উল্লাপাড়ায় বজ্রপাতে ৯ মৃত্যু, শোকে স্তব্ধ দুই গ্রাম

হতাহতরা সবাই গরিব, তাই চিন্তাটা আরও বেশি, বলেন এক গ্রামবাসী।

ইসরাইল হোসেন বাবুসিরাজগঞ্জ প্রতিনিধিবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 9 Sept 2022, 06:34 PM
Updated : 9 Sept 2022, 06:34 PM

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলায় বজ্রপাতে একই পরিবারের পাঁচ কৃষি শ্রমিক ও দুই শিশুসহ নয় জনের মৃত্যুতে স্বজনদের পাশাপাশি দুইটি গ্রামের সাধারণ মানুষও শোকে স্তব্ধ হয়ে গেছে।

এ ঘটনায় চার শিশুসহ পাঁচজন এখনও অসুস্থ। তাদের মধ্যে তিনজনের অবস্থা ‘আশঙ্কাজনক’।

উল্লাপাড়া উপজেলার শিবপুর গ্রাম থেকে দুই-তিন কিলোমিটার দূরে পঞ্চকোশী ইউনিয়নের মাটিকোড়া গ্রাম।

বৃহস্পতিবার বিকালে ওই গ্রামের শাহ আলম জোয়াদ্দারের জমিতে রোপা আমন ধানের চারা তুলতে গিয়েছিলেন শিবপুরের ছয় কৃষি শ্রমিক। এক পর্যায়ে বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হয়। এ সময় তারা তিনটি টিন দিয়ে তৈরি পাশের একটি সেচ ঘরে আশ্রয় নেন।

তাদের সঙ্গে মাটিকোড়া গ্রামের জমির মালিক শাহ আলম জোয়াদ্দার, নিজের জমি দেখতে আসা একই গ্রামের কৃষক আব্দুল কুদ্দুস ও ছয় নারী-শিশুসহ মোট ১৪ জন ছিলেন ওই সেচ ঘরের নিচে।

এ অবস্থায় বজ্রপাতে ঘটনাস্থলে পাঁচ কৃষি শ্রমিক মারা যান। বৃষ্টি থামার পর স্থানীয়রা গিয়ে তাদের লাশ উদ্ধার করেন। আহত শিশুসহ চারজন হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যায়।

বৃহস্পতিবার বিকালে মাটিকোড়া গ্রামে ঘটে যাওয়া হতাহতের এ ঘটনা যেন মেনে নিতে পারছেন না কেউ। শুক্রবার সকালে সরেজমিনে মাটিকোড়া ও শিবপুর গ্রামে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা যায়।

নিহত কৃষি শ্রমিক শমসের আলীর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার ৬০ বছর বয়সী স্ত্রী শান্তি বেগম বাড়ির উঠানে হাউমাউ করে কাঁদছেন। পাশেই কান্নারত তার ছেলে নিহত কৃষি শ্রমিক শাহিনের স্ত্রী মনিজা খাতুন। সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আশপাশের নারীরাও কাঁদছেন। এই পরিবারের পাঁচজন কৃষি শ্রমিক এদিন বজ্রপাতে মারা গেছেন।

নিহত শমসের আলীর স্ত্রী শান্তি বেগম বলেন, “একসাথে স্বামী, দেবর, ছোট ছেলে, মেয়ের জামাই ও নাতি মইরা গ্যাছে। বড় ছেলে জাহাঙ্গীর হোসেন গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। তার বউ বাড়িতে অচেতন হয়ে পড়ে আছে, তার দুই মেয়ে বাবার শোকে অসুস্থ হয়ে পড়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হইছে। আমরা গরিব মানুষ, এ্যাহন আমাগোরে কী ওবু, অসুস্থগো চিকিৎসা করামু কী দিয়া, ট্যাহা পামু কনে, এই সংসার গোনা এ্যাহন কেবা কইরা চইলবো, কামাই কইরবো কেডো। সরকার আমাগোরে না দেখলি আমরাও না খেয়ে মইরা যাবু।”

পাশেই তার নিহত ছেলে শাহিনের স্ত্রী মনিজা খাতুনও কান্না করছেন। তিনি বলেন, “ক্ষ্যাতে কাম কইরব্যার যাইয়া বজ্রপাতে স্বামী মইরা গ্যাছে। ছয় বছরের একটো প্রতিবন্ধী ছোয়াল আছে। ছোয়াল নিয়া আমি এ্যাহন কী করমু? কনে যামু, কেডো আমাগোরে দেগবো?”

