ভোলার নুরাবাদ থেকে আসা কৃষক মো. ইসমাইল বলেন, গত বছর ভালো দাম পেয়েছেন। এ বছর আড়াই কানি জমিতে তরমুজ আবাদ করে ১ হাজার ৮০০ তরমুজ পেয়েছেন। তরমুজ আবাদে তার সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ১০০ তরমুজ ৪ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন। তার আড়াই লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মো. শওকত ওসমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এবার তরমুজের ভালো ফলন হয়েছে। কিন্তু আবহাওয়ার কারণে তরমুজের বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৃষ্টিতে জমিতে পানি জমে যাওয়ায় তরমুজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাই তরমুজ পরিবহন করা কষ্টসাধ্য হচ্ছে। পরিবহনের ২/১ দিনের মধ্যেই তরমুজ পচে যাচ্ছে। তাই বাজার নিম্নমুখী।
অতিরিক্ত পরিচালক বলেন, জমির ১০ থেকে ৫০ ভাগ তরমুজ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। যে ৫০ ভাগ তরমুজ এখনো জমিতে রয়েছে, আবহাওয়া ভালো থাকলে কৃষক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবেন।
বৃষ্টিতে কী পরিমাণ ও কত টাকার তরমুজ ক্ষতি হয়েছে তার হিসাব এখনও চূড়ান্ত হয়নি।
আগামী সপ্তাহের মধ্যে তা জানা যাবে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত পরিচালক শওকত ওসমান।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের এই কর্মকর্তা আরও বলেন, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় তরমুজ চাষ হয়েছে ৬৪ হাজার ১৮৩ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে ৯ হাজার ৬২৭ হেক্টর জমির তরমুজ নষ্ট হয়েছে।
ক্ষতি পুষিয়ে দিতে পরবর্তী ফসলে প্রণোদনা দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন এ কৃষি কর্মকর্তা।

এ বছর বরিশাল বিভাগের সবচেয়ে বেশি তরমুজ আবাদ হয়েছে পটুয়াখালী জেলায়। এ জেলায় ২৮ হাজার ৭৪৫ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২৩ হাজার ৩১৪ হেক্টর জমিতে।
দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আবাদ হয় ভোলা জেলায়। এ জেলায় ১৮ হাজার ১৮৩ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। এ জেলায় আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ২৪৯ হেক্টর জমি।
বরগুনা জেলায় আবাদ হয়েছে ১৫ হাজার ৮৩৮ হেক্টর জমিতে; লক্ষ্যমাত্র ছিল ১১ হাজার ৫১২ হেক্টর জমি।
সবচেয়ে কম হয়েছে ঝালকাঠি জেলায়। এ জেলায় ৫০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ৫৫ হেক্টর জমিতে। পিরোজপুর জেলায় ১০৬ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ১১৬ হেক্টরে ও বরিশাল জেলায় ৭০০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও আবাদ হয়েছে ১ হাজার ৪৬ হেক্টরে।