০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২০ কার্তিক ১৪৩৩

পুকুরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক, গবেষণায় মিলেছে ভারী ধাতু ও অ্যান্টিবায়োটিক

গবেষকরা বলছেন, মাছে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানব স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকি তৈরি করছে, তা নিয়ে আরও পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।

পুকুরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক, গবেষণায় মিলেছে ভারী ধাতু ও অ্যান্টিবায়োটিক

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Nov 2026, 12:17 AM

Updated : 05 Nov 2026, 12:17 AM

ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বাণিজ্যিক মাছ চাষের পুকুরের পলি ও মাছের নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা।

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ২৫টি পুকুরের নমুনা এবং ছয় প্রজাতির ১৫০টি মাছ পরীক্ষা করে মাছের মধ্যে মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত করেছেন।

গবেষণায় প্রতি মাছের শরীরে গড়ে শূন্য দশমিক ৬০টি কণা পাওয়া গেছে। ছয় প্রজাতির মধ্যে সরপুঁটিতে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি—প্রতি মাছে গড়ে ১ দশমিক ২০টি কণা। রুই ও মৃগেলে গড়ে শূন্য দশমিক ৬৮টি করে কণা পাওয়া গেছে।

‘মাইক্রোপ্লাস্টিকস ইন ফ্রেশওয়াটার অ্যাকুয়াকালচার: এভিডেন্স অব সেডিমেন্ট-ফিশ ট্রান্সফার অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটেড ইকোলজিক্যাল রিস্ক ইন বাংলাদেশ’ শিরোনামে গবেষণাপত্রটি গত ৮ অক্টোবর আন্তর্জাতিক সাময়িকী এনভায়রনমেন্টাল পলিউশন-এ প্রকাশিত হয়।

গবেষণার নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক মো. বদিউজ্জামান খান।

অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এখনই এটা (মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতি বা উদ্বেগের) সরাসরি বলা যাবে না। কারণ কণা পাওয়া গেছে মাছের পরিপাকতন্ত্র পরীক্ষা করে, যা মানুষ সচরাচর খায় না।

“তবে মাইক্রোপ্লাস্টিকগুলো অনেক সময় ভারী ধাতু ও অন্যান্য ক্ষতিকর উপাদান বহন করতে পারে। তাই সরাসরি মানবস্বাস্থ্যের ক্ষতি বলা না গেলেও বিষয়টি নিয়ে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন।”

অধ্যাপক বদিউজ্জামান জানান, একই এলাকায় চাষের মাছের মধ্যে ভারী ধাতু ও অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি নিয়ে আরেকটি গবেষণা করেছেন তারা। তাতে ক্রোমিয়াম ও সীসার মত ভারী ধাতুর পাশাপাশি ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশের প্রক্রিয়া চলছে।

Image

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

‘আতঙ্ক নয়, সচেতনতা ও নজরদারি’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য ও পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক মো. সাইদুল আরেফিন বলছেন, মাইক্রোপ্লাস্টিকের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

“একটি গবেষণার ভিত্তিতে শতভাগ নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়।”

তিনি বলেন, প্রতিটি বিষাক্ত পদার্থ বা ধাতুর একটি সহনীয় মাত্রা থাকে। সেই মাত্রা অতিক্রম করলে বিষক্রিয়ার আশঙ্কা বাড়ে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে জনসচেতনতার পাশাপাশি সরকারি নিয়ন্ত্রণের ওপরও গুরুত্ব দেন এই শিক্ষক।

“আমরা বিএসটিআই ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ বা লাগাম ধরার চেষ্টা করি। কিন্তু বেশিরভাগ অংশীজন তা মেনে চলতে চায় না। আইন বা সুনির্দিষ্ট বিধিবিধান প্রণয়ন না হলে এটি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন।”

এ বিষয়ে জাপানের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) পরিচালক মো. মাহফুজ আলম বলেন, একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক একাধিকবার ব্যবহার করা উচিত নয়। প্লাস্টিকের বোতল বা পলিথিন যেখানে-সেখানে ফেলা থেকেও বিরত থাকতে হবে।

“আমাদের প্লাস্টিক ব্যবহার কমাতে হবে। শুধু পর্যবেক্ষণ দিয়ে হবে না, জনসচেতনতা সবচেয়ে বেশি দরকার। প্লাস্টিক যত্রতত্র না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে পুনর্ব্যবহার করতে হবে, যা জাপানে করা হয়।”

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ গত অগাস্টে ‘অ্যাকুয়াকালচার নলেজ ডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, চাহিদা পূরণে মাছের উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে গুণগত মানের সঙ্গে কোনোভাবেই আপস করা যাবে না।

তিনি বলেন, দেশের মাটি ও পানিতে ভারী ধাতুর উপস্থিতি উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। পানিতে সিসা ও আর্সেনিকের মতো ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যাচ্ছে। চালেও ভারী ধাতুর উপস্থিতির বিষয়টি সামনে এসেছে। এসব উপাদানের উৎস—মাটি, ভূগর্ভস্থ পানি, সার নাকি কীটনাশক—চিহ্নিত করতে সরকার গবেষণা শুরু করেছে।

গবেষকদের উদ্দেশে মন্ত্রী বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক ও টিকার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রাকৃতিকভাবে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের দিকে আরও নজর দিতে হবে। নিরাপদ ও মানসম্পন্ন খাদ্য উৎপাদনে এমন কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করা যাবে না, যা মানুষের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর।

ক্ষতিকর কীটনাশকের ব্যবহার কমাতেও সরকার কাজ শুরু করেছে বলে জানান তিনি।

নদী-সাগরের মাছেও মাইক্রোপ্লাস্টিক

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণা। বড় প্লাস্টিকের ব্যাগ, চিপসের প্যাকেট, বোতল ও মাছ ধরার জাল ভেঙে এসব কণা তৈরি হতে পারে। কৃত্রিম তন্তুর পোশাক ধোয়ার সময়ও সূক্ষ্ম প্লাস্টিক ফাইবার বেরিয়ে আসে। পরে বর্জ্যপানির সঙ্গে সেগুলো খাল-বিল ও নদীতে গিয়ে মেশে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক ড. গোপাল চন্দ্র ঘোষ বলেন, সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, নিকেল ও তামার মতো ভারী ধাতু প্রকৃতিতে স্বাভাবিকভাবেই অল্প পরিমাণে থাকে। তবে কারখানা, ট্যানারি, ডাইং ইউনিট, ব্যাটারি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ও অপরিশোধিত নগর বর্জ্যের কারণে পানিতে এসব ধাতুর পরিমাণ বেড়ে যেতে পারে।

খাদ্যবর্জ্যের মতো এসব ধাতু পচে নষ্ট হয় না। নদীর তলদেশের পলিতে জমে থাকে। সেখান থেকে ক্ষুদ্র প্রাণী ও উদ্ভিদে প্রবেশ করে এবং খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে অন্য প্রাণীর শরীরে জমা হতে পারে বলে জানান তিনি।

অধ্যাপক গোপাল চন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে ২০২১ সালে করা এক গবেষণায় বঙ্গোপসাগর থেকে ধরা ১০ প্রজাতির ১০০টি মাছের পাকস্থলী পরীক্ষা করা হয়। প্রতিটি প্রজাতির মাছেই মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়; প্রতি মাছে গড়ে প্রায় দুটি কণা শনাক্ত হয়।

২০২৪ সালে তার দল বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৭ প্রজাতির স্বাদুপানির মাছ পরীক্ষা করে ১৪২টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পায়। এতে প্রতি মাছে গড়ে প্রায় একটি কণা পাওয়া যায়। কিছু প্রজাতির ক্ষেত্রে প্রতি মাছে তিনটিরও বেশি কণা শনাক্ত হয়। একই মাছের নমুনায় তামা, সীসা ও ক্যাডমিয়ামের উপস্থিতিও পাওয়া যায়।

পুকুর, নদী ও সাগরের মাছের মাইক্রোপ্লাস্টিক দূষণ নিয়ে জানতে চাইলে অধ্যাপক গোপাল চন্দ্র ঘোষ বলেন, “এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি উদীয়মান উদ্বেগ। তবে এটি আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নয়, কিন্তু অবশ্যই মনোযোগ দেওয়ার বিষয়।”

প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়ে তিনি বলেন, শহরগুলোতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বর্জ্য সংগ্রহ, পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য আলাদা করা এবং নালা-নর্দমা প্লাস্টিকমুক্ত রাখার ব্যবস্থা থাকা দরকার। পলিথিনের ওপর নিষেধাজ্ঞা কঠোরভাবে কার্যকর করার পাশাপাশি পাট ও কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে হবে।

Image

এআই দিয়ে তৈরি প্রতীকী ছবি

কেন এই গবেষণা

অধ্যাপক বদিউজ্জামান খান বলেন, বিদেশে প্রথমে সমুদ্র ও পরে নদীতে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে গবেষণা শুরু হয়। বাংলাদেশে নদীর পানিতে প্লাস্টিক দূষণ নিয়ে কাজ করার পর চাষের মাছ নিয়ে গবেষণার পরিকল্পনা করেন তারা। কারণ দেশে চাষের মাছের ব্যবহার বেশি।

তিনি বলেন, “বাংলাদেশে চাষের মাছে ভালো জার্নালে প্রকাশিত কোনো কাজ ছিল না। তাই ময়মনসিংহে চাষের ছয়টি প্রজাতির মাছ নিয়ে আমরা গবেষণা শুরু করি। এই গবেষণাটি মাছের মাংসে করা সম্ভব হয়নি; এটি মাছের পরিপাকতন্ত্রে করা হয়েছে। মাছের খাবার, বৃষ্টির পানি মাটির ওপর দিয়ে গড়িয়ে পুকুর-নদীতে যাওয়া কিংবা পুকুরের অব্যবস্থাপনার কারণে প্লাস্টিক পানিতে মিশে মাছে প্রবেশ করে।”

গবেষণায় ছয় প্রজাতির ১৫০টি মাছ পরীক্ষা করে মোট ৯০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া যায়। প্রজাতিভেদে কণার পরিমাণে পার্থক্য ছিল। সরপুঁটিতে সবচেয়ে বেশি এবং কাতলা, কার্প ও দেশি পাঙ্গাশে তুলনামূলক কম কণা পাওয়া যায়।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সরপুঁটি (Puntius sarana) মাছের শরীরে গড়ে ১ দশমিক ২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। রুই (Labeo rohita) ও মৃগেল (Cirrhinus cirrhosus)—উভয় প্রজাতিতে গড়ে শূন্য দশমিক ৬৮টি করে কণা শনাক্ত হয়েছে। কাতলা (Catla catla), কার্প (Cyprinus carpio) ও দেশি পাঙ্গাশ (Pangasius pangasius) মাছের শরীরে তুলনামূলক কম কণা পাওয়া গেছে।

গবেষণায় পুকুরের ওপরের স্তরের পলি এবং চাষ করা মাছের নমুনাও পরীক্ষা করা হয়। ত্রিশালের ২৫টি পুকুরের পলির নমুনাতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। নমুনায় পলিইথিলিন (পিই) ও পলিপ্রোপিলিন (পিপি) পলিমারও শনাক্ত হয়েছে।

অধ্যাপক বদিউজ্জামান জানান, একই এলাকার মাছের খামারে করা অন্য একটি গবেষণায় ট্যানারি বর্জ্য থেকে আসা ক্রোমিয়াম ও অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষণাটির ফল প্রকাশের আগে দূষণকারী উপাদানগুলোর উৎস, মাত্রা এবং মানবস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।

“মাছের খাবারেও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হচ্ছে। গবেষণার পূর্ণাঙ্গ ফল জার্নালে প্রকাশের আগে এসব দূষণকারী উপাদানের উৎস, মাত্রা এবং মানবস্বাস্থ্যের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো যাচ্ছে না। আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে গবেষণাটির ফলাফল প্রকাশের বিষয়ে অগ্রগতি জানা যাবে।”

পুরনো খবর:

শরীরে জমছে মাইক্রোপ্লাস্টিক: কতটা বিপদে আমরা?
ভাত তো খাচ্ছেন, আপনার চাল কতটা নিরাপদ
শাক-সবজি ও পেয়ারায় ‘অতিমাত্রায়’ ভারী ধাতু কী বার্তা দিচ্ছে
খাদ্যের পরিমাণ নয়, গুণগত মান নিশ্চিত করতে হবে: কৃষিমন্ত্রী