পাশেই শমসের আলীর ছোট ভাই নিহত আফসার আলীর বাড়ি। সেখানে ঘরে গিয়ে দেখা যায়, তার স্ত্রী সূর্য বেগম অচেতন অবস্থায় চৌকিতে শুয়ে আছেন। স্বজনরা তাকে দেখভাল করছেন।

এ সময় তার ভাগ্নে বউ ময়না খাতুন বলেন, “মামার শোকে মামি বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছে। তার দুই মেয়ে আসমা ও নাজমা বাবার শোকে অসুস্থ হয়ে পড়ায় বগুড়ায় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।”

সূর্য বেগমের জা বাহেলা খাতুন বলেন, “নিহত আফসার আলীর তিন ছেলে ও দুই মেয়ে আছে। ছেলেরা সবাই আলাদা খায়। নিহত শমসের আলীর দুই ছেলের একজন মারা গেছে। আরেকজন অসুস্থ। তিন মেয়ের মধ্যে একজন এর আগে আগুনে পুড়ে মারা গেছে। সরকারি সহযোগিতা না পেলে পরিবার দুটি একেবারে শেষ হয়ে যাবে।”

এ বাড়িগুলোর একটু দূরে নিহত শমসের আলীর মেয়ের জামাই নিহত মোফাকখর ও নাতি মোন্নাফের বাড়ি। বাবা-ছেলের মৃত্যুতে ওই বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। সবাই যেন কথা বলার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন।

শোকাহতদের সান্ত্বনা দিতে আসা পাশের গ্রামের বাসিন্দা ও উল্লাপাড়া পৌরসভার সাবেক নারী কাউন্সিলর মনিরা বেগম বলেন, “একই পরিবারের নিহত পাঁচজনই দিনমজুর। কৃষি কাজ করে তাদের সংসার চলত। তিনটি পরিবারে রোজগার করার মত আর কেউ রইল না। নিহত শমসের আলীর কোনো জায়গা নেই, মেয়ের জামাইয়ের জায়গায় বসবাস করতেন। সরকার ও বিত্তবানরা সহায়তা না করলে পরিবারগুলো একেবারে পথে বসে যাবে।”

শুক্রবার সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, হতাহতদের পায়ের সান্ডেল ঘটনাস্থলেই পড়ে আছে; বন্ধ রয়েছে সেচ পাম্প।

মাটিকোড়া গ্রামের নিহত শাহ আলম জোয়াদ্দারের বাবা নুরু জোয়াদ্দার বলেন, “আমার ছেলে ধানের চারা তোলার জন্য ছয়জন কৃষি শ্রমিককে নিয়ে এসেছিল। জমি দেখিয়ে দিতে সেও ঘটনাস্থলে যায়। বজ্রপাতে আহত ছেলেকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে নিয়েছিলাম; কিন্তু তার আগেই সে মারা গেছে।”

একই গ্রামের নিহত কৃষক আব্দুল কুদ্দুসের মেয়ের জামাই মানিক মিয়া বলেন, “আমার শ্বশুর জমি দেখার জন্য গেলে বৃষ্টি ও বজ্রপাত শুরু হয়। তাই তিনি সেচ ঘরে আশ্রয় নিয়েছিলেন। গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পথেই তিনি মারা গেছেন।”

এই গ্রামের আলিম মিয়ার মেয়ে রত্না খাতুন রিতু (১২) ও মোস্তফার মেয়ে মারিয়ার (৭) মৃত্যু হয়। স্বজনরা ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধারের পর হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

মাটিকোড়া গ্রামের একই পরিবারের চার শিশু ও শিবপুর গ্রামের এক কৃষি শ্রমিক বেঁচে গেলেও তাদের মধ্যে দুই শিশুসহ তিনজনের অবস্থা ‘আশঙ্কাজনক’ বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক।

মাটিকোড়া গ্রামের রফিকুল ইসলাম বলেন, “বজ্রপাতের সময় ঘটনাস্থলে থাকলেও আমার মেয়ে আমেনা (১০), নাতি জান্নাতি (১০), ভাজিতি নদী (১২) ও রূপা (১৪) ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায়। এরা শাক তোলার জন্য চরার মধ্যে গিয়েছিল। আহত অবস্থায় উদ্ধারের পর তাদের হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। ভাতিজি নদী ও রূপা সুস্থ হয়ে ওঠায় আজ তাদের বাড়িতে নিয়ে এসেছি। মেয়ে আমেনা ও নাতি জান্নাতি এখনও আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে আছে।”

মাটিকোড়া গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক মাজেদ আলী বলেন, “এমন মৃত্যু গ্রামের মানুষ আগে কখনও দেখেনি। গ্রামের সবাই শোকাহত। দুই শিশুসহ চারজন মারা গেছে। আরও দুই শিশু এখনও অসুস্থ। এ অবস্থায় আমরা গ্রামের মানুষ কেমনে ভালো থাকি বলেন?”

শিবপুর গ্রামের বেসরকারি চাকরীজীবী সৈকত হোসেন বলেন, “রাতে নিজেদের গ্রামের পাশাপাশি আশপাশের গ্রামের বিপুলসংখ্যক মুসল্লির উপস্থিতিতে জানাজা শেষে পাঁচজনকে দাফন করেছি। পুরো গ্রামের মানুষের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। অনেকেই দৈনন্দিন কাজ বাদ দিয়ে নিজ নিজ বাড়িতে অবস্থান করছেন। হতাহতরা সবাই গরিব, ফলে চিন্তাটা আরো বেশি।“

এ ঘটনায় স্বজনদের পাশাপাশি দুইটি গ্রামের সাধারণ মানুষও শোকে মুহ্যমান। কারও মুখেই তেমন কথা নেই, শোকে স্তব্ধ হয়ে অনেকটা নির্বিকার সময় পাড় করছেন তারা।

নিহতদের লাশ দেখতে গিয়ে এক নারীর মৃত্যু

বজ্রপাতে নিহত একই পরিবারের পাঁচজনকে দেখতে এসে পাশের গ্রামের শেফালী খাতুন (৬৫) নামে এ নারী মারা যান বলে উল্লাপাড়া পৌরসভার সাবেক নারী কাউন্সিলর মনিরা বেগম জানান।

কবরস্থান থেকে মৃতদেহ চুরির আশঙ্কা

বজ্রপাতের ঘটনায় নিহতদের বৃহস্পতিবার রাতেই জানাজা শেষে দাফন করা হয়েছে। নিহত পাঁচজনকে শিবপুর কবরস্থানে ও অপর চারজনকে মাটিকোড়া করবস্থানে দাফন করা হয়। দাফনের পর থেকেই করবস্থান থেকে মৃতদেহ চুরির আশঙ্কায় রয়েছেন গ্রামবাসী ও স্বজনরা।

শিবপুর গ্রামের রহম আলী বলেন, “বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১২টার দিকে পাঁচজনকে কবর দেওয়ার পর রাত ৩টা থেকে কবরস্থান পাহারা দিয়েছি। গ্রামের ছেলেদের সাথে কথা বলেছি। আজ (শুক্রবার) থেকে নিয়মিত আমরা কবরস্থান পাহারা দেব। নইলে করব থেকে নাকি মৃতদেহ চুরি হয়ে যাবে।”

অপরদিকে, মাটিকোড়া গ্রামের নিহত শাহ আলমের চাচাতো ভাই ইউসুফ জোয়াদ্দার বলেন, “রাতের বজ্রপাতে নিহত চারজনকে কবর দেওয়া হয়েছে। গ্রামের মাতব্বরদের সঙ্গে কথা বলেছি। করব চারটা ইট দিয়ে পাকা করে দেব। আর তা যদি না হয়, তাহলে রাত জেগে পাহারা দিতে হবে। অন্যস্থায় মৃতদেহ চুরি হওয়ার ভয় আছে।”

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক