Published : 05 Apr 2026, 03:29 PM
গোপালগঞ্জে হঠাৎ করেই হাম উপসর্গের রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে ২০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন।
বিশেষ করে শিশু ও কিশোররা এ রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, রোগীর সংখ্যা বাড়ার কারণে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
গোপালগঞ্জ সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৯টা থেকে রোববার সকাল ৯টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন করে ২০ রোগী ভর্তি হয়েছে।
এর মধ্যে গোপালগঞ্জ সদরে ৫ জন, কোটালীপাড়ায় ৯ জন, কাশিয়ানীতে ২ জন, টুঙ্গিপাড়ায় ১ জন ও মুকসুদপুর উপজেলায় ৩ জন রয়েছেন।

সিভিল সার্জন ডা. আবু সাইদ মো. ফারুক জানান, চলতি বছর হামের উপসর্গ নিয়ে ৫ এপ্রিল সকাল ৯টা পর্যন্ত ১১৩ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এদের মধ্যে ৩০ জনের নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকা পাঠানো হয়েছে। ঢাকা থেকে পাওয়া প্রতিবেদনে মুকসুদপুর উপজেলার ৬ মাস ও ৭ মাস বয়সী দুই শিশুর শরীরে হাম সনাক্ত হয়েছে।
তিনি বলেন, তিনি দুই শিশুর বাড়ি গিয়ে তাদের খোঁজ-খবর নিয়েছেন। তারা সুস্থ আছে। এছাড়া হামের উপসর্গে আক্রান্ত ৬৫ জন হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ্ হয়ে বাড়ি ফিরেছে।
ফারুক বলেন, “নতুন রোগীর সংখ্যা বেড়েছে; তবে এটি আশঙ্কাজনক নয়। অন্য জেলাগুলোর তুলনায় গোপালগঞ্জে হাম সংক্রমণের হার কম। আমাদের ভ্যাক্সিনেশন কর্মসূচি এখনও শুরু হয়নি, তবে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া আছে। মুকসুদপুরের আক্রান্ত এলাকায় দ্রুত ভ্যাক্সিনেশন শুরু করা হবে।
“আক্রান্তদের সুচিকিৎসা নিশ্চিত করতে আমরা কাজ করছি। আইসোলেশন ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ওষুধের ব্যবস্থা রয়েছে।”
সিভিল সার্জন সবাইকে প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে না যেতে এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. জীবিতেষ বিশ্বাস বলেন, “হাম ছোঁয়াচে রোগ হওয়ায় উপসর্গ নিয়ে ভর্তি রোগীদের সাধারণ রোগীদের থেকে আলাদা রাখা হয়েছে। তাদের জন্য হাসপাতালেই পৃথক ৪০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ড তৈরি করা হয়েছে। চিকিৎসকরা সার্বক্ষণিকভাবে রোগীদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করছেন।”
তিনি বলেন, “আতঙ্কিত না হয়ে উপসর্গ দেখা মাত্রই রোগীকে সুস্থ মানুষদের থেকে আলাদা করতে হবে। আক্রান্তদের প্রচুর তরল খাবার, ডাবের পানি এবং পুষ্টিকর খাদ্য দিতে হবে। সঠিক পরিচর্যা ও চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে দ্রুত সুস্থ হওয়া সম্ভব।”
এই হাসপাতালে ভর্তি গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ডালনিয়া গ্রামের দশ মাসের শিশু মোসায়েদ সিকদার। তার বাবা মামুন সিকদার বলেন, “প্রথমে ছেলের প্রচণ্ড জ্বর দেখা দেয়। পরে গ্রামের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাই। তারা চিকিৎসা দিলেও কোন কাজ হয় নাই। উল্টা শরীরে লালচে র্যাস ওঠে।
তিনি বলেন, “ছেলেকে ৩১ মার্চ প্রথম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে আড়াই’শ বেড জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করি। এখন অবস্থা ভাল। তবে ছেলেকে আগে হামের টিকা দেওয়া হয়নি।”
দশ মাস বয়সে হামের টিকা দেওয়া হয়। হামের টিকা দেওয়ার বয়সে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে মোসায়েদ হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে জানান বাবা মামুন।

এক বছরের শিশু আমিরুলের মা তানিয়া বেগম বলেন, “প্রথমে সাধারণ জ্বর মনে হয়েছিল, পরে দানা ওঠায় আতঙ্কিত হয়ে হাসপাতালে নিয়ে এসেছি। তাকে আলাদা আইসোলেশন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে।”
গোপালগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডের ইনচার্জ সিনিয়র স্টাফ নার্স বিউটি হালদার বলেন, বর্তমানে আইসোলেশন ওয়ার্ডে রোগীর চাপ আগের তুলনায় অনেক বেড়ে গেছে। আগে বছরে কয়েকজন রোগী আসত, কিন্তু হঠাৎ প্রাদুর্ভাবের কারণে গত কয়েকদিনে রোগীর সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। রোববার সকাল পর্যন্ত ছয়জন রোগী এসেছে, যার মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক।
তিনি বলেন, “এই হঠাৎ রোগী বৃদ্ধির কারণে আমাদের কিছুটা হিমশিম খেতে হচ্ছে। কারণ, আইসোলেশন ওয়ার্ডটি আগে থেকেই থাকলেও এটি মূলত করোনা-পরবর্তী একটি প্রজেক্টের অংশ হিসেবে তৈরি হয়েছিল। হামের মতো এই ধরনের আউটব্রেক মোকাবেলার জন্য আমাদের সেইভাবে প্রস্তুতি বা পর্যাপ্ত ইনস্ট্রুমেন্ট সেটআপ আগে ছিল না।”
“বর্তমানে আমরা দ্রুত সেটআপ করার চেষ্টা করছি এবং সীমিত সরঞ্জাম ও জনবল নিয়েই যতজন সম্ভব রোগীকে সেবা দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে, যে কোনো পরিস্থিতিতেই রোগীরা যেন প্রয়োজনীয় সেবা পায়।”