সবাই এখন নন-অ্যাকাডেমিক কাজে ব্যস্ত: শাবি ভিসি

“আমাদের বহু শিক্ষক সফটওয়্যার খুলে রেজাল্ট পাবলিশ করতে পারে না,” বলেন অধ্যাপক ফরিদ।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 13 Jan 2023, 05:10 PM
Updated : 13 Jan 2023, 05:10 PM

অ্যাকাডেমিক এক অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তেমন উপস্থিতি দেখতে না পেয়ে ক্ষোভ ঝেরেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন আহমেদ।

তিনি বলেছেন, “আমরা সবাই এখন নন-অ্যাকাডেমিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত। যার জন্য আপনি যখন ডিনারে যাবেন, তখন সেখানে জায়গা হচ্ছে না। আমাদের এই অডিটরিয়ামে ১২০০ লোক বসতে পারে। কিন্তু এখানে ৫০ থেকে ৬০ জন উপস্থিত আছে, এটা তো খারাপ লাগে। এটা খুবই বাজে দেখাচ্ছে।

“…কিন্তু আমি দেখেছি বিভিন্ন পার্টিতে ৪০০ জনের মত অংশগ্রহণ করে থাকে। কিন্তু এখানে অংশগ্রহণকারী সবাই টেকনিক্যাল পার্সন, রিসোর্স পারসন।”

শুক্রবার বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে অ্যাপ্লায়েড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি অনুষদ আয়োজিত প্রকৌশল গবেষণা, উদ্ভাবন ও শিক্ষা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন তিনি।

সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনের ওই সেশনে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নানসহ বেশ কয়েকজনের বক্তৃতার প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক ফরিদ বলেন, “এই সমস্ত সেশনগুলোতে যেসব বিশিষ্টজনেরা বক্তব্য রাখলেন, এতে আমাদের চিন্তা শক্তি বৃদ্ধি পায়। গবেষণার প্রতি যে ভালোবাসা, এই বক্তেব্য শুনে আরও বিকশিত হয়।

“কিন্তু এই প্রোডাক্টিভ প্রেগ্রামগুলোতে আমরা অংশগ্রহণ করিনি। নন-অ্যাকাডেমিক কাজে সময় নষ্ট করছি। যার জন্য আপনি যখন ডিনারে যাবেন, তখন সেখানে জায়গা হচ্ছে না।”

শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জন্য এ ধরনের আয়োজন করা হলেও তাদের উপস্থিতি ‘হতাশাব্যঞ্জক’ বর্ণনা করে উপাচার্য বলেন, “এই যে কনফারেন্স হচ্ছে, এখানে প্রচুর লোক রাত-দিন পরিশ্রম করেছে। তারা সকাল থেকে রাত পর্যন্ত প্রস্তুতি নিয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে- এখানে লোকজন (অংশগ্রহণকারী) নাই।

“দেশ ও বিদেশের অতিথিরা এসেছে, রায়ান ওৎ (শেভরনের অপারেশন ডিরেক্টর) যুক্ত (ভার্চুয়ালি) হয়েছে সুদূর আমেরিকা থেকে; যখন ওইখানে অনেক রাত, তার পরও তিনি যুক্ত হয়েছেন। আমাদের পরিকল্পনামন্ত্রী অসুস্থ, তার পরও তিনি যুক্ত (ভার্চুয়ালি) হয়েছেন। কিন্তু যাদের জন্য এই সম্মেলন (শিক্ষক-শিক্ষার্থী), যারা এখান থেকে বেনিফিট বেশি পাবে, তাদের উপস্থিতি অতি নগণ্য; এটি হতাশাব্যঞ্জক।”

দেশের প্রথম বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে শাহজালালের ‘আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই’ মন্তব্য করে অধ্যাপক ফরিদ উদ্দিন বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিজিক্যাল সায়েন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদে ১৯টি ডিপার্টমেন্ট আছে; কিন্তু আমরা আমাদের রেজাল্ট সর্ট আউট করতে পারি না। আমাদের বহু শিক্ষক সফটওয়্যার খুলে রেজাল্ট পাবলিশ করতে পারে না।

