প্রায় দশ মিনিট কথা বলার পরও রাতুল বলতে পারেনি, সে কীভাবে কন্টেইনারে করে মালয়েশিয়ায় গেছে।
Published : 23 Feb 2023, 03:19 PM
চট্টগ্রাম থেকে কন্টেইনারে করে মালয়েশিয়া চলে যাওয়া বুদ্ধি প্রতিবন্ধী কিশোর মো. রাতুল ইসলাম ফাহিমকে তিন মাস পর ফিরে পেয়ে তার পরিবারের সদস্যদের মাঝে আনন্দের বন্য বইছে।
অভিবাসন বিভাগের প্রক্রিয়া শেষে গত ২১ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ৯টায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায় রাতুল। মালয়েশিয়ান এয়ারলাইনস এমএইচ ১৯৬ ফ্লাইটে করে দেশে আসার সময় তার সঙ্গে ছিলেন কুয়ালালামপুর বাংলাদেশ হাইকমিশনের কল্যাণ সহকারী মোকছেদ আলী।
এর আগে রাতুলকে বিদায় জানাতে মালয়েশিয়া বিমানবন্দরে উপস্থিত হন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাইফুদ্দিন নাসুশান ও বাংলাদেশের হাইকমিশনার মো. গোলাম সারোয়ার।
বুধবার সন্ধ্যায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ঝলম দক্ষিণ ইউনিয়নের সাতপুকুরিয়া গ্রামের বাড়িতে ফেরে রাতুল। সন্ধ্যার পর থেকে এলাকার লোকজন তাকে দেখতে বাড়িতে ভিড় করতে শুরু করেন।
তবে ওই কন্টেইনারের ভেতরে কীভাবে ঢুকল, তা বলতে পারছে না ১৪ বছর বয়সী বুদ্ধি প্রতিবন্ধী রাতুল।
দিনমজুর বাবা মো. ফারুক মিয়ার তিন ছেলের মধ্যে সবার বড় রাতুল। বুধবার রাত ৮টার দিকে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের কথা হয় তার সঙ্গে।
প্রায় দশ মিনিট কথা বলার পরও রাতুল বলতে পারেনি, সে কীভাবে কন্টেইনারে করে মালয়েশিয়ায় গেছে। তবে বাবা-মা আর ছোট ভাইদের কাছে পেয়ে বেশ ‘খুশি’ সে।
রাতুল শুধু বলতে পারে, সে তার বাবা-মা আর ভাইদের খুঁজেছে। কন্টেইনারের ভেতর সে ঘুমিয়েছিল। আর ঢাকায় বিমান্দবন্দরে তার বাবা-মা ও ভাইদের কাঁদতে দেখেছে।
সবার নাম উল্লেখ করে সে বারবার বলেছে, “আমার জন্য কেঁদেছে।”
গত বছরের ১৩ নভেম্বর বাড়ি থেকে নিখোঁজ হয় রাতুল। গত ২০ জানুয়ারি রাতুলকে মালয়েশিয়ায় পাওয়ার খবর পান তার বাড়ির সদস্যরা।
গত ১২ জানুয়ারি চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ছেড়ে যাওয়া ‘এমভি ইন্টেগ্রা’ জাহাজের একটি খালি কন্টেইনার মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ছেড়ে যায়। ১৬ জানুয়ারি মালয়েশিয়ার কেলাং বন্দরে কন্টেইনারের ভেতর থেকে নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পান নাবিকরা। এরপরই কেলাং বন্দর কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান তারা।
১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ সময় রাত ১০টায় জাহাজটি জেটিতে এনে কন্টেইনার খুলে রাতুলকে উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিকভাবে তাকে রোহিঙ্গা বলে ধারণা করে সেখানকার সবাই। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবি ও ভিডিও দেখে রাতুলকে শনাক্ত করেন পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাতুলের বাবা চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। সেখানে তিনি ও তার ভাইয়েরা দিনমজুরের কাজ করতেন। কয়েক বছর আগে গ্রামে ফিরে ভাড়া বাড়িতে বসবাস শুরু করেন তিনি।
সবশেষ গত বছর গ্রামে ধার-দেনা করে উপরে টিন আর নিচে পলিথিনের বেড়া দিয়ে বানানো একটি ঘরে বসবাস শুরু করেন। পরিবারটি একেবারই হতদরিদ্র। ১৩ নভেম্বর রাতুল বাড়ি থেকে নিখোঁজ হলেও এ ঘটনায় থানায় কোনো জিডি করেনি তার পরিবার।
থানায় না জানানোর কারণ জানতে চাইলে রাতুলের বাবা বলেন, “আমার ছেলে ছোটবেলা থেকেই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী। প্রায়ই বাড়ি থেকে কাউকে কিছু না বলে নিখোঁজ হয়ে যেত। আমরা বারবার বলার পরও এ ঘটনা বন্ধ করতে পারিনি। ওই সময় ভেবেছিলাম, নিজে নিজেই ফিরে আসবে। তাই আর থানায় জিডি করতে যাইনি।
“সে বেশিক্ষণ কোনো কথাও মনে রাখতে পারে না। ছেলেকে কাছে পাওয়ার পর থেকে বারবার জিজ্ঞেস করেও আমরা কিছু জানতে পারি নাই।”
রাতুল আসার সময় সেখানে পাওয়া উপহার চকলেট-বিস্কুট আর ওষুধপত্র সঙ্গে এনেছে। তবে তাকে কোনো টাকা-পয়সা দেওয়া হয়নি বলে জানান ফারুক।
ছেলেকে কাছে পেয়ে সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন ফারুক। তিনি বলেন, “রাতুল জাহাজের মধ্যে না খেয়ে ছিল ওই কয়েকদিন। উদ্ধারের পর রাতুল ১২দিন মালয়েশিয়ার হাসপাতালে ছিল। এরপর তাকে দেশটির সরকার বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে সেইফ হোমে নিয়ে রাখে।
“সেখানে তারা আমার ছেলের দিকে ভালোভাবে খেয়াল রেখেছে। আমি মালয়েশিয়ার সরকারকেও ধন্যবাদ জানাই।”
রাতুলের মা নিপু বেগম বলেন, “একবার তো মনে হয়েছিল, ছেলেকে আর দেখতেই পাব না। যাক, আমার ছেলে আমার কাছে ফিরে এসেছে; আর চাওয়ার কিছুই নেই। ছেলেকে পেয়েছি এতেই আমি খুশি। আমি সরকারসহ যারা আমাদের পাশে ছিলেন তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।“
মনোহরগঞ্জ উপজেলার ঝলম দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশিকুর রহমান হাওলাদার হিরণ বলেন, “আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানাই দ্রুত সময়ের মধ্যে ছেলেটিকে তার বাবা-মায়ের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। আমরা রাতুলের বাবা-মাকে বলেছি, তার দিকে ভালোভাবে খেয়াল রাখার জন্য।”