Published : 04 May 2026, 10:30 PM
টানা ভারি বৃষ্টি ও উজানের ঢলে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর ও কাউয়াদিঘি হাওরের প্রায় আড়াই হাজার হেক্টর জমির পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উৎপাদন কিছুটা কম হওয়ার সম্ভাবনা দেখছে কৃষি বিভাগ।
মৌলভীবাজার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. জালাল উদ্দিন বলেন, চলতি বোরো মৌসুমে ৬২ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ২৭ হাজার ৩৫৫ হেক্টর এবং হাওরের উপরের অংশে ৩৫ হাজার ৪৫ হেক্টর।

তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত তিনটি হাওরে দুই হাজার ৪৬১ হেক্টর পাকা ধান পানিতে তলিয়ে গেছে; যার পুরোটাই ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
শ্রীমঙ্গল আবহাওয়া অফিসের ইনচার্জ মো. আনিসুর রহমান বলেন, এপ্রিলে মৌলভীবাজারে ৪৮৩ মিলিমিটার এবং মে মাসের প্রথম চার দিনে ২২১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
তিনি বলেন, এপ্রিল ও মে মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে। গত বছর একই সময়ে বৃষ্টিপাত হয়েছিল ১২৬ মিলিমিটার। এদিকে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিপাতের কারণে কোথাও কোথাও জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। পাহাড়ি ছড়া দিয়ে এসব পানি হাওরে গিয়ে পড়ায় আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এ জেলার সবচেয়ে বেশি ধান উৎপাদন হয় কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলা জুড়ে বিস্তৃত হাকালুকি হাওরে। এবার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে এই হাওরে।
হাকালুকি হাওরপাড়ের কৃষক মো. খছরু মিয়া বলেন, “ধার-দেনা করে আমরা বোরো ক্ষেত করেছি। পাশাপাশি নিজেরা অনেক পরিশ্রম করেছি। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। আর কয়েকটা দিন পেলেই পাকা ধান ঘরে তুলতে পারতাম।”

কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, “সারা বছরের হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফসল এখন পানিতে তলিয়ে। এর মধ্যে ধানে পচন ধরেছে। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ক্ষেতে খরচ দিয়েছিলাম। ধান বিক্রি করে তা পরিশোধ করার কথা ছিল, কিন্তু আগাম বন্যা আমার সর্বনাশ করে দিল।”
হাকালুকি হাওরপাড়ের আরেক কৃষক আলী হোসেন বলেন, “ধান তো নিল বন্যা, এখন আগামী বছরের খোরাকি কোথায় পাব, আর ঋণই বা শোধ করব কীভাবে!”
শ্রীমঙ্গল হাইল হাওরপাড়ের কৃষক মো. ইউছুফ মিয়া বলেন, হাইল হাওরের নিচের অংশের কিছু ধান একেবারে তলিয়ে গেছে। পানি ওঠে যাওয়ায় এ বছর মেশিন ব্যবহার করা যায়নি। তাই শতভাগ ধান শ্রমিক দিয়ে কাটতে হচ্ছে। ফলে শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে।

কাসিমপুল পাম্প হাউস ঠিকমতো পানি অপসারণ করতে পারছে না জানিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে কাউয়াদিঘি হাওরপাড়ের কৃষক মঞ্জু চক্রবর্তী বলেন, প্রচুর বৃষ্টিপাতে হাওরে পানির পরিমাণও বেশি। নিচের ক্ষেতের আশা মানুষ ছেড়ে দিয়েছে। এখন উপরের অংশের ধান কাটা হচ্ছে, তবে শ্রমিক সংকট রয়েছে।
জুড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহমুদুল আলম বলেন, চলতি বছর এ উপজেলায় প্রায় ছয় হাজার ১৮৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। ফসলও ভালো হয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে জুড়ী নদী দিয়ে হাকালুকি হাওরে পানি প্রবেশ করে। এতে বেশ কিছু বোরো ধানের ক্ষেত তলিয়ে যায়। এ পর্যন্ত প্রায় ১৮০ হেক্টর ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
যাদের ধান পানিতে তলিয়ে গেছে তাদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে; সরকারের পক্ষ থেকে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

মৌলভীবাজার জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক নিলুফার ইয়াসমিন মুনালিসা সুইটি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, হাওরের নিচু এলাকার প্রায় ৮৭ শতাংশ ধান এখন পর্যন্ত কাটা হয়েছে। আর উপরের অংশে কাটা হয়েছে প্রায় ৪০ শতাংশ। কয়েক দিনের মধ্যে তা শতভাগে পৌঁছাবে।
মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. খালিদ বিন ওয়ালিদ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, কুশিয়ারা, মনু, ধলাই ও জুড়ি নদীর পানি এখন বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে জুড়ি নদীর পানি কয়েকদিন বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়।
নদী পাড়ের প্রতিরক্ষা বাঁধগুলো সার্বক্ষণিক তদারকি করা হচ্ছে; যেখানে সমস্যা দেখা যাচ্ছে, সেখানে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।