“আমাদের শিক্ষার্থীরা ক্লাসে কয়দিন এলো, কয়দিন গেল সেই হিসাব কিন্তু সফটওয়ারের মাধ্যমে রাখা হচ্ছে না। কোনোদিন ক্লাস না করে, ৫ বছর পর এসে, যখন কোনো ছাত্রত্ব নাই, সে কিন্তু ফরম ফিলাপ করে পরীক্ষা দিয়ে দিচ্ছে। সারা দুনিয়ার কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস না করে, কোনো টিউটরিয়াল ছাড়া পরীক্ষা দিয়ে দিচ্ছে- এ রকমটা নাই।”

বর্তমান পরীক্ষা পদ্ধতির দুর্বলতা নিয়ে সমালোচনা করতে গিয়ে উপাচার্য বলেন, “পরীক্ষার সাত দিন আগে এসে (শিক্ষার্থী) রেজিস্ট্রশন করে পরীক্ষা দিয়ে দিচ্ছে। এ জিনিসগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের টেকনোলজিক্যালি উন্নয়ন করার দরকার ছিল। দ্বিতীয় বর্ষের ছেলে প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিতে পারবে, কিন্তু চতুর্থ বর্ষের ছাত্র কীভাবে প্রথম বর্ষের পরীক্ষা দিয়ে দেয়- এটা কী পদ্ধতি!

“সারাজীবন ছাত্র থাকতে পারবে এই নিয়মটা হয়ে গেছে, এটা বড় ধরনের ব্যর্থতা। যদিও এটি নাম্বার ওয়ান সায়েন্স অ্যান্ড টোকনোলজি ইউনিভার্সিটি, কিন্তু এই জিনিসগুলো আমরা সর্ট আউট করতে পারি নাই।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারে গুরুত্ব আরোপ করে অধ্যাপক ফরিদ বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসের অ্যাটেনডেন্সে নম্বর দেওয়া হয়, কিন্তু সেই ছাত্র ক্লাসে উপস্থিত না থেকে পরীক্ষায় কীভাবে অংশ নেয়। সেজন্য আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়টির হওয়া উচিত ছিল 'টোটালি ডিজিটাল বিশ্ববিদ্যালয়'। তাহলে প্রত্যেকটি জায়গায় আমরা ইজিলি কাজ করতে পারব।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নের ক্ষেত্রে ‘অর্থের অভাব নেই’ মন্তব্য করে তিনি বলেন, “আমাদের ৬০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ ছিল অ্যাপ উন্নত করার জন্য, কিন্তু আমরা উন্নতি করতে পারিনি। আমাদের সম্পূর্ণটা ডিজিটাল করতে গেলে সব শিক্ষক ও অফিসে কম্পিউটার থাকতে হবে। এজন্য প্রতিবছর ৬০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয় কম্পিউটার কেনার জন্য।

“আমরা কম্পিউটার কিনেছি, কিন্তু আমাদের শিক্ষকরা সেগুলো ইউজ করতে পারছে না, অল্প সময়ে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে। এরকম যদি অবস্থা হয়, আমাদের পাবলিক মানি যদি এভাবে অপচয় করি, তাইলে ক্যামনে হবে? আমরা প্রজেক্টের টাকা নিচ্ছি, খরচও করছি; কিন্তু ফলাফল নেই। সরকারের টাকাটা কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ; এগুলো সাধারণ মানুষের টাকা।”

বিশ্ববিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে যে বিভিন্ন সময়ে অনিয়ম হয়ে আসছে, সে প্রসঙ্গও তুলে ধরেন উপাচার্য অধ্যাপক ফরিদ।

তার কথায়, “এক কোটি ২০ লাখ টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্নিচারের জন্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে থার্ড ক্লাস ফার্নিচার কেনা হয়েছে, যেগুলো শুধু ডিজাইনের মধ্যেই শেষ।

“পরিমাণে কম হোক, কিন্তু টেকসই হোক; সেগুলো হলেও তো ভালো হত। এমন কেনা হয়েছে...যেগুলো আমাদের শিক্ষকরা ব্যবহার করতে পারে নাই।"

